হিজবুল্লাহকে ঠেকাতে সিরিয়ার দারস্থ ট্রাম্প, ‘আশ্বাস’ আল-শারার

লেবাননে ইরান-সমর্থিত সশস্ত্র গোষ্ঠী হিজবুল্লাহকে মোকাবিলার দায়িত্ব সিরিয়ার প্রেসিডেন্ট আহমেদ আল-শারার হাতে তুলে দেওয়ার বারবার ইঙ্গিত দিচ্ছেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। দামেস্কের পক্ষ থেকে এমন সম্ভাবনা নাকচ করা হয়েছে।
তবে ট্রাম্পের দাবি, আল-শারা তাকে এ ব্যাপারে সাহায্য করতে আগ্রহী। তার এই অবস্থানে লেবাননে সিরীয় সেনাবাহিনীর নতুন করে হস্তক্ষেপের আশঙ্কা আবারও জোরালো হয়ে উঠেছে।
ট্রাম্পের এই ক্রমবর্ধমান স্পষ্ট মন্তব্য সিরিয়ায় নিযুক্ত মার্কিন দূত টম ব্যারাকের পূর্ববর্তী বক্তব্যকে খণ্ডন করেছে। এর আগে লেবাননে সৈন্য পাঠানোর জন্য দামেস্কের ওপর ওয়াশিংটনের চাপ প্রয়োগের খবরকে ‘মিথ্যা ও অসত্য’ বলে নাকচ করে দিয়েছিলেন টম ব্যারাক।
সবশেষ গত ২১ জুন ফক্স নিউজকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে ট্রাম্প হিজবুল্লাহর বিরুদ্ধে ইসরায়েলের সামরিক অভিযান নিয়ে তার হতাশা প্রকাশ করেন।
ব্যাপক ধ্বংসযজ্ঞ না ঘটিয়ে হিজবুল্লাহকে পরাজিত করতে ইসরায়েলের ব্যর্থতার সমালোচনা করে ট্রাম্প বলেন, ‘ভবন না ভেঙে তারা (ইসরায়েল) কিছুই করতে পারে না। আমি এই (হিজবুল্লাহ দমনের) দায়িত্ব সিরিয়ার হাতে তুলে দেওয়ার কাছাকাছি চলে এসেছি।’
অবশ্য ‘দায়িত্ব হস্তান্তর করা’ বলতে ট্রাম্প ঠিক কী বুঝিয়েছেন, তা পরিষ্কার করেননি। ফলে তিনি সিরিয়ার সামরিক অভিযান, রাজনৈতিক মধ্যস্থতা, হিজবুল্লাহর ওপর চাপ সৃষ্টি, কঠোর সীমান্ত নিয়ন্ত্রণ, নাকি লেবানন রাষ্ট্রের সঙ্গে কোনো সহযোগিতার কথা বলছেন; তা অস্পষ্টই থেকে গেছে।
তবে ট্রাম্পের এই মন্তব্যগুলো ছিল তার ধারাবাহিক প্রকাশ্য বিবৃতিরই অংশ, যা থেকে ইঙ্গিত পাওয়া যায় যে হিজবুল্লাহর বিষয়ে আলোচনায় দামেস্ককে একটি বড় ভূমিকা দেওয়ার কথা গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করছে ওয়াশিংটন। তার এই অবস্থান এই ধারণাকে আরও জোরদার করেছে যে, লেবাননে হিজবুল্লাহর প্রভাব খর্ব করার প্রচেষ্টায় ওয়াশিংটন এখন দামেস্ককে একটি সম্ভাব্য অংশীদার হিসেবে দেখছে।
মার্কিন চাপের খবর নাকচ
হিজবুল্লাহ ইস্যুতে ওয়াশিংটন ও দামেস্কের মধ্যকার এই গোপন আলোচনার বিষয়টি প্রথম সামনে আসে গত ১৭ মার্চ। বার্তা সংস্থা রয়টার্স এক প্রতিবেদনে জানায়, হিজবুল্লাহকে নিরস্ত্র করতে সাহায্য করার জন্য পূর্ব লেবাননে সেনা পাঠানোর বিষয়টি বিবেচনা করতে দামেস্ককে উৎসাহিত করেছে ওয়াশিংটন।
এই আলোচনা সম্পর্কে অবগত পাঁচজন ব্যক্তি রয়টার্সকে জানিয়েছেন, সিরিয়া এই প্রস্তাবে জড়াতে একেবারেই অনিচ্ছুক ছিল। কারণ দামেস্কের আশঙ্কা ছিল, এতে তারা একটি বৃহত্তর আঞ্চলিক যুদ্ধে জড়িয়ে পড়তে পারে। একইসঙ্গে সিরিয়া ও লেবানন উভয় দেশেই নতুন করে সাম্প্রদায়িক উত্তেজনা তৈরি হতে পারে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, এই প্রস্তাবটি প্রাথমিকভাবে ২০২৫ সালে মার্কিন ও সিরীয় কর্মকর্তাদের মধ্যে আলোচিত হয়েছিল। পরে গত ফেব্রুয়ারির শেষের দিকে ইরানের বিরুদ্ধে মার্কিন-ইসরায়েল যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর বিষয়টি আবারও সামনে আনা হয়।
তবে রয়টার্সের প্রতিবেদন প্রকাশের দিনই সিরিয়ায় নিযুক্ত মার্কিন দূত টম ব্যারাক দ্ব্যর্থহীনভাবে এই তথ্য অস্বীকার করেন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে (সাবেক টুইটার) তিনি লেখেন, ‘লেবাননে সৈন্য পাঠাতে সিরিয়াকে যুক্তরাষ্ট্র উৎসাহিত করছে বলে যে খবর প্রকাশিত হয়েছে, তা সম্পূর্ণ মিথ্যা ও অসত্য।’
অবশ্য সংবাদমাধ্যম মিডল ইস্ট আই-কে একটি সিরীয় সূত্র জানিয়েছে, এই প্রতিবেদনগুলো নিয়ে আলোচনা করতে পরে সিরিয়ার প্রেসিডেন্ট আহমেদ আল-শারা ও দেশটির সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর নেতাদের মধ্যে একটি বিশেষ বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়েছিল।
সূত্রটি জানায়, ‘বৈঠকে উপস্থিত সবাই একমত হয়েছেন যে, লেবাননে সামরিকভাবে হস্তক্ষেপ করার কোনো ইচ্ছা বা আকাঙ্ক্ষা সিরিয়ার নেই।’ লেবাননের একজন ঊর্ধ্বতন সূত্রও মিডল ইস্ট আই-কে নিশ্চিত করেছে যে, দামেস্ক সীমান্ত পেরিয়ে কোনো বাহিনী পাঠাচ্ছে না বলে বৈরুতকে বেশ কয়েকটি আশ্বাসমূলক বার্তা পাঠিয়েছে সিরিয়া।
সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো আরও জানিয়েছে, মার্কিন এই চাপ প্রতিহত করতে সিরীয় কর্তৃপক্ষ তাদের আঞ্চলিক মিত্র; বিশেষ করে সৌদি আরব, কাতার ও তুরস্কের কূটনৈতিক সাহায্য চাইবে বলে ইঙ্গিত দিয়েছে।
সিরিয়ার দ্বিতীয় একজন ঊর্ধ্বতন সূত্র মিডল ইস্ট আই-কে জানায়, ওয়াশিংটনের তরফ থেকে চাপ ক্রমাগত বাড়তে থাকায় প্রেসিডেন্ট আল-শারা যুক্তরাষ্ট্রের দাবি এড়িয়ে যাওয়ার একটি কৌশল নিয়েছেন। তিনি লেবাননে সিরিয়ার কোনো ধরনের সম্পৃক্ততার কথা বিবেচনা করার আগে ওয়াশিংটনের সামনে এমন কিছু কঠিন শর্ত জুড়ে দিয়েছেন, যা পূরণ করা যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষে অত্যন্ত দুরূহ হবে।
সাহায্য করতে আগ্রহী আল-শারা
হিজবুল্লাহ ইস্যুতে লেবাননে সিরিয়ার সম্ভাব্য ভূমিকার বিষয়ে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প সর্বপ্রথম প্রকাশ্যে ইঙ্গিত দেন গত ৫ জুন এনবিসি নিউজের ‘মিট দ্য প্রেস’ অনুষ্ঠানে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে। হিজবুল্লাহর বিরুদ্ধে আরও ‘সুনির্দিষ্ট’ অভিযানের আহ্বান জানিয়ে ওই সাক্ষাৎকারে ট্রাম্প বলেছিলেন, এই কাজে ওয়াশিংটন সিরিয়াকে সহায়তা করতে পারে কিংবা তাদের কথা ‘সুপারিশ’ করতে পারে।
সিরিয়ার প্রেসিডেন্ট আহমেদ আল-শারার প্রশংসা করে তিনি বলেন, ‘আমরা এ ব্যাপারে তাদের সাহায্য করতে পারি, অথবা সিরিয়ার কথা সুপারিশ করতে পারি।’ সেই সঙ্গে সিরীয় প্রেসিডেন্ট এই বিষয়ে ‘সাহায্য করতে আগ্রহী’ বলেও দাবি করেন তিনি।
সাক্ষাৎকারের ওই মন্তব্যে সিরীয় বাহিনীকে লেবাননে প্রবেশের জন্য সরাসরি আহ্বান না জানানো হলেও, গত ১৬ জুন ফ্রান্সে অনুষ্ঠিত জি৭ শীর্ষ সম্মেলনে মার্কিন প্রেসিডেন্ট এ বিষয়ে অনেক বেশি স্পষ্ট ও সরাসরি বক্তব্য দেন।
সাংবাদিকদের মুখোমুখি হয়ে ট্রাম্প বলেন, ‘আমি ইসরায়েলকে পরামর্শ দিয়েছি হিজবুল্লাহর বিষয়টি সিরিয়ার ওপর ছেড়ে দিতে। কারণ সত্যি বলতে, আমার মনে হয় তারা এই কাজটি আরও ভালোভাবে করতে পারবে।’
এ সময় হিজবুল্লাহকে পরাজিত করতে দীর্ঘসূত্রিতা, বিপুলসংখ্যক বেসামরিক নাগরিক হত্যা এবং নির্বিচারে আবাসিক ভবন ধ্বংস করার জন্য ইসরায়েলের তীব্র সমালোচনা করেন তিনি। ট্রাম্প আরও মন্তব্য করেন, সিরিয়ার ওপর নিজের নিয়ন্ত্রণ সুসংহত করতে শারা একটি ‘অসাধারণ কাজ’ করেছেন এবং শারা হিজবুল্লাহকে মোটেও ‘পছন্দ করেন না’।
জি৭ শীর্ষ সম্মেলনের পরদিন সাংবাদিকদের পক্ষ থেকে জানতে চাওয়া হয়েছিল যে, প্রেসিডেন্ট আল-শারার সঙ্গে হিজবুল্লাহ নিয়ে তার কোনো আলোচনা হয়েছে কি না। জবাবে ট্রাম্প ‘হ্যাঁ’ সূচক উত্তর দিলেও, সিরিয়ার প্রেসিডেন্ট এই প্রস্তাবে শেষ পর্যন্ত রাজি হয়েছেন কি না; তা বলতে অস্বীকৃতি জানান। বিষয়টি পরে জানাবেন বলে মন্তব্য করেন।
ট্রাম্প ও শারার মধ্যকার এই কথোপকথন থেকে রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের ধারণা, হিজবুল্লাহ দমনে সিরিয়াকে দায়িত্ব দেওয়ার বিষয়টি কেবল ইসরায়েলকে উদ্দেশ্য করে বলা ট্রাম্পের কোনো বিমূর্ত বা কাল্পনিক প্রস্তাব ছিল না; বরং এই সম্ভাব্য ভূমিকার বিষয়টি ওয়াশিংটন সরাসরি দামেস্কের কাছেই উত্থাপন করেছে।
দামেস্কের প্রতিক্রিয়া
প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের এমন ধারাবাহিক মন্তব্যের বিপরীতে সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোতে সিরিয়ার প্রেসিডেন্ট আহমেদ আল-শারা নিজের অবস্থান পরিষ্কার ও জল্পনা-কল্পনা খণ্ডন করার জোর চেষ্টা চালিয়েছেন।
গত ১১ জুন দামেস্কের গ্রামাঞ্চলের বিশিষ্ট ব্যক্তিদের সঙ্গে আয়োজিত এক বৈঠকে তিনি স্পষ্ট জানিয়ে দেন, লেবাননে সিরীয় বাহিনীর আসন্ন প্রবেশের যে খবর ছড়ানো হচ্ছে, তা ‘সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন গুজব ছাড়া আর কিছুই নয়’।
পরবর্তীতে সিরিয়ার প্রেসিডেন্টের উপদেষ্টা আহমেদ মুওয়াফফাক জাইদান সৌদিভিত্তিক সংবাদমাধ্যম ‘আল-অ্যারাবিয়া’কে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে এই গোপন আলোচনার সত্যতা নিশ্চিত করেন।
তিনি জানান, আঞ্চলিক উত্তেজনা বৃদ্ধির সময় ওয়াশিংটনের পক্ষ থেকে সিরিয়ার এই সম্পৃক্ততার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছিল; কিন্তু দামেস্ক লেবাননে যে কোনো ধরনের সামরিক বা নিরাপত্তা ভূমিকা পালনের প্রস্তাব সরাসরি প্রত্যাখ্যান করেছে।
উপদেষ্টা জাইদান সিরিয়ার ভবিষ্যত নীতি স্পষ্ট করে আরও বলেন, সিরিয়া পুরো লেবাননজুড়ে দেশটির রাষ্ট্রীয় কর্তৃত্ব ও সার্বভৌমত্ব সম্প্রসারণকে নীতিগতভাবে সমর্থন করে।
তবে তা কোনোভাবেই লেবাননের মাটিতে সিরীয় বাহিনী মোতায়েনের মাধ্যমে নয়, বরং লেবাননের নিজস্ব রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোকে শক্তিশালী করার মাধ্যমে হওয়া উচিত বলে মনে করে দামেস্ক।







