স্কুল-ঘর কিছুই নেই, অনিশ্চয়তায় পরীক্ষায় বসছে গাজার শিক্ষার্থীরা

চলতি সপ্তাহটি সম্ভবত ১৮ বছর বয়সি ডানা শাবাতের জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সময়। স্কুলজীবনের গণ্ডি পেরিয়ে অবশেষে তিনি বসেছেন উচ্চবিদ্যালয়ের চূড়ান্ত পরীক্ষায়। ডানা বরাবরই অসাধারণ মেধাবী ছাত্রী। ক্লাসের পরীক্ষায় তার গড় নম্বর কখনেই ৯৯ শতাংশের নিচে নামেনি। এত ভালো ফলাফল থাকা সত্ত্বেও জীবনের বড় পরীক্ষাটি নিয়ে তিনি ভীষণ উদ্বিগ্ন।
ডানার চোখে, এই পরীক্ষাগুলোই তার ভবিষ্যৎ নিধার্রণে চূড়ান্ত ভূমিকা রাখবে। উচ্চশিক্ষার জন্য বিশ্ববিদ্যালয় কোন বিষয়ে পড়াশোনা করবে, তা নিয়ে তিনি এখনও পুরোপুরি নিশ্চিত হতে পারেননি। মেডিসিন, ফিন্যান্স নাকি বিজসে অ্যাডমিনিস্ট্রেশন কোনটি বেছে নেবেন, তা নিয়ে এখনও দ্বিধাদ্বন্দ্বে রয়েছেন তিনি।
তবে ডানার আশা, পরীক্ষায় কাঙ্ক্ষিত ফল করে বিদেশ স্কলারশিপ বা বৃত্তি নিশ্চিত করতে পারবেন। আর এর মাধ্যমেই তিনি গাজায় বছরের পর বছর ধরে সহ্য করা সীমাহীন কষ্ট ও দুর্দশা থেকে দূরে, নিজের জন্য একটি সুন্দর ও নিরাপদ ভবিষ্যৎ গড়ে তুলতে চান।
ইতোমধ্যে গাজায় ইসরায়েলের চালানো আড়াই বছরের বেশি সময়ের গণহত্যা দেখেছেন ডানা। গত বছরের মে মাসে একটি ইসরায়েলি হামলা থেকে বেঁচে গেলেও, ডানার মা লিনা সেই হামলায় প্রাণ হারান। ২০২৩ সালের অক্টোবর থেকে নিহত ৭৩ হাজারের বেশি ফিলিস্তিনির মধ্যে তার মা-ও একজন।
ফিলিস্তিনি শিক্ষার্থী ডানা উত্তর গাজার বেইত হানুন এলাকায় বড় হয়েছেন। কিন্তু ইসরায়েলি বাহিনী হামলা চালিয়ে ওই এলাকাটি সম্পূর্ণ ধ্বংস করে দিয়েছে। বেঁচে থাকা পরিবারের অন্যান্য সদস্যদের সঙ্গে মধ্য গাজার দেইর আল-বালাহর একটি তাঁবুতে বাস্তুচ্যুত হয়ে বসবাস করছেন তিনি।

ইসরায়েলি বাহিনীর হামলায় গাজার অসংখ্য শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ধ্বংস হয়ে গেছে। অবশিষ্ট থাকা অনেক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোই বর্তমানে বাস্তুচ্যুতদের আশ্রয়কেন্দ্র হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে। তাই ডানা তাঁবুতে বসেই তার পড়াশোনা চালিয়ে যাচ্ছেন। ‘তাওজিহি’ নামে পরিচিত পরীক্ষাগুরের ক্ষেত্রেও এর ব্যতিক্রম নয়।
জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ এই সপ্তাহের প্রতিটি দিন ডানাকে কাটাতে হচ্ছে চরম অনিশ্চয়তার মধ্য দিয়ে। প্রতিদিন ভোর হওয়ার আগেই ঘুম থেকে উঠে পড়তে হয় তাকে। এরপর টানা এক ঘণ্টা হেঁটে পৌঁছাতে হয় শহরের হাতেগোনা কয়েকটি ক্যাফের একটিতে। যেখানে অনলাইনে পরীক্ষা দেওয়ার মতো অন্তত কিছুটা ভালো ইন্টারনেট সংযোগের ওপর ভরসা করা যায়। সেখানে গিয়ে বসার মতো একটু জায়গা খুঁজে নেওয়ার জন্য চলে আরেক যুদ্ধ।
বাবা মুহান্না শাবাতের সঙ্গে হেঁটে পরীক্ষা কেন্দ্রে যাওয়ার পথে আলজাজিরাকে নিজের এই দুর্দশার কথা জানান ডানা। তিনি বলেন, ‘আমি কখনো কল্পনাও করিনি যে আমার জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পর্যায়টা এমন এক পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে কাটবে। (যুদ্ধের কারণে) তিন বছরের পড়াশোনা নষ্ট হওয়াই কি যথেষ্ট ছিল না? আমাকে প্রতিটি বিষয় নিজে নিজে একা একা শিখতে হয়েছে। আর এখন এই পরিস্থিতিতে পরীক্ষা দেওয়াটাও আমার জন্য চরম উদ্বেগ ও মানসিক চাপের আরেকটি বড় কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।’
পরীক্ষার সময়
ডানা এবার তাওজিহি (উচ্চমাধ্যমিক) পরীক্ষায় অংশগ্রহণকারী ৩৭ হাজার ফিলিস্তিনি শিক্ষার্থীদের একজন। গাজায় যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর এই প্রথম অধিকৃত পশ্চিম তীরের ফিলিস্তিনি কর্তৃপক্ষের সঙ্গে সমন্বয় করে এই পরীক্ষার আয়োজন করা হয়েছে।
তবে গাজার পরিস্থিতি পশ্চিম তীরের মতো নয়; পশ্চিম তীরে শিক্ষার্থীরা স্বাভাবিকভাবে স্কুলে ও পরীক্ষা কেন্দ্রে গিয়ে পরীক্ষা দিতে পারলেও, গাজার পরীক্ষার্থীদের সবাইকে অনলাইনে পরীক্ষায় বসতে হচ্ছে।
আজ (২৭ জুন) ডানার পদার্থবিজ্ঞান পরীক্ষা। এই কঠিন বিষয়টি যুদ্ধাবস্থার মধ্যে সামলানো তার জন্য মোটেও সহজ ছিল না। এই কলেজছাত্রী বলেন, ‘পদার্থবিজ্ঞানের জন্য গভীর মনোযোগের প্রয়োজন। কিন্তু আমি মাত্র কয়েকটি প্রাইভেট টিউশন আর ইউটিউব ভিডিওর সাহায্য নিয়ে সম্পূর্ণ নিজে নিজেই পুরো বিষয়টা পড়ে শেষ করেছি।’
পরীক্ষার দিন খুব ভোরে রওনা হওয়া সত্ত্বেও ক্যাফেতে পৌঁছে ডানা দেখেন, সেখানে তার আগেই আরও কয়েক ডজন পরীক্ষার্থী হাজির হয়ে গেছে। সকাল ৯টায় পরীক্ষা শুরুর নির্ধারিত সময়ে সব শিক্ষার্থী চুপচাপ কাছাকাছি রাখা টেবিলগুলোতে বসে পড়ে। এরপর অনলাইন পরীক্ষা পোর্টাল খোলার অপেক্ষায় তারা নিজ নিজ ফোন আনলক করে, যে ডিভাইসের মাধ্যমে তাদের পরীক্ষা দিতে হবে।

পরীক্ষা শুরুর ঠিক আগমুহূর্তে প্রতিটি শিক্ষার্থী তাদের ইন্টারনেট সংযোগের গতি পরীক্ষা করে নিচ্ছিল। ওদিকে ডানার বাবা ক্যাফের মালিকের কাছে গিয়ে নিশ্চিত হয়ে নেন যে, বিদ্যুৎ ব্যবস্থা ঠিকঠাক আছে কি না। সব তদারকি শেষ করে তিনি অন্য অভিভাবকদের সঙ্গে ক্যাফের বাইরে অপেক্ষার প্রহর গুনতে যান।
মুহান্না বলেন, ‘ডানাকে এই সংকটময় বছরটি পার করতে সাহায্য করার জন্য আমি আমার সমস্ত আর্থিক সম্পদ উৎসর্গ করেছি’। যুদ্ধের আগে তিনি নিজে রসায়নের শিক্ষক হিসেবে কাজ করতেন। তিনি আরও বলেন, ‘আমাদের পরিস্থিতি যতই কঠিন হোক না কেন, আমি সংসারের অন্যান্য প্রয়োজন বিসর্জন দিয়েছি; শুধু ওর দুর্বল বিষয়গুলো বুঝিয়ে দেওয়ার জন্য গৃহশিক্ষকের খরচ জোগাতে পারি।’
তবে মুহান্না এখন তার সাধ্যমতো সবকিছুই করেছেন। ডানার পড়াশোনার সাফল্য এখন তার নিজের মেধা ও চেষ্টার ওপরই নির্ভর করছে। ক্যাফের বাইরে দাঁড়িয়ে অপেক্ষার এই দীর্ঘ মুহূর্তগুলোতেই মুহান্না বারবার ফিরে যাচ্ছিলেন যুদ্ধের আগের তাদের সুন্দর দিনগুলোতে।
সেই অতীতের কথা স্মরণ করে তিনি বলেন, ‘আমাদের জীবনটা চমৎকার ছিল। আমাদের একটি সুন্দর বাড়ি ছিল, জীবনে স্থিতিশীলতা ছিল। আমি ও আমার স্ত্রী সবসময় নিশ্চিত করতাম যে আমাদের মেয়েদের যা কিছু প্রয়োজন, তার সবই যেন তারা পায়।’
একটু থেমে দীর্ঘশ্বাস ফেলে মুহান্না বলে চলেন, ‘এখন সে সব কিছুই হারিয়ে গেছে। আমরা প্রায় কোনো মৌলিক সুবিধা ছাড়াই একটি তাঁবুতে বাস করি। আর ছেলেমেয়েরা তাদের জীবনের অন্যতম সংবেদনশীল ও গুরুত্বপূর্ণ একটি পর্যায় এমন এক পরিস্থিতিতে পার করছে, যা কোনো মানুষেরই সহ্য করা উচিত নয়।’
তিনি আরও জানান, মায়ের অনুপস্থিতিতে ডানা তার বড় বোন হালার (মেডিকেল প্রথম বর্ষের ছাত্রী) সঙ্গে মিলে এখন তাদের তিন ছোট বোন রামা, সারা ও আলমার দেখাশোনা করেন। মাত্র তিন বছর বয়সী ছোট মেয়ে আলমা, তাদের মা লিনাকে কেড়ে নেওয়া সেই ভয়াবহ হামলায় নিজের ডান চোখটিও হারিয়েছে।

‘ওদের মা অত্যন্ত শিক্ষিত ছিলেন এবং শিক্ষার গুরুত্বে গভীরভাবে বিশ্বাস করতেন,’ বলতে বলতে মুহান্নার কণ্ঠ আবেগাক্রান্ত ও রুদ্ধ হয়ে আসে। তিনি বলেন, ‘আমার মেয়েরা রান্না করতে প্রায় জানতই না বললেই চলে; কারণ ওদের মা চাইতেন ওরা যেন ওদের সমস্ত শক্তি ও মনোযোগ শুধু পড়াশোনাতেই ব্যয় করে।’
মুহান্না জানান, লিনা যদি আজ বেঁচে থাকতেন, তবে তার আদরের মেয়েদের জীবনের এই চরম বিপর্যয় ও কষ্টের মুখোমুখি হতে দেখে তিনি অত্যন্ত মর্মাহত হতেন।
ডানার স্বপ্ন
ক্যাফেতে ঢোকার দীর্ঘ দুই ঘণ্টা পর অবশেষে বাইরে বেরিয়ে এলেন ডানা। মেয়েকে দেখেই উৎকণ্ঠা নিয়ে বাবা মুহান্না সঙ্গে সঙ্গে জিজ্ঞেস করলেন, ‘পরীক্ষা কেমন হলো? কঠিন ছিল?’
ডানা মুখে হাসি ফুটিয়ে উত্তর দিল, ‘সবকিছু ভালোভাবেই হয়েছে। প্রশ্নগুলো মানসম্মত ও ন্যায্য ছিল।’ বন্ধুদের বিদায় জানিয়ে পরিবারের তাঁবুর দিকে দীর্ঘ পথ হাঁটা শুরু করার আগে স্বস্তির সুরে তিনি আরও যোগ করলেন, ‘এবার অন্তত ইন্টারনেট সংযোগ ভালো ছিল। ভাগ্যিস, আগের পরীক্ষার মতো মাঝপথে সংযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়নি!’

দীর্ঘ পথ পেরিয়ে তাঁবুতে পৌঁছামাত্রই বোনেরা পরীক্ষা কেমন হয়েছে তা শোনার জন্য উৎসুক হয়ে ডানাকে স্বাগত জানায়। ক্যাম্পে বসবাসকারী প্রতিবেশী ও আত্মীয়স্বজনরাও দূর থেকেই তার খোঁজখবর নিতে আসেন।
কিন্তু একটু জিরিয়ে নেওয়ার আগেই ডানা পরবর্তী পরীক্ষার প্রস্তুতির কথা মাথায় রেখে নিজের এবং তার বাবার দুটো ফোনই চার্জ দেওয়ার জন্য দ্রুত একটি ‘চার্জিং স্টেশনে’ পাঠিয়ে দেয়। বিদ্যুৎ না থাকাটা এই যুদ্ধবিধ্বস্ত অঞ্চলে এক বড় সমস্যা, কিন্তু গাজার আরও লাখো মানুষের মতো ডানাকেও প্রতিদিন এই চরম সংকটের সঙ্গেই মানিয়ে নিতে হচ্ছে।
ডানার বর্তমান জীবন নানা সমস্যা ও অনিশ্চয়তায় পরিপূর্ণ। ইসরায়েলের সঙ্গে যুদ্ধবিরতির আট মাস কেটে গেলেও গাজার পুনর্গঠন প্রক্রিয়া এখনো অনেক দূরের ব্যাপার বলে মনে হচ্ছে; তার ওপর মাঝে মাঝেই চলছে ইসরায়েলি হামলা।
ডানা জানেন না তিনি কবে নিজের শহর বেইত হানুনে ফিরতে পারবেন, আদৌ কোনো দিন ফিরতে পারবে কি না। আর এটাও তার জানা নেই যে, এই এক চিলতে তাঁবুতে তাকে আর কত দিন মানবেতর জীবন কাটাতে হবে।
এত অভাব আর অনিশ্চয়তার মধ্যেও ডানা কিন্তু ভবিষ্যতের স্বপ্ন দেখা ছাড়েনি। তিনি জানান, বড় হয়ে তিনি একজন সমাজনেতা হতে চান, এমন একজন মানুষ; যিনি সমাজে ইতিবাচক প্রভাব ফেলবেন। তিনি নতুন নতুন ভাষা শিখতে চান এবং জীবনে যা-ই করবে, তাতেই সেরা হতে চান। আর সবকিছুর শেষে, একটা নিরাপদ জীবন পেতে চান এবং তার স্বর্গীয় মাকে গর্বিত করতে চান।
তাঁবুর এক কোণে দাঁড়িয়ে ডানা বলেন, ‘আমি আশা করি এই খাঁচাসদৃশ তাঁবুগুলোতে আমাদের এই সীমাহীন কষ্টের অবশেষে অবসান ঘটবে। আর আমি ঠিক সেই সফল মানুষটি হতে পারব, যেমনটা আমার মা সবসময় আমাকে দেখতে চেয়েছিলেন।’
সূত্র: আলজাজিরা





