রোনালদো-রিভালদোদের রেকর্ড ছুঁল ফ্রান্সের ত্রয়ী

এশিয়া পোস্ট স্পোর্টস
রোনালদো-রিভালদোদের রেকর্ড ছুঁল ফ্রান্সের ত্রয়ী
ফ্রান্সের অ্যাটাকিং ত্রয়ী দেম্বেলে, এমবাপ্পে ও ওলিসে। ছবি: সংগৃহীত

২০০২ বিশ্বকাপের ব্রাজিল মানেই রোনালদো, রিভালদো ও রোনালদিনহোর জাদু। সেই ত্রয়ীর আক্রমণভাগে ভর করেই পঞ্চম বিশ্বকাপ জিতেছিল ব্রাজিল। এবার ২০২৬ বিশ্বকাপে সেই ঐতিহাসিক আক্রমণভাগের এক কীর্তির পাশে বসেছে ফ্রান্সের কিলিয়ান এমবাপ্পে, ওসমান দেম্বেলে ও মাইকেল ওলিসে।

চলতি বিশ্বকাপে ফ্রান্সের আক্রমণভাগ ভয়ংকর ছন্দে। এমবাপ্পে গোল করছেন নিয়মিত। দেম্বেলে গতি, ড্রিবলিং ও সরাসরি আক্রমণে প্রতিপক্ষকে ভাঙছেন। আর ওলিসে পাস, মুভমেন্ট ও অ্যাসিস্টে ফ্রান্সের আক্রমণকে আরও ধারালো করে তুলেছেন। এই তিনজন মিলেই দিদিয়ের দেশমের দলকে টুর্নামেন্টের সবচেয়ে বিপজ্জনক দলগুলোর একটিতে পরিণত করেছেন।

সুইডেনের বিপক্ষে শেষ ৩২-এর ম্যাচে সেই আক্রমণশক্তি আবার দেখা গেছে। ফ্রান্স ৩-০ গোলে জিতেছে। এমবাপ্পে করেছেন জোড়া গোল, ব্র্যাডলি বারকোলা করেছেন আরেকটি। দুটি গোলেই বড় ভূমিকা ছিল ওলিসের। বারকোলার গোলের আগে তার পাস যেমন নিখুঁত ছিল, এমবাপ্পের দ্বিতীয় গোলের পাসটিও ছিল ম্যাচের অন্যতম সেরা মুহূর্ত।

এই ম্যাচের পর এমবাপ্পে, দেম্বেলে ও ওলিসে পৌঁছেছেন বিশেষ এক কীর্তিতে। এক বিশ্বকাপে একই দলের তিন খেলোয়াড়ের প্রত্যেকের অন্তত পাঁচটি করে গোল-অবদান, অর্থাৎ গোল বা অ্যাসিস্ট, ২১ শতকে এর আগে দেখা গিয়েছিল শুধু একবার। সেটি ২০০২ সালের ব্রাজিলের রোনালদো, রিভালদো ও রোনালদিনহো ত্রয়ীর ক্ষেত্রে।

২০০২ বিশ্বকাপে রোনালদো করেছিলেন ৮ গোল। রিভালদো করেছিলেন ৫ গোল। রোনালদিনিও করেছিলেন ২ গোল, সঙ্গে গুরুত্বপূর্ণ অ্যাসিস্টও ছিল। তিনজনের সম্মিলিত প্রভাব ব্রাজিলকে নিয়ে গিয়েছিল শিরোপায়। সেই দল এখনো বিশ্বকাপ ইতিহাসের অন্যতম সেরা আক্রমণভাগ হিসেবে বিবেচিত।

২০০২ বিশ্বকাপের সেই অ্যাটাকিং ত্রয়ী।
২০০২ বিশ্বকাপের সেই অ্যাটাকিং ত্রয়ী।

ফ্রান্সের বর্তমান ত্রয়ী এখন সেই তুলনায় উঠে এসেছে। রয়টার্সের হিসাব অনুযায়ী, চলতি আসরে এমবাপ্পে, দেম্বেলে ও ওলিসে মিলে চার ম্যাচে করেছেন ১১ গোল ও ৯ অ্যাসিস্ট। অর্থাৎ তিনজনের সম্মিলিত গোল-অবদান ২০। ওলিসে একাই করেছেন পাঁচ অ্যাসিস্ট, যা এক বিশ্বকাপে পেলের ছয় অ্যাসিস্টের রেকর্ড থেকে মাত্র একটি কম।

ফ্রান্সের পথচলাও সংখ্যায় ভয় ধরানোর মতো। গ্রুপ পর্বে সেনেগালকে ৩-১, ইরাককে ৩-০ এবং নরওয়েকে ৪-১ গোলে হারিয়েছে তারা। শেষ ৩২-এ সুইডেনকে ৩-০ গোলে হারিয়ে শেষ ষোলোয় উঠেছে দেশমের দল। চার ম্যাচে ফ্রান্সের গোল ১৩টি।

এমবাপ্পে এই বিশ্বকাপে শুধু ফ্রান্সের নয়, বিশ্বকাপ ইতিহাসেরও বড় গল্প হয়ে উঠেছেন। সুইডেনের বিপক্ষে জোড়া গোলের পর তার বিশ্বকাপ গোলসংখ্যা ১৮। লিওনেল মেসির ১৯ গোলের রেকর্ড থেকে তিনি এখন মাত্র এক গোল দূরে। ব্যক্তিগত রেকর্ডের পাশাপাশি ফ্রান্সের সম্মিলিত আক্রমণেও তার প্রভাব স্পষ্ট।

দেম্বেলেও এই বিশ্বকাপে নিজেকে নতুনভাবে প্রতিষ্ঠা করেছেন। নরওয়ের বিপক্ষে প্রথমার্ধেই হ্যাটট্রিক করে ফ্রান্সকে গ্রুপসেরা করার বড় ভূমিকা রেখেছিলেন তিনি। গতি, ড্রিবলিং, সরাসরি আক্রমণ এবং গোল করার ক্ষমতা দিয়ে ডান দিক থেকে বারবার প্রতিপক্ষকে চাপে রাখছেন দেম্বেলে।

আর ওলিসে এই ত্রয়ীর সবচেয়ে শান্ত কিন্তু সম্ভবত সবচেয়ে সৃজনশীল অংশ। বায়ার্ন মিউনিখের এই মিডফিল্ডার পাসের ফাঁক খুঁজে নিচ্ছেন, আক্রমণের গতি বদলাচ্ছেন এবং সতীর্থদের সহজ সুযোগ তৈরি করে দিচ্ছেন। পাঁচ অ্যাসিস্টই তাঁর প্রভাবের সবচেয়ে পরিষ্কার প্রমাণ।

ফ্রান্সের সামনে এখন শেষ ষোলোয় প্যারাগুয়ে। জার্মানিকে বিদায় করা প্যারাগুয়ে আত্মবিশ্বাস নিয়েই নামবে। তবে এমবাপ্পে, দেম্বেলে ও ওলিসে এমন ছন্দে থাকলে ফ্রান্সকে থামানো যে কোনো দলের জন্য কঠিন হবে।

২০০২ সালের ব্রাজিল শেষ পর্যন্ত শিরোপা জিতেছিল। ফ্রান্স এখনো সেই পথের মাঝপথেও পৌঁছায়নি। কিন্তু আক্রমণভাগের প্রভাব, গোলের ধার এবং তিন তারকার সমন্বয় তাদের বিশ্বকাপ ইতিহাসের বড় আক্রমণত্রয়ীগুলোর আলোচনায় তুলেই দিয়েছে।

রোনালদো, রিভালদো ও রোনালদিনিওর পাশে নাম লেখা সহজ নয়। এমবাপ্পে, দেম্বেলে ও ওলিসে অন্তত সংখ্যার হিসাবে সেই দরজায় পৌঁছে গেছেন। এখন দেখার বিষয়, ২০০২ ব্রাজিলের মতো তারাও কি এই আক্রমণশক্তিকে শিরোপায় রূপ দিতে পারেন।