বিশ্বকাপ শেষে চাকরি হারালেন যে কোচরা

বিশ্বকাপ শুধু দলগুলোর স্বপ্ন শেষ করে না, অনেক কোচের অধ্যায়ও শেষ করে দেয়। ২০২৬ বিশ্বকাপেও সেই চেনা ছবি দেখা যাচ্ছে। গ্রুপ পর্ব ও শেষ ৩২ মিলিয়ে একের পর এক দল বিদায় নেওয়ার সঙ্গে সঙ্গে শুরু হয়েছে কোচ বদলের ধাক্কা। কেউ বরখাস্ত হয়েছেন, কেউ নিজেই সরে দাঁড়িয়েছেন, আবার কারও ভবিষ্যৎ এখনো অনিশ্চিত।
এখন পর্যন্ত নিশ্চিত পরিবর্তনের তালিকায় আছে তিউনিসিয়া, স্কটল্যান্ড, দক্ষিণ কোরিয়া, চেক প্রজাতন্ত্র, নেদারল্যান্ডস, উরুগুয়ে ও ইকুয়েডর। এর বাইরে জার্মানি, তুরস্ক ও দক্ষিণ আফ্রিকার কোচিং ভবিষ্যৎ নিয়েও আলোচনা আছে।
সবচেয়ে দ্রুত সিদ্ধান্ত এসেছিল তিউনিসিয়ার ক্ষেত্রে। সুইডেনের কাছে প্রথম ম্যাচে ৫-১ গোলে হারের পর সাবরি লামুশিকে বরখাস্ত করা হয়। মাত্র এক ম্যাচের পর বিশ্বকাপে কোনো কোচকে সরিয়ে দেওয়ার বিরল নজির এটি। এরপর স্বল্প মেয়াদে দায়িত্ব দেওয়া হয় হার্ভে রেনার্ডকে। কিন্তু তিউনিসিয়া আর ঘুরে দাঁড়াতে পারেনি। জাপান ও নেদারল্যান্ডসের কাছেও হেরে গ্রুপ পর্ব থেকেই বিদায় নেয় তারা। রেনার্ডের ভবিষ্যৎও তাই ফেডারেশনের পরবর্তী সিদ্ধান্তের অপেক্ষায়।
স্কটল্যান্ডের বিদায়ের পর পদত্যাগ করেছেন স্টিভ ক্লার্ক। দীর্ঘ সময় দায়িত্বে থেকে স্কটল্যান্ডকে বড় মঞ্চে ফেরালেও ২০২৬ বিশ্বকাপে দলকে এগিয়ে নিতে পারেননি তিনি। ব্রাজিল ও মরক্কোর কাছে হার, হাইতির বিপক্ষে জয়, সব মিলিয়ে তিন পয়েন্ট নিয়েও শেষ ৩২-এ উঠতে পারেনি স্কটল্যান্ড। বিদায়ের পর নিজের সাত বছরের অধ্যায় শেষ করেন ক্লার্ক।
দক্ষিণ কোরিয়ার ক্ষেত্রেও পরিবর্তন এসেছে। গ্রুপ পর্ব থেকে বিদায়ের পর পদত্যাগ করেছেন কোচ হং মিয়ং-বো। মেক্সিকো ও দক্ষিণ আফ্রিকার কাছে হারের পর নকআউটে উঠতে পারেনি দক্ষিণ কোরিয়া। দেশে সমালোচনা বাড়ছিল, শেষ পর্যন্ত দায়িত্ব ছাড়েন সাবেক এই ডিফেন্ডার।
চেক প্রজাতন্ত্রের কোচ মিরোস্লাভ কৌবেকও দায়িত্ব ছেড়েছেন। চেক প্রজাতন্ত্র গ্রুপ ‘এ’-তে মাত্র এক পয়েন্ট নিয়ে তলানিতে শেষ করে। দক্ষিণ আফ্রিকার সঙ্গে ড্র করলেও দক্ষিণ কোরিয়া ও মেক্সিকোর কাছে হেরে যায় তারা। ২০০৬ সালের পর প্রথমবার বিশ্বকাপে ফিরেছিল চেক প্রজাতন্ত্র, কিন্তু প্রত্যাশা পূরণ না হওয়ায় কৌবেকের অধ্যায় শেষ হয়ে যায়।
নেদারল্যান্ডসের বিদায় ছিল আরও তিক্ত। মরক্কোর কাছে টাইব্রেকারে হেরে শেষ ৩২ থেকেই ছিটকে যায় ডাচরা। এরপর দায়িত্ব ছাড়ার ঘোষণা দেন রোনাল্ড কোমান। দলের ব্যর্থতার দায় নেওয়ার পাশাপাশি ব্যক্তিগত কারণও তার সিদ্ধান্তে ভূমিকা রেখেছে। ফলে নেদারল্যান্ডসকেও নতুন কোচ খুঁজতে হবে।
উরুগুয়ের ব্যর্থতার পর সরে দাঁড়িয়েছেন মার্সেলো বিয়েলসা। তার অধীনে বড় আশা নিয়ে বিশ্বকাপে এলেও উরুগুয়ে গ্রুপ পর্ব পেরোতে পারেনি। সৌদি আরব ও কেপ ভার্দের সঙ্গে ড্র, স্পেনের কাছে হার, সব মিলিয়ে জয়হীন বিশ্বকাপ শেষ করে দুইবারের বিশ্বচ্যাম্পিয়নরা। বিদায়ের পর সংবাদ সম্মেলনে হতাশা ও দায় দুটিই স্বীকার করেন অভিজ্ঞ আর্জেন্টাইন কোচ।

ইকুয়েডরের কোচ সেবাস্তিয়ান বেকাসেসেও দায়িত্ব ছাড়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। গ্রুপ পর্বে জার্মানিকে হারিয়ে আলোচনায় এলেও শেষ ৩২-এ মেক্সিকোর কাছে ২-০ গোলে হেরে বিদায় নেয় ইকুয়েডর। টুর্নামেন্ট শেষে তার চুক্তিও শেষ হয়ে যায়। বেকাসেসে জানিয়ে দেন, ইকুয়েডরের সঙ্গে তার পথ এখানেই শেষ।

সব মিলিয়ে বিশ্বকাপের মাঝপথেই কয়েকটি দল নতুন কোচ খোঁজার পর্যায়ে চলে গেছে। তিউনিসিয়া, স্কটল্যান্ড, দক্ষিণ কোরিয়া, চেক প্রজাতন্ত্র, নেদারল্যান্ডস, উরুগুয়ে ও ইকুয়েডরের ক্ষেত্রে পরিবর্তন পরিষ্কার। আরও কয়েকটি দলের ক্ষেত্রে সিদ্ধান্ত এখনো আসেনি, তবে প্রশ্ন উঠেছে জোরালোভাবেই।
চাপের মুখে আছেন জার্মানির ইউলিয়ান নাগেলসমানও। প্যারাগুয়ের কাছে টাইব্রেকারে হেরে শেষ ৩২ থেকে বিদায় নিয়েছে চারবারের বিশ্বচ্যাম্পিয়নরা। ২০১৮ ও ২০২২ বিশ্বকাপে গ্রুপ পর্ব থেকে বিদায়ের পর ২০২৬ সালেও আগেভাগে ছিটকে যাওয়া জার্মান ফুটবলের জন্য বড় ধাক্কা। নাগেলসমান বলেছেন, তিনি নিজে থেকে সরে দাঁড়াতে চান না। কিন্তু তার ভবিষ্যৎ নিয়ে সিদ্ধান্ত এখন জার্মান ফুটবল ফেডারেশনের হাতে।

জার্মানির কোচিং পদের আলোচনায় ইয়ুর্গেন ক্লপের নামও এসেছে। তবে এটি এখনো সম্ভাবনা ও গণমাধ্যমের আলোচনার জায়গাতেই আছে। নাগেলসমানের চেয়ারে চাপ থাকলেও পরিবর্তন হবে কি না, সেটি নিশ্চিত নয়।
তুরস্কের কোচ ভিনচেনজো মন্তেল্লার ভবিষ্যৎ নিয়েও সমালোচনা উঠেছিল। তবে তুর্কি ফুটবল ফেডারেশন আপাতত তার পাশে থাকার ইঙ্গিত দিয়েছে। মন্তেল্লা নিজেও পদত্যাগ করতে চান না বলে জানিয়েছেন। তাই তাকে নিশ্চিত পরিবর্তনের তালিকায় রাখা যাচ্ছে না।
দক্ষিণ আফ্রিকার অভিজ্ঞ কোচ হুগো ব্রোসের ক্ষেত্রেও পরিস্থিতি আলাদা। তিনি আগেই ইঙ্গিত দিয়েছিলেন, বিশ্বকাপের পর কোচিং ক্যারিয়ার শেষ করতে পারেন। দক্ষিণ আফ্রিকা শেষ ৩২ থেকে বিদায় নেওয়ার পর তাঁর ভবিষ্যৎ নিয়ে প্রশ্ন আরও বেড়েছে। তবে সেটি সরাসরি বরখাস্ত বা ব্যর্থতার পর তাৎক্ষণিক পদত্যাগের ঘটনা নয়।
বিশ্বকাপের মতো বড় টুর্নামেন্টে ব্যর্থতার মূল্য অনেক সময় খুব দ্রুত দিতে হয়। কখনো ফেডারেশন সিদ্ধান্ত নেয়, কখনো কোচ নিজেই বোঝেন তাঁর সময় শেষ। ২০২৬ বিশ্বকাপেও সেই চেনা চিত্রই দেখা যাচ্ছে।
টুর্নামেন্ট এখনো শেষ হয়নি। কিন্তু কয়েকটি দলের নতুন অধ্যায় শুরু হয়ে গেছে। মাঠে যারা বিদায় নিয়েছে, তাদের অনেকে এখন ড্রেসিংরুমেও নতুন নেতৃত্ব খুঁজবে। বিশ্বকাপের ফল শুধু স্কোরলাইনে নয়, কোচদের ভবিষ্যতেও বড় প্রভাব ফেলছে।
১. সাবরি লামুশি, তিউনিসিয়া
২. স্টিভ ক্লার্ক, স্কটল্যান্ড
৩. হং মিয়ং-বো, দক্ষিণ কোরিয়া
৪. মিরোস্লাভ কৌবেক, চেকিয়া
৫. রোনাল্ড কোমান, নেদারল্যান্ডস
৬. মার্সেলো বিয়েলসা, উরুগুয়ে
৭. সেবাস্তিয়ান বেকাসেসে, ইকুয়েডর
১. হার্ভে রেনার্ড, তিউনিসিয়া
২. ইউলিয়ান নাগেলসমান, জার্মানি
৩. ভিনচেনজো মন্তেল্লা, তুরস্ক
৪. হুগো ব্রোস, দক্ষিণ আফ্রিকা




