৩৬ বছর পর শেষ ষোলোতেই থামল ব্রাজিল

এশিয়া পোস্ট স্পোর্টস
৩৬ বছর পর শেষ ষোলোতেই থামল ব্রাজিল
ছবি: সংগৃহীত

নরওয়ের কাছে হার শুধু ব্রাজিলের আরেকটি বিশ্বকাপ-বিদায় নয়। এটি ৩৬ বছরের মধ্যে তাদের সবচেয়ে হতাশাজনক বিশ্বকাপ অভিযান। ১৯৯০ সালের পর প্রথমবার কোয়ার্টার ফাইনালের আগেই থেমে গেল পাঁচবারের বিশ্বচ্যাম্পিয়নদের পথচলা।

নিউ জার্সিতে শেষ ষোলোর ম্যাচে নরওয়ের কাছে ২-১ গোলে হেরে বিদায় নিয়েছে ব্রাজিল। আর্লিং হালান্ডের জোড়া গোল কার্লো আনচেলত্তির দলকে বিশ্বকাপ থেকে ছিটকে দেয়। যোগ করা সময়ে নেইমার পেনাল্টি থেকে ব্যবধান কমালেও সেটি আর ব্রাজিলকে বাঁচাতে পারেনি।

এই বিদায় ব্রাজিলের জন্য পরিসংখ্যানেও বড় ধাক্কা। ১৯৯০ বিশ্বকাপে শেষ ষোলোতে আর্জেন্টিনার কাছে ১-০ গোলে হেরে বিদায় নিয়েছিল ব্রাজিল। এরপর ১৯৯৪ থেকে ২০২২ পর্যন্ত প্রতিটি বিশ্বকাপেই অন্তত কোয়ার্টার ফাইনালে উঠেছিল সেলেসাওরা। এবার সেই ধারাই ভেঙে গেল।

১৯৯৪ সালে যুক্তরাষ্ট্র বিশ্বকাপে চ্যাম্পিয়ন হয়েছিল ব্রাজিল। ১৯৯৮ সালে ফাইনালে উঠেছিল, যদিও ফ্রান্সের কাছে হেরে রানার্সআপ হয়। ২০০২ সালে রোনালদো নাজারিওর জোড়া গোলে জার্মানিকে হারিয়ে পঞ্চম বিশ্বকাপ জেতে তারা। এরপর ২০০৬, ২০১০, ২০১৮ ও ২০২২ সালে কোয়ার্টার ফাইনাল থেকে বিদায় নেয় ব্রাজিল। ২০১৪ সালে ঘরের মাঠে সেমিফাইনালে উঠলেও জার্মানির কাছে ৭-১ গোলের সেই দুঃস্বপ্নের হার এখনো ব্রাজিলিয়ান ফুটবলের সবচেয়ে বেদনাদায়ক স্মৃতি।

কিন্তু ২০২৬ বিশ্বকাপের এই বিদায় আলাদা। কারণ এবার ব্রাজিল শেষ আটেও পৌঁছাতে পারেনি। নরওয়ের বিপক্ষে নামার আগে সুযোগ ছিল কয়েকটি পুরোনো অস্বস্তি একসঙ্গে কাটানোর। নরওয়েকে কখনো হারাতে না পারার রেকর্ড, ২০০২ সালের পর বিশ্বকাপ নকআউটে ইউরোপীয় দলের বিপক্ষে না জেতার ধারা, আর সাম্প্রতিক বিশ্বকাপে বড় ম্যাচে বারবার থেমে যাওয়ার প্রশ্ন—কোনোটিরই উত্তর দিতে পারল না আনচেলত্তির দল।

ম্যাচে ব্রাজিলের সুযোগ ছিল। প্রথমার্ধে পেনাল্টি পেয়েছিল তারা, কিন্তু ব্রুনো গিমারায়েসের শট ঠেকিয়ে দেন নরওয়ে গোলরক্ষক অরিয়ান নিয়ল্যান্ড। পরে এন্ডরিক নামার পর বড় সুযোগ পেয়েও গোল করতে পারেননি। ভিনিসিয়ুস জুনিয়র চেষ্টা করেছেন, কাসেমিরো মাঝমাঠে লড়েছেন, নেইমার শেষ দিকে নেমে পেনাল্টি থেকে গোলও করেছেন। কিন্তু নকআউট ফুটবলে শুধু সুযোগ তৈরি করলেই হয় না, সুযোগ কাজে লাগাতে হয়।

নরওয়ে সেই জায়গাতেই পার্থক্য গড়ে দেয়। অনেকক্ষণ চুপ থাকা হালান্ড শেষ সময়েই ম্যাচ নিজের করে নেন। ৭৮ মিনিটে আন্দ্রেয়াস শেলদেরুপের ক্রস থেকে গোল করে নরওয়েকে এগিয়ে দেন তিনি। ৮৯ মিনিটে আবারও হালান্ড, এবার আরও নির্মম ফিনিশিং। সেই দ্বিতীয় গোলেই কার্যত শেষ হয়ে যায় ব্রাজিলের আশা।

নেইমারের গোল আসে যোগ করা সময়ে। পেনাল্টি থেকে করা সেই গোল স্কোরলাইনকে ২-১ করে, কিন্তু ব্রাজিলের বিদায় আটকাতে পারেনি। হয়তো সেটি নেইমারের বিশ্বকাপ ক্যারিয়ারের শেষ গোল হিসেবেও থেকে যেতে পারে, আর সেই কারণেই মুহূর্তটি আরও বিষণ্ণ।

কার্লো আনচেলত্তির প্রথম বিশ্বকাপ শেষ হলো তীব্র হতাশায়। ক্লাব ফুটবলের অন্যতম সফল কোচের হাতে ব্রাজিল নতুন ভারসাম্য খুঁজছিল। কিন্তু বিশ্বকাপের নকআউট মঞ্চে সেই পরিকল্পনা শেষ পর্যন্ত যথেষ্ট হলো না। পাকেতার চোট, রাফিনিয়ার পূর্ণ ফিট না থাকা, নেইমারের সীমিত ভূমিকা, আর আক্রমণে ধারাবাহিকতার অভাব—সব মিলিয়ে ব্রাজিলের অভিযান শেষ হলো প্রত্যাশার অনেক আগেই।

এই হারের পর ব্রাজিলকে আবারও কঠিন প্রশ্নের সামনে দাঁড়াতে হবে। কেন ইউরোপীয় প্রতিপক্ষের বিপক্ষে নকআউটে বারবার থেমে যাচ্ছে তারা? কেন তারকাভরা দলও বড় ম্যাচের গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্তে সিদ্ধান্ত নিতে পারছে না? কেন বিশ্বকাপের সবচেয়ে সফল দল ২০০২ সালের পর আর ফাইনালের কাছাকাছি যেতে পারছে না?