হালান্ডের জোড়া গোলে বিশ্বকাপ থেকে ব্রাজিলের বিদায়

এশিয়া পোস্ট স্পোর্টস
হালান্ডের জোড়া গোলে বিশ্বকাপ থেকে ব্রাজিলের বিদায়
ছবি: সংগৃহীত

নরওয়ের বিপক্ষে কখনো জয় পায়নি ব্রাজিল। সেই অস্বস্তিকর ইতিহাস বদলাতে নেমেছিল কার্লো আনচেলত্তির দল। কিন্তু শেষ পর্যন্ত ইতিহাস আরও ভারী হলো। আর্লিং হালান্ডের জোড়া গোলে ২-১ ব্যবধানে হেরে বিশ্বকাপের শেষ ষোলো থেকেই বিদায় নিয়েছে পাঁচবারের বিশ্বচ্যাম্পিয়নরা।

ইস্ট রাদারফোর্ডের নিউইয়র্ক নিউ জার্সি স্টেডিয়ামে ম্যাচটা ব্রাজিল শুরু করেছিল বড় প্রত্যাশা নিয়ে। সামনে ছিল শেষ আটে ওঠার সুযোগ, নরওয়ের বিপক্ষে প্রথম জয় পাওয়ার সুযোগ, ২০০২ সালের পর বিশ্বকাপ নকআউটে ইউরোপীয় দলের বিপক্ষে না জেতার অস্বস্তি কাটানোর সুযোগ। কিন্তু সব হিসাব শেষ পর্যন্ত ভেঙে দিলেন হালান্ড।

ম্যাচের শুরুতেই সতর্কবার্তা পেয়েছিল ব্রাজিল। নরওয়ের একটি গোল অফসাইডে বাতিল হয়। এরপর ধীরে ধীরে বল পায়ে নিয়ন্ত্রণ বাড়ায় ব্রাজিল। ভিনিসিয়ুস জুনিয়র বাঁ দিক দিয়ে বারবার জায়গা খুঁজছিলেন, কাসেমিরো ও ব্রুনো গিমারায়েস মাঝমাঠে আক্রমণের গতি বাড়ানোর চেষ্টা করছিলেন। কিন্তু গোলের সামনে সেই শেষ সিদ্ধান্তটা আসছিল না।

ব্রাজিলের সবচেয়ে বড় সুযোগ আসে পেনাল্টি থেকে। কিন্তু ব্রুনো গিমারায়েসের নেওয়া স্পটকিক ঠেকিয়ে দেন নরওয়ে গোলরক্ষক ওরিয়ান নিয়ল্যান্ড। নকআউট ম্যাচে এমন সুযোগ হাতছাড়া করলে তার মূল্য দিতে হয়। ব্রাজিল সেটিই দিয়েছে সবচেয়ে নির্মমভাবে।

দ্বিতীয়ার্ধেও ম্যাচ ছিল দোলাচলে। কখনো ব্রাজিল, কখনো নরওয়ে। আনচেলত্তি আক্রমণে নতুন গতি আনতে এন্ডরিককে নামান। প্রথম স্পর্শেই বড় সুযোগ পেয়েছিলেন তরুণ ফরোয়ার্ড। ভিনিসিয়ুসের পাসে একা হয়ে গিয়েও নিয়ল্যান্ডকে হারাতে পারেননি। সেই সেভও পরে ম্যাচের বড় মুহূর্ত হয়ে ওঠে।

৬৬ মিনিটে মাঠে নামেন নেইমার। অনেকেই ভেবেছিলেন, অভিজ্ঞতার আলো হয়তো ব্রাজিলকে পথ দেখাবে। কিন্তু উল্টো সেই সময়ের পরই ম্যাচের নিয়ন্ত্রণ ধীরে ধীরে নরওয়ের দিকে যেতে থাকে। ব্রাজিলের রক্ষণে ফাঁক বাড়তে থাকে, আর নরওয়ে অপেক্ষা করছিল ঠিক সেই মুহূর্তের জন্য।

৭৯ মিনিটে প্রথম আঘাত হানেন হালান্ড। আন্দ্রেয়াস শেলদেরুপের ক্রস থেকে শক্তিশালী হেডে গোল করে নরওয়েকে এগিয়ে দেন ম্যানচেস্টার সিটির স্ট্রাইকার। এতক্ষণ তুলনামূলক শান্ত থাকা হালান্ড যেন এক মুহূর্তেই ম্যাচের সব আলো নিজের দিকে টেনে নেন।

ব্রাজিল তখন মরিয়া হয়ে ওঠে। কিন্তু নরওয়ে বড় ম্যাচের শেষ সময় সামলানোর পরিণত সাহস দেখায়। শেষ দিকে আবারও হালান্ড। এবার ঠান্ডা মাথার ফিনিশিংয়ে ব্যবধান ২-০। সেই গোলেই কার্যত শেষ হয়ে যায় ব্রাজিলের বিশ্বকাপ স্বপ্ন।

যোগ করা সময়ে পেনাল্টি থেকে গোল করেন নেইমার। স্কোরলাইন হয় ২-১। কিন্তু তখন সময় আর ছিল না। নেইমারের গোলটি হয়ে থাকে সান্ত্বনা, সম্ভবত তার বিশ্বকাপ জীবনের সবচেয়ে বিষণ্ণ মুহূর্তগুলোর একটি। গোল করেও তিনি ব্রাজিলকে ফিরিয়ে আনতে পারেননি।

এই জয়ে হালান্ডের এবারের বিশ্বকাপ গোলসংখ্যা দাঁড়াল ৭। প্রথম বিশ্বকাপেই তিনি গোল্ডেন বুটের লড়াইয়ে একেবারে সামনে উঠে এলেন। এতদিন যাকে শুধু ক্লাব ফুটবলের ভয়ংকর গোলশিকারি বলা হতো, এবার বিশ্বকাপের নকআউটেও তিনি একই নির্মমতা দেখালেন।

ব্রাজিলের জন্য এই হার শুধু আরেকটি বিদায় নয়। ২০০২ সালের পর বিশ্বকাপ নকআউটে ইউরোপীয় প্রতিপক্ষের বিপক্ষে না জেতার ধারাও চলতে থাকল। ২০০৬ সালে ফ্রান্স, ২০১০ সালে নেদারল্যান্ডস, ২০১৪ সালে জার্মানি, ২০১৮ সালে বেলজিয়াম, ২০২২ সালে ক্রোয়েশিয়া, এবার নরওয়ে। ইউরোপ আবারও থামিয়ে দিল ব্রাজিলকে।

আনচেলত্তির প্রথম বিশ্বকাপ শেষ হলো তীব্র হতাশায়। তিনি ব্রাজিলকে ভারসাম্য দিতে চেয়েছিলেন, ভিনিসিয়ুসকে মুক্ত করতে চেয়েছিলেন, মাঝমাঠে কাসেমিরো ও ব্রুনোর ওপর ভরসা করেছিলেন। কিন্তু নকআউট ফুটবল অনেক সময় পরিকল্পনার চেয়ে মুহূর্তে ঠিক হয়। ব্রুনোর মিস পেনাল্টি, এন্ডরিকের হাতছাড়া সুযোগ, আর হালান্ডের দুই নিখুঁত ফিনিশ, এই তিন জায়গাতেই ম্যাচের ভাগ্য লেখা হয়ে যায়।

নরওয়ের জন্য এটি ঐতিহাসিক রাত। ১৯৯৮ সালের স্মৃতি থেকে শুরু করে ব্রাজিলের বিপক্ষে অপরাজিত থাকার ধারাকে তারা এবার বিশ্বকাপ নকআউটের সবচেয়ে বড় জয়ে পরিণত করল। হালান্ডরা শুধু ব্রাজিলকে হারায়নি, নিজেদেরও নতুন করে পরিচয় করিয়ে দিল বিশ্বমঞ্চে।

ব্রাজিল আবার ফিরবে প্রশ্ন নিয়ে। কেন বড় ম্যাচে শেষ স্পর্শ হারিয়ে যায়? কেন ইউরোপীয় শৃঙ্খলার সামনে বারবার থেমে যায় সেলেসাওদের স্বপ্ন? কেন তারকায় ভরা দলও নকআউটের চাপ সামলাতে পারে না?

উত্তর পরে খোঁজা যাবে। আপাতত সত্যিটা নির্মম। হালান্ডের নরওয়ে কোয়ার্টার ফাইনালে, আর ব্রাজিলের বিশ্বকাপ শেষ।