পূর্ণাঙ্গ কমিটি নেই ২০ বছর, ঝিনাইদহ-৪ আসনে বিএনপিতে তিন গ্রুপ

এশিয়া পোস্ট নিউজ, ঝিনাইদহ
পূর্ণাঙ্গ কমিটি নেই ২০ বছর, ঝিনাইদহ-৪ আসনে বিএনপিতে তিন গ্রুপ
বাঁ থেকে— সাইফুল ইসলাম ফিরোজ, হামিদুল ইসলাম হামিদ ও রাশেদ খান। ছবি: সংগৃহীত

এক সময়ের শক্ত ঘাঁটি ঝিনাইদহ-৪ (সদর আংশিক ও কালীগঞ্জ) আসনে টানা ১৭ বছর ক্ষমতার বাইরে থাকা বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলে (বিএনপি) অভ্যন্তরীণ বিভক্তি ও কোন্দল প্রকট হয়ে উঠেছে। দলীয় কোন্দল, মনোনয়ন দ্বন্দ্ব, বহিষ্কারের হিড়িক এবং সাংগঠনিক দুর্বলতার কারণে কালীগঞ্জ উপজেলা বিএনপির রাজনীতিতে এখন এক ধরনের অস্থিরতা ও অনিশ্চয়তা বিরাজ করছে। এখানে বিএনপি বিভক্ত হয়েছে তিনটি গ্রুপে।

সর্বশেষ ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনেও এই ভোট বিভক্তির কারণে আসনটি হাতছাড়া হয়েছে দলটির। এমনকি এখানে দলটির পূর্ণাঙ্গ কমিটির দেখা মেলেনি ২০ বছর। দীর্ঘ প্রতীক্ষার পরও উপজেলা বিএনপির পূর্ণাঙ্গ কমিটি ঘোষণা না হওয়ায় তৃণমূলের নেতাকর্মীদের মাঝে বাড়ছে হতাশা।

অতীত ঐতিহ্য ও ক্ষমতার হাতবদল

১৯৭৯ সালের দ্বিতীয় জাতীয় সংসদ নির্বাচনে তৎকালীন বৃহত্তর যশোর-৩ আসন থেকে বিএনপির মরহুম এবাদত হোসেন মন্ডল সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। এরপর ১৯৮২ থেকে ১৯৯০ সাল পর্যন্ত এরশাদ সরকারের আমলে আসনটি জাতীয় পার্টির নিয়ন্ত্রণে চলে যায়। তবে ১৯৯১ সালের পঞ্চম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিএনপির মরহুম আলহাজ এম. শহিদুজ্জামান বেল্টু সংসদ সদস্য নির্বাচিত হওয়ার পর টানা চারবার এই আসনটি ধরে রাখেন এবং এলাকায় ব্যাপক উন্নয়ন করেন।

২০০৮ সালের নবম সংসদ নির্বাচনে আওয়ামী লীগের প্রার্থী মরহুম আব্দুল মান্নানের কাছে শহিদুজ্জামান বেল্টুর পরাজয়ের পর থেকেই মূলত আসনটি বিএনপির হাতছাড়া হয়। রাজনৈতিক চাপ, মামলা-হামলা এবং শারীরিক অসুস্থতার কারণে এক পর্যায়ে বেল্টুর মাঠপর্যায়ের সক্রিয়তা কমে আসে, যার প্রভাব পড়ে দলীয় সাংগঠনিক কার্যকমে।

সংকটে তিন ধারা ও ২০১৮-র নির্বাচন

দলের কঠিন সময়ে উপজেলা বিএনপির তৎকালীন আহ্বায়ক মরহুম মাহবুবার রহমান এবং সাবেক সিনিয়র যুগ্ম আহ্বায়ক হামিদুল ইসলাম হামিদের নেতৃত্বে একটি পক্ষ রাজপথে সক্রিয় থাকে। অন্যদিকে শহিদুজ্জামান বেল্টুর অনুসারীরাও আলাদাভাবে কার্যক্রম চালায়। ২০১৮ সালের একাদশ সংসদ নির্বাচনকে কেন্দ্র করে এই বিভক্তি আরও চরম আকার ধারণ করে। সেবার সাবেক এমপি শহিদুজ্জামান বেল্টু, সাইফুল ইসলাম ফিরোজ, হামিদুল ইসলাম হামিদ ও হারুন অর রশীদ মোল্ল্যা মনোনয়ন দৌড়ে থাকলেও শেষ পর্যন্ত কেন্দ্র থেকে সাইফুল ইসলাম ফিরোজকে দলীয় প্রতীক দেওয়া হয়। তবে নির্বাচনে জয়ী হন আওয়ামী লীগের (মৃত) আনোয়ারুল আজীম আনার।

ওই নির্বাচনের পর উপজেলা বিএনপি কার্যত তিনটি ধারায় বিভক্ত হয়ে পড়ে—সাইফুল ইসলাম ফিরোজ, হামিদুল ইসলাম হামিদ এবং সাবেক এমপি শহিদুজ্জামান বেল্টুর সহধর্মিণী মুর্শিদা জামান বেল্টুর পৃথক তিনটি গ্রুপ নিজস্ব বলয় তৈরি করে রাজনীতিতে সক্রিয় থাকে।

ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচন ও নতুন সমীকরণ

সর্বশেষ ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ঝিনাইদহ-৪ আসনে বড় ধরনের রাজনৈতিক সমীকরণ ঘটে। স্থানীয় নেতাদের বাদ দিয়ে বিএনপির হাইকমান্ড গণঅধিকার পরিষদের সাবেক সাধারণ সম্পাদক রাশেদ খানকে দলীয় প্রার্থী হিসেবে মনোনয়ন দেয়। এই সিদ্ধান্তে স্থানীয় নেতাকর্মীদের মধ্যে তীব্র অসন্তোষ দেখা দেয়।

ফলে দলীয় সিদ্ধান্ত অমান্য করে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে ভোটের মাঠে নামেন সাবেক কেন্দ্রীয় নেতা সাইফুল ইসলাম ফিরোজ। অন্যদিকে মুর্শিদা জামান বেল্টু মনোনয়নপত্র প্রত্যাহার করে নেন এবং হামিদুল ইসলাম হামিদ দলীয় সিদ্ধান্ত মেনে জোটের প্রার্থীর পক্ষে প্রচারণায় নামেন। দলীয় সিদ্ধান্ত অমান্য করায় সাইফুল ইসলাম ফিরোজসহ তার পক্ষের বেশ কয়েকজন নেতাকর্মীকে বিএনপি থেকে বহিষ্কার করা হয়।

নির্বাচনে বিএনপির ভোট দুই ভাগে বিভক্ত হয়ে পড়ায় জোটের প্রার্থী রাশেদ খান এবং স্বতন্ত্র প্রার্থী সাইফুল ইসলাম ফিরোজ—উভয়ই পরাজিত হন। আসনটিতে জয়লাভ করেন জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থী মাওলানা আবু তালিব।

বর্তমানে কালীগঞ্জ উপজেলা বিএনপির রাজনীতিতে এক ধরনের অস্থিরতা বিরাজ করছে। একদিকে দলীয় সিদ্ধান্ত অমান্য করে নির্বাচনে অংশ নেওয়ার অভিযোগে বহিষ্কৃত অনেক নেতাকর্মীর বহিষ্কারাদেশ এখনও বহাল রয়েছে। অন্যদিকে দীর্ঘদিনেও উপজেলা বিএনপির পূর্ণাঙ্গ কমিটি ঘোষণা না হওয়ায় নেতাকর্মীদের মধ্যে অনিশ্চয়তা ও হতাশা দেখা দিয়েছে।

দলীয় সূত্র জানায়, বর্তমান নেতৃত্বে থাকা নেতারা নতুন কমিটিতে স্থান পাওয়ার জন্য কেন্দ্রীয় নেতাদের সঙ্গে যোগাযোগ রাখছেন। একই সঙ্গে বহিষ্কৃত নেতারাও মূল দলে ফিরে আসার আশার জন্য কেন্দ্রীয় নেতৃত্বের সঙ্গে যোগাযোগ অব্যাহত রেখেছেন। স্থানীয় বিএনপির একাধিক নেতাকর্মীর মতে, দীর্ঘদিন কমিটি না থাকা এবং অভ্যন্তরীণ বিভক্তি অব্যাহত থাকলে সামনে স্থানীয় সরকার নির্বাচনে এর নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে।

এ বিষয়ে কেন্দ্রীয় স্বেচ্ছাসেবক দলের সাবেক সিনিয়র যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক সাইফুল ইসলাম ফিরোজ এশিয়া পোস্টকে বলেন, ‘জনগণের অনুরোধেই আমি স্বতন্ত্র নির্বাচন করেছিলাম। জোটের প্রার্থীকে সাধারণ ভোটাররা গ্রহণ করেননি, যার প্রতিফলন ফলাফলে দেখা গেছে। আমি ও আমার সমর্থকরা আজীবন জিয়ার আদর্শ ও দলের চেয়ারম্যান প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নির্দেশনা মেনে রাজনীতি করছি, অন্য কোনো দলে যাইনি। দলের স্বার্থে সবার বহিষ্কারাদেশ প্রত্যাহার করে মূল ধারায় ফেরার সুযোগ দেওয়ার আহ্বান জানান তিনি।’

অপরদিকে কালীগঞ্জ উপজেলা বিএনপির সাবেক সিনিয়র যুগ্ম আহ্বায়ক হামিদুল ইসলাম হামিদ এশিয়া পোস্টকে বলেন, ‘আমি ছাত্রজীবন থেকে দলের অনুগত। মনোনয়ন না পেয়েও কেন্দ্রের নির্দেশে জোটের প্রার্থীর পক্ষে জানপ্রাণ দিয়ে কাজ করেছি। ঐক্যবদ্ধ থাকলে বিএনপি বিপুল ভোটে জিতত। দলকে শক্তিশালী করতে ঐক্যের কোনো বিকল্প নেই। বিগত ২০ বছর ধরে এখানে দলীয় পূর্ণাঙ্গ কমিটি দেওয়া হয়নি। দ্রুত একটি গ্রহণযোগ্য কমিটি দেওয়া হলে দলে শৃঙ্খলা ফিরবে।’

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিএনপির মনোনীত প্রার্থী রাশেদ খান এশিয়া পোস্টকে বলেন, ‘পর্যাপ্ত সময় না পাওয়া এবং সাবেক দলীয় প্রার্থীর দলবিমুখ হয়ে স্বতন্ত্র নির্বাচন করা ও কিছু নেতাকর্মীর অসহযোগিতার কারণে কাঙ্ক্ষিত ফলাফল আসেনি। তবে অতীত ভুলে এখন আমাদের সামনে যেতে হবে। দলের চেয়ারম্যান প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান সবাইকে ঐক্যবদ্ধ থাকার নির্দেশ দিয়েছেন। কালীগঞ্জ উপজেলা কমিটির বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত তিনিই নেবেন।’

জেলা বিএনপির অবস্থান ও কমিটির অপেক্ষা

স্থানীয় রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, সামনে স্থানীয় সরকার নির্বাচন ঘনিয়ে আসছে। এর আগে যদি দ্রুত অভ্যন্তরীণ কোন্দল নিরসন করে কালীগঞ্জ উপজেলা বিএনপির একটি গ্রহণযোগ্য পূর্ণাঙ্গ কমিটি গঠন করা না হয়, তবে আসন্ন নির্বাচনেও এর বড় মাশুল দিতে হতে পারে দলটিকে।

সার্বিক বিষয়ে ঝিনাইদহ জেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক জাহিদুজ্জামান মনা এশিয়া পোস্টকে বলেন, ‘দলীয় সিদ্ধান্ত অমান্য করে যারা স্বতন্ত্র নির্বাচন করেছেন এবং দলের প্রার্থীর বিরোধিতা করেছেন, তাদের কারণেই মূলত এই আসনটি হাতছাড়া হয়েছে। সামনে স্থানীয় সরকার নির্বাচন থাকায় এই মুহূর্তে উপজেলা কমিটি গঠনের কোনো নির্দেশনা কেন্দ্র থেকে নেই। নির্বাচন সম্পন্ন হওয়ার পর দলের হাইকমান্ডের নির্দেশনা অনুযায়ী কালীগঞ্জ উপজেলা বিএনপির শক্তিশালী ও পূর্ণাঙ্গ কমিটি ঘোষণা করা হবে।’

বিষয় :ঝিনাইদহ