রোনালদো-রামোসের গোলে ক্রোয়েশিয়াকে বিদায় করল পর্তুগাল

শেষ মুহূর্তের নাটক, পেনাল্টি, বাতিল গোল আর ভিএআর পরীক্ষার ম্যাচে ক্রোয়েশিয়াকে ২-১ গোলে হারিয়ে শেষ ষোলোয় উঠেছে পর্তুগাল।
টরন্টোর ম্যাচটিতে শুরু থেকেই ছিল আবেগে ভরা। একদিকে ৪১ বছর বয়সী রোনালদো, অন্যদিকে ৪০ বছর বয়সী লুকা মদরিচ। রিয়াল মাদ্রিদের সাবেক দুই সতীর্থের একজনের বিশ্বকাপ যাত্রা শেষ হয়ে যাবে, এমন বাস্তবতা ম্যাচটির গুরুত্ব আরও বাড়িয়ে দিয়েছিল।
প্রথমার্ধে পর্তুগাল বল দখলে এগিয়ে ছিল। জোয়াও ফেলিক্সের জায়গায় রাফায়েল লেয়াওকে একাদশে রাখার সিদ্ধান্ত আক্রমণে গতি এনে দেয়। বাঁ দিক থেকে তাঁর গতিময় দৌড় ও জায়গা আক্রমণের ক্ষমতা ক্রোয়েশিয়াকে শুরুতে চাপে রাখে। পর্তুগাল সুযোগও তৈরি করেছিল, কিন্তু ডমিনিক লিভাকোভিচ ও ক্রোয়াট রক্ষণ প্রথমার্ধে গোল পেতে দেয়নি।
ধীরে ধীরে ম্যাচে ফেরে ক্রোয়েশিয়া। মদরিচ মাঝমাঠে ছন্দ খুঁজে পান, মাতেও কোভাচিচ সামনে এগিয়ে এসে পর্তুগালকে অস্বস্তিতে ফেলেন। বিরতির পর ইগর মাতানোভিচকে নামিয়ে আক্রমণে আরও উপস্থিতি বাড়ায় জ্লাতকো দালিচের দল।
৫৩ মিনিটে সেই চাপের ফল পায় ক্রোয়েশিয়া। ইয়োসিপ স্তানিশিচের ক্রস পর্তুগালের রক্ষণ ঠিকমতো সামলাতে পারেনি। পেছন দিক থেকে উঠে এসে ইভান পেরিসিচ নিচু শটে বল জালে পাঠান। ক্রোয়েশিয়া এগিয়ে যায়, আর পর্তুগালের সামনে তৈরি হয় বিদায়ের শঙ্কা।
এরপর ম্যাচ পুরোপুরি উন্মুক্ত হয়ে যায়। রোনালদোর একটি গোল অফসাইডে বাতিল হয়। অন্যদিকে রাফায়েল লেয়াওর শট ক্রসবারে লাগে। ক্রোয়েশিয়াও পাল্টা আক্রমণে বারবার পর্তুগালের রক্ষণকে চাপে রাখছিল।
চাপের মুহূর্তে পরিবর্তন আনেন রবার্তো মার্তিনেস। আক্রমণ ও মাঝমাঠে নতুন শক্তি যোগ করার চেষ্টা করেন তিনি। এর মধ্যেই কর্নার থেকে রেনাতো ভেইগাকে ধরে ফেলার ঘটনায় ভিএআর দেখে পেনাল্টি দেন রেফারি।
৬৮ মিনিটে স্পটকিক থেকে গোল করেন রোনালদো। বিশ্বকাপের দীর্ঘ ক্যারিয়ারে নকআউট পর্বে এটিই তার প্রথম গোল। একই সঙ্গে তিনি বিশ্বকাপের নকআউট ম্যাচে সবচেয়ে বেশি বয়সে গোল করা খেলোয়াড়ও হয়ে যান। পর্তুগাল ১-১ সমতায় ফেরে, ম্যাচও ফেরে নতুন উত্তেজনায়।
তবে সমতায় ফেরার পরও পর্তুগালের অস্বস্তি কাটেনি। কোভাচিচের শট পোস্টে লাগে, আরেকবার তাঁকে ঠেকান দিয়োগো কস্তা। মাতানোভিচের সুযোগও সামলাতে হয় পর্তুগাল গোলরক্ষককে। ম্যাচের শেষ ভাগে ক্রোয়েশিয়ার চাপেই বেশি কাঁপছিল পর্তুগাল।
৮১ মিনিটে রোনালদোকে তুলে নেন মার্তিনেস। সিদ্ধান্তটি গ্যালারির একাংশের পছন্দ হয়নি। কিন্তু মাঝমাঠ গুছিয়ে নেওয়া এবং ম্যাচের শেষ ভাগে ভারসাম্য ফেরানোই ছিল কোচের পরিকল্পনা। রোনালদো মাঠ ছাড়ার পর পর্তুগালের আক্রমণের আলো ঘুরে যায় অন্যদের দিকে।
সেই আলো শেষ পর্যন্ত নিজের দিকে টেনে নেন গনসালো রামোস। যোগ করা সময়ে তাঁর নিখুঁত হেডে ২-১ গোলে এগিয়ে যায় পর্তুগাল। এক সময় রোনালদোর বিকল্প হিসেবে আলোচনায় থাকা রামোস আবারও প্রমাণ করলেন, বড় মঞ্চে সুযোগ পেলে তিনি ম্যাচ বদলে দিতে পারেন।
তবু নাটক তখনো শেষ হয়নি। শেষ মুহূর্তে ইয়োশকো গভার্দিওল বল জালে পাঠালে ক্রোয়েশিয়া সমতায় ফিরেছে বলে মনে হয়েছিল। কিন্তু ভিএআর পরীক্ষার পর অফসাইডের কারণে গোলটি বাতিল হয়। সেই সিদ্ধান্তেই বেঁচে যায় পর্তুগাল, শেষ হয় ক্রোয়েশিয়ার বিশ্বকাপ যাত্রা।
পর্তুগালের এই জয় প্রশ্ন রেখে গেল বেশ কিছু। রক্ষণে ফাঁক, মাঝমাঠে ভারসাম্য নেই, আর ক্রোয়েশিয়ার চাপ সামলাতে কয়েকবার দিয়োগো কস্তার ওপর নির্ভর করতে হয়েছে। তবে নকআউটে শেষ পর্যন্ত ফলই আসল, আর সেখানে রোনালদো-রামোসরা কাজটা করে দিয়েছেন।
মদরিচের জন্য এটি হয়তো বিশ্বকাপের শেষ ম্যাচ। শেষ মুহূর্তের বাতিল গোল ও রামোসের হেড তার দলকে থামিয়ে দিল।
পর্তুগালের সামনে এখন আরও বড় পরীক্ষা। শেষ ষোলোয় প্রতিপক্ষ স্পেন।
ডালাসে সেই আইবেরিয়ান লড়াইয়ে রোনালদোদের সামনে থাকবে ইউরোপিয়ান চ্যাম্পিয়নদের চ্যালেঞ্জ। ক্রোয়েশিয়ার বিপক্ষে নাটকীয়ভাবে বেঁচে যাওয়া পর্তুগালকে সেখানে কি আরও পরিণত ফুটবল খেলতে পারবে?




