ভারতের আইনই বদলে দিয়েছিলেন সন্তানহারা মা

এশিয়া পোস্ট ডেস্ক
ভারতের আইনই বদলে দিয়েছিলেন সন্তানহারা মা
‘শক্তি শালিনী’ সংগঠনের সংগঠক সত্য রাণী। ছবি: সংগৃহীত

রান্নাঘরের সাধারণ দুর্ঘটনা বা সিলিন্ডার বিস্ফোরণ বলে একসময় ভারতের নববধূদের রহস্যজনক মৃত্যুকে খুব সহজেই ধামাচাপা দেওয়া হতো। আশির দশকের গোড়ার দিকে এমন নির্মম মৃত্যু প্রায়শই ‘রান্নাঘরের দুর্ঘটনা’ নামে উড়িয়ে দেওয়া হতো। মামলা হলেও সেগুলো গুরুত্বসহকারে তদন্ত ছাড়াই শেষ কয়ে যেত।

তবে এই তথাকথিত ‍দুর্ঘটনার অধিকাংশের নেপথ্যে ছিল যৌতুকের দাবিতে নির্মম নির্যাতনের অভিযোগ। ন্যায়বিচার পাওয়া ছিল অতন্ত দুরূহ ব্যাপার। এমনই এক নির্মম যৌতুক সহিংসতার শিকার হয়েছিলেন ২০ বছর বয়সি অন্তঃসত্ত্বা তরুণী শশী বালা। ১৯৭৯ সালে আগুনে পুড়ে নির্মম মৃত্যু হয় তার।

ঘটনাটিকে সম্ভাব্য অপরাধ হিসেবে গণ্য না করে ‘রান্নাঘরের দুর্ঘটনা’ বলে খারিজ করে দিয়েছিল আদালত। কিন্তু তার মা সত্য রাণী এই মৃত্যুকে শুধু নিয়তি বলে মেনে নেননি। নিজের মেয়ের খুনিদের শাস্তি নিশ্চিত করতে না পারলেও তিনি তার দীর্ঘ ৩৪ বছরের আপসহীন লড়াইয়ের মাধ্যমে ভারতের পুরো আইনি ব্যবস্থাটাই বদলে দিয়েছিলেন।

১৯৭৯ সালের সেই ঘটনার সময় বিয়ের পর থেকেই যৌতুকের জন্য শ্বশুরবাড়িতে চরম নির্যাতনের শিকার হচ্ছিলেন ছয় মাসের অন্তঃসত্ত্বা শশী বালা। সেখানে তিনি অগ্নিদগ্ধ হয়ে মারা গেলে পুলিশ ও প্রশাসন বিষয়টিকে সাধারণ দুর্ঘটনা বলে এড়িয়ে যাওয়ার চেষ্টা করে। কিন্তু সত্য রানী দমে না গিয়ে সুপ্রিম কোর্ট পর্যন্ত আইনি লড়াই শুরু করেন।

এই ব্যক্তিগত শোকে ভেঙে না পড়ে তিনি যৌতুকের কারণে মেয়ে হারানো আরেকজন মাকে সঙ্গে নিয়ে দিল্লিতে গড়ে তোলেন ‘শক্তি শালিনী’ নামের একটি সংগঠন। এই সংগঠনের মাধ্যমে তিনি ঘরোয়া সহিংসতা ও যৌতুক নির্যাতনের শিকার অসহায় নারীদের আশ্রয়, আইনি সহায়তা ও মানসিক শক্তি দিতে শুরু করেন। সে সময় তার একটি কথা অধিকার আন্দোলনের মূল মন্ত্র হয়ে উঠেছিল যে, তার মেয়ে যদি বিচার নাও পায়, তিনি লড়াই করবেন যেন অন্য মেয়েরা বিচার পায়।

সত্য রানী ও অন্য অধিকারকর্মীদের এই লাগাতার আন্দোলনের ফলে ভারতজুড়ে তীব্র জনরোষ তৈরি হয়, যা তৎকালীন সরকারকে নারীদের সুরক্ষায় কঠোর আইনি সংস্কার করতে বাধ্য করে। এরই ধারাবাহিকতায় ১৯৮৩ সালে ‘ভারতীয় দণ্ডবিধিতে ধারা ৪৯৮(ক)’ যুক্ত করা হয়। ফলে স্বামী বা শ্বশুরবাড়ির লোকজনের দ্বারা স্ত্রীর ওপর যে কোনো ধরণের নির্যাতন শাস্তিযোগ্য অপরাধ হিসেবে গণ্য হয়।

এরপর ১৯৮৬ সালে যুক্ত হয় ধারা ৩০৪(খ), যেখানে ‘যৌতুকের কারণে মৃত্যু’-কে সুনির্দিষ্ট অপরাধ হিসেবে সংজ্ঞায়িত করে প্রমাণের নিয়ম কঠোর করা হয়, যাতে বিয়ের সাত বছরের মধ্যে কোনো নারীর রহস্যজনক মৃত্যুকে সহজে দুর্ঘটনা বলে পার পাওয়া না যায়।

শশী বালার স্বামী গ্রেপ্তারের আগেই পালিয়ে যাওয়ায় সত্য রাণী নিজের মেয়ের সরাসরি বিচার দেখে যেতে পারেননি। কিন্তু ২০১৪ সালে মৃত্যুর আগ পর্যন্ত তিনি দেশের হাজারো মেয়ের সুরক্ষার ঢাল হিসেবে কাজ করে গেছেন। আজকের ভারতের যৌতুকবিরোধী আইনের পেছনে এই সন্তানহারা মায়ের ত্যাগ ও আপসহীন লড়াই জড়িয়ে আছে।

সূত্র: টাইমস অব ইন্ডিয়া