Advertisement

আলজাজিরার এক্সপ্লেইনার/যুক্তরাষ্ট্র-ইরান সংঘাতের আগুন: কত দিন ‘ভারসাম্য’ রাখতে পারবে ইরাক?

আলজাজিরা
যুক্তরাষ্ট্র-ইরান সংঘাতের আগুন: কত দিন ‘ভারসাম্য’ রাখতে পারবে ইরাক?
২০২৬ সালের ১৪ জুলাই পেন্টাগনে ইরাকের প্রধানমন্ত্রী আলী আল-জাইদিকে (বামে) স্বাগত জানান যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথ (ডানে)। ছবি: সংগৃহীত

হোয়াইট হাউসে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প মঙ্গলবার ইরাকের সফররত ৪০ বছর বয়সি প্রধানমন্ত্রী আলি আল-জাইদির প্রতি উষ্ণ অভ্যর্থনা জানান। ট্রাম্প তাকে ‘তরুণ’ ও ‘সুদর্শন’ হিসেবে বর্ণনা করেন। ইরাকি প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে কাজ করার আগ্রহও প্রকাশ করেন ট্রাম্প। তারা অত্যন্ত উষ্ণভাবে করমর্দন করেন।

তবে দিনের শেষের দিকে সুর বদলে যায়। মার্কিন প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথ ইরাককে একটি সতর্কবার্তা দেন। তিনি দেশটির ইরানপন্থি সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোকে নিরস্ত্রীকরণের তাগিদ দেন।

যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যকার যুদ্ধ আবার তীব্র আকার ধারণ করছে। বিশ্লেষকরা বলছেন, আল-জাইদির ওয়াশিংটন সফর ইরাকের উভয়সংকট পরিস্থিতিকে সামনে এনেছে। ইরাক কোনোভাবেই দুটি গুরুত্বপূর্ণ দেশের সঙ্গে সম্পর্ক নষ্ট করতে পারে না। তাদের এখন যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের সঙ্গে সম্পর্কের ভারসাম্য বজায় রাখতে হচ্ছে।

যুক্তরাষ্ট্রে কী করছেন ইরাকের প্রধানমন্ত্রী?

হোয়াইট হাউসের বৈঠকে ট্রাম্প ও আল-জাইদি অর্থনৈতিক সম্পর্ক আরও জোরদার করার প্রতিশ্রুতি দেন। একই সঙ্গে ইরাকের তেল উৎপাদন বাড়ানোর বিষয়েও তারা সম্মত হন।

আলজাজিরাকে একটি নির্ভরযোগ্য সূত্র জানিয়েছে, ইরাকি কর্মকর্তারা মার্কিন প্রশাসন ও আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) কর্মকর্তাদের সঙ্গে বৈঠকের পরিকল্পনা করেছেন। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক ওই সূত্র জানায়, ইরাক আইএমএফের কাছ থেকে ৮ বিলিয়ন ডলার পর্যন্ত ঋণ নেওয়ার চেষ্টা করছে।

আল-জাইদি মূলত একজন ব্যবসায়ী, রাজনৈতিক অঙ্গনে তার আগের কোনো অভিজ্ঞতা নেই। এই বছরের শুরুর দিকে ট্রাম্প আল-জাইদির প্রতি সমর্থন জানান। অন্যদিকে তিনি ইরাকের সাবেক প্রধানমন্ত্রী নূরি আল-মালিকির বিরোধিতা করেন। ইরানঘনিষ্ঠ হিসেবে পরিচিত মালিকি গত এপ্রিলে প্রধানমন্ত্রিত্বের দৌড় থেকে সরে দাঁড়ান। এরপরই মঙ্গলবারের এই বৈঠক অনুষ্ঠিত হলো।

ইরাক সরকার আগেই জানিয়েছিল, আল-জাইদির এই সফরে তেল ও গ্যাসসংক্রান্ত বেশ কয়েকটি চুক্তি স্বাক্ষর হতে পারে। ওভাল অফিসের বৈঠকে ট্রাম্পও অনেকগুলো চুক্তি করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। তিনি আল-জাইদিকে একজন ‘চমৎকার ও নতুন বিজয়ী’ হিসেবে আখ্যায়িত করেন।

ট্রাম্প বলেন, ‘তেল ও অন্যান্য সম্পদের কারণে ইরাকের দারুণ সম্ভাবনা রয়েছে। বিশেষ করে তাদের তেলের কারণে আমরা অনেক চুক্তি করতে যাচ্ছি।’

যুক্তরাষ্ট্র যখন ইরাক থেকে তাদের সেনা কমানোর প্রস্তুতি নিচ্ছে, ঠিক তখনই এই বৈঠক অনুষ্ঠিত হলো।

আল-জাইদি ও ট্রাম্প উভয়েই জানান, ইরাকে থাকা অবশিষ্ট মার্কিন সেনারা ৩০ সেপ্টেম্বরের মধ্যে পুরোপুরি চলে যাবে। ধারণা করা হয়, সেখানে এখন ২ হাজারের কম সেনা রয়েছে। একই তারিখে ইরাকে সক্রিয় সব সশস্ত্র গোষ্ঠীকে নিরস্ত্র করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন আল-জাইদি।

তবে দিনের শেষভাগে প্রতিরক্ষামন্ত্রী হেগসেথ আল-জাইদির সঙ্গে বৈঠক করেন। বৈঠকের পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে হেগসেথ একটি বার্তা দেন। তিনি বলেন, ইরাককে অবশ্যই তাদের সার্বভৌমত্ব রক্ষা করতে হবে এবং ইরান-ঘনিষ্ঠ সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোকে নিরস্ত্র করতে হবে। ইরান-ইসরায়েল-যুক্তরাষ্ট্র যুদ্ধের মধ্যে মার্কিন বাহিনীর ওপর ঘন ঘন হামলার জন্য তিনি এই গোষ্ঠীগুলোকে দায়ী করেন।

বিশ্লেষকদের মতে, আগামী সপ্তাহগুলোতে ইরাকের ওপর যে বড় ধরনের চাপ আসতে চলেছে, এই ঘটনা তারই একটি আভাস।

কাতাইব হিজবুল্লাহ কী বলেছে?

কাতাইব হিজবুল্লাহ ইরানের ‘প্রতিরোধ অক্ষ’ (অ্যাক্সিস অব রেজিস্ট্যান্স)-এর একটি অংশ। ফিলিস্তিনের হামাস, লেবাননের হিজবুল্লাহ এবং ইয়েমেনের হুথিরাও এই অক্ষের অন্তর্ভুক্ত। কাতাইব হিজবুল্লাহ পপুলার মোবিলাইজেশন ফোর্সেস (পিএমএফ)-এর অন্যতম বৃহৎ দল। ২০১৪ সালে উগ্রবাদী গোষ্ঠী আইএসের (আইএসআইএস) অগ্রযাত্রা রুখতে এই বাহিনী গঠিত হয়েছিল।

মঙ্গলবার এই গোষ্ঠীটি স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছে, প্রয়োজন হলে তারা যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে যুদ্ধে যোগ দিতে প্রস্তুত।

ইরানের সংবাদ সংস্থা ফার্সের প্রতিবেদন অনুযায়ী, কাতাইব হিজবুল্লাহর কর্মকর্তা আবু মুজাহিদ আল-আসাফ বলেন, ‘ইসলামী প্রজাতন্ত্র ইরানের বিরুদ্ধে কোনো যুদ্ধ শুরু হলে প্রতিরোধ বাহিনী অবশ্যই সেখানে অংশ নেবে। এই সিদ্ধান্ত আমাদের আদর্শের সঙ্গে জড়িত। এটি নিয়ে কোনো আপস হবে না।’

ইরাকের ভারসাম্যের খেলা

ট্রাম্প প্রশাসনের দাবি উপেক্ষা করা ইরাকের জন্য মোটেও সহজ হবে না। কারণ তেল ও গ্যাস কোম্পানিগুলোর আধুনিকায়নে ইরাক মার্কিন কোম্পানিগুলোর ওপর নির্ভর করে। তবে যুক্তরাষ্ট্রের সামনে ইরাক কতটা নমনীয় হবে, তারও একটি সীমা রয়েছে।

কিংস কলেজ লন্ডনের ‘সেন্টার ফর স্ট্যাটক্র্যাফ্ট অ্যান্ড ন্যাশনাল সিকিউরিটি’-এর সিনিয়র ফেলো ইন্না রুডলফ আলজাজিরাকে বলেন, ‘বাগদাদ ওয়াশিংটনের সমর্থন পাওয়ার চেষ্টা করছে। তবে ইরানের ওপর হামলা চালানোর জন্য তারা নিজের ভূখণ্ড ব্যবহার করতে দেবে না।’

তিনি আরও বলেন, ‘ইরাকের একের পর এক সরকার যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্ক বাড়াতে চেয়েছে। তবে একই সঙ্গে তারা ইরানের সঙ্গেও কাজের সম্পর্ক বজায় রেখেছে। এই সম্পর্ক দীর্ঘ ঐতিহাসিক, ধর্মীয়, বাণিজ্যিক ও সামাজিক বন্ধনের ওপর প্রতিষ্ঠিত।’

ইরাকের জনসংখ্যার প্রায় ৬০ শতাংশ শিয়া মুসলিম। দেশটির শিয়া রাজনৈতিক দল, ধর্মীয় গোষ্ঠী ও সশস্ত্র দলগুলোর সঙ্গে ইরান অত্যন্ত গভীর সম্পর্ক গড়ে তুলেছে। এই যোগাযোগের পাশাপাশি অর্থনৈতিক ও নিরাপত্তা সম্পর্কের কারণে ইরাকের রাজনীতিতে তেহরানের বড় প্রভাব রয়েছে।

ইরানের সাবেক সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনেইর মৃত্যুর পর ইরাকের নাজাফ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে একটি আনুষ্ঠানিক শ্রদ্ধা জানানো হয়। এরপর ইরাকের নাজাফ ও কারবালা শহরে বড় ধরনের শোক মিছিল বের হয়।

ইন্না রুডলফ জানান, ইরাক তাদের ভূখণ্ড ব্যবহার করে ইরানের ওপর হামলার বিরোধিতা করে। তবে ইরানের সমর্থনপুষ্ট সশস্ত্র দল ও রাজনৈতিক গোষ্ঠীগুলোর প্রভাব রয়েছে ইরাকের রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান ও পার্লামেন্টে।

তিনি মনে করেন, এর ফলে দ্বিমুখী সম্পর্কের সৃষ্টি হচ্ছে। একদিকে আনুষ্ঠানিক কূটনীতির মাধ্যমে বাগদাদ তেহরানের সঙ্গে স্থিতিশীল সম্পর্ক রাখছে। অন্যদিকে, দেশের রাজনীতি ও নিরাপত্তা ব্যবস্থার কিছু অংশ ইরানের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগ বজায় রাখছে।

রুডলফ আরও বলেন, ‘এর ফলে দেশ দুটি একে অপরের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়েছে। বাণিজ্য, জ্বালানি ও সামাজিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে তাদের মধ্যে সহযোগিতা রয়েছে। তবে একই সঙ্গে অবিশ্বাস ও অভ্যন্তরীণ বিরোধও বিদ্যমান। বাগদাদ সরকারের সিদ্ধান্তের বাইরে গিয়ে সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর এককভাবে কাজ করার আশঙ্কাও রয়ে গেছে।’

যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যকার উত্তেজনা বৃদ্ধি পেলে ইরাকের ওপর এর কী প্রভাব পড়বে?

রুডলফ মনে করেন, উত্তেজনা বৃদ্ধি পেলে ইরাককে তাৎক্ষণিক ও বহুমুখী ঝুঁকির মুখে পড়তে হবে।

তিনি বলেন, ‘প্রথমত, এর ফলে সরাসরি নিরাপত্তা ঝুঁকি তৈরি হতে পারে। যেসব ইরান-পন্থী গোষ্ঠী নিরস্ত্রীকরণ বা নিরাপত্তা খাতের সংস্কার মানতে চায় না, তারা ইরাকের ভূখণ্ড ব্যবহার করে আঞ্চলিক লক্ষ্যবস্তুতে হামলা চালাতে পারে। এতে ইরাকের সার্বভৌমত্ব ক্ষুণ্ন হবে এবং সাধারণ মানুষ বিপদে পড়বে। কারণ প্রতিটি হামলার জবাবে প্রতিপক্ষ পাল্টা হামলা চালাবে। আর প্রতিটি পাল্টা হামলা ইরাকের এমনিতেই নড়বড়ে শান্তিচুক্তিকে আরও ক্ষতিগ্রস্ত করবে।’

তিনি আরও বলেন, ইরাকের রাজনীতিতে আগে থেকেই বিভাজন রয়েছে। এ ধরনের সংকট সেই বিভাজনকে আরও বাড়িয়ে দেবে। এতে সরকারি জোটগুলো ভেঙে যেতে পারে। ফলে যেকোনো ধরনের সংস্কারমূলক পদক্ষেপ নেওয়া সরকারের জন্য আরও কঠিন হয়ে পড়বে।

রুডলফ জানান, এর ফলে বড় ধরনের অর্থনৈতিক ও মানবিক বিপর্যয় ঘটতে পারে। বাণিজ্য ও জ্বালানি সরবরাহ বাধাগ্রস্ত হতে পারে। বিনিয়োগ ও পুনর্গঠন কাজ থমকে যেতে পারে এবং মানুষ নতুন করে বাস্তুচ্যুত হওয়ার ঝুঁকিতে পড়তে পারে।

‘সর্বশেষ বিষয় হলো, ইরাকের কূটনৈতিক পরিধি সংকুচিত হয়ে যাবে। মধ্যস্থতা করার পরিবর্তে বাগদাদকে জোরপূর্বক প্রক্সি বা পরোক্ষ যুদ্ধের মাঠে পরিণত করা হতে পারে। এতে ভারসাম্যপূর্ণ সম্পর্ক বজায় রাখা এবং নির্ভরযোগ্য নিরাপত্তা সংস্কার করা অনেক কঠিন হবে।’

‘এখানে মূল বিপদ কিন্তু বড় কোনো যুদ্ধ নয়। আসল সংকট হলো ছোট ছোট অসংখ্য সংঘাতের সৃষ্টি হওয়া, যা ইরাকের সার্বভৌমত্বকে ভেতর থেকে পুরোপুরি ফাঁপা করে দেবে।’