বাংলাদেশিদের জন্য ট্যুরিস্ট ভিসা চালু, আশায় বুক বাঁধছেন কলকাতার ব্যবসায়ীরা

প্রায় ২২ মাস ধরে বাংলাদেশিদের জন্য ভারতের ট্যুরিস্ট ভিসা বন্ধ ছিল। এ সময় ধাপে ধাপে মেডিকেল, শিক্ষার্থী, ব্যবসা ও এন্ট্রি ভিসা চালু হলেও ট্যুরিস্ট ভিসা চালু হয়নি। এর প্রভাব পড়ে কলকাতার নিউমার্কেটের ব্যবসায়। বাংলাদেশি পর্যটকের সংখ্যা কমে যাওয়ায় বন্ধ হয়ে যায় একের পর এক মানি এক্সচেঞ্জ কাউন্টার, আবাসিক হোটেল, রেস্তোরাঁ এবং যাত্রীবাহী বাসসেবা।
করোনা মহামারির পর ২০২৪ সালের গণ-অভ্যুত্থানের পর ভারত-বাংলাদেশের কূটনৈতিক সম্পর্কে টানাপোড়েন তৈরি হয়। অন্তর্বর্তী সরকারের সময় সেই সম্পর্ক আরও অবনতির দিকে গেলে নিউমার্কেটের ব্যবসায়ীরা বড় ধরনের অর্থনৈতিক সংকটে পড়েন।
একসময় নিউমার্কেট এলাকায় সেন্টমার্টিন পরিবহনের বাস কাউন্টার বন্ধ হয়ে সেখানে কাপড়ের ব্যবসা শুরু হয়। শুক্রবার (২৬ জুন) দেখা যায়, সেই ব্যবসাও বন্ধ হয়ে গেছে। এলাকাটির প্রায় ২০০টি আবাসিক হোটেলের মধ্যে ৩৯টি বন্ধ হয়ে যায়। বাকি হোটেলগুলোও লোকসানের মধ্যে চলতে থাকে। অন্তত ১০টি মানি এক্সচেঞ্জ প্রতিষ্ঠানও কার্যক্রম বন্ধ কর।
সাম্প্রতিক মাসগুলোতে মেডিকেল ভিসা পুরোপুরি চালু হওয়ায় কিছুটা উন্নতি এলেও ট্যুরিস্ট ভিসা বন্ধ থাকায় নিউমার্কেটের আগের ব্যস্ততা আর ফেরেনি। এ অবস্থায় গতকাল বৃহস্পতিবার বাংলাদেশিদের জন্য ট্যুরিস্ট ভিসা চালুর ঘোষণা দেয় ভারতীয় হাইকমিশন। এরপর থেকেই ‘মিনি বাংলাদেশ’ নামে পরিচিত কলকাতার নিউমার্কেটে স্বস্তি ও আশার পরিবেশ তৈরি হয়েছে।
নিউমার্কেট থেকে পেট্রাপোল সীমান্ত পর্যন্ত আটটি পরিবহন সংস্থা বাস পরিচালনা করে। যাত্রীর অভাবে একসময় আট দিন পরপর একটি করে বাস চালাতে হতো। গ্রিন লাইন পরিবহনের ব্যবস্থাপক শ্যামল ঘোষ বলেন, আগে তাদের অফিসে আট থেকে নয়জন কাজ করতেন, এখন আছেন মাত্র চারজন। ট্যুরিস্ট ভিসা চালু হলে ব্যবসা বাড়বে ও আগের কর্মীদেরও ফিরিয়ে আনার সুযোগ হবে বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন।
নিউমার্কেটসংলগ্ন হগ মার্কেটে প্রসাধনী ব্যবসায়ী মনিকা পাল জানান, তাদের ব্যবসা অনেকটাই বাংলাদেশি ক্রেতাদের ওপর নির্ভরশীল। বাংলাদেশি ক্রেতারা একসঙ্গে বড় অঙ্কের কেনাকাটা করেন। ভিসা বন্ধ থাকায় তাদের ব্যবসা ব্যাপক ক্ষতির মুখে পড়েছে। ট্যুরিস্ট ভিসা চালু হলে শুধু প্রসাধনীর ব্যবসাই নয়, হোটেল, রেস্তোরাঁসহ পুরো এলাকার ব্যবসা আবারও চাঙা হবে বলে আশা করেন তিনি।
পাইকারি মসলা বিক্রেতা মাকসুদ আহমেদ বলেন, নিউমার্কেটে বিশ্বের বিভিন্ন দেশ থেকে পর্যটকেরা আসেন। এখানে মসলা, কাপড়, ওষুধসহ নানা ধরনের পণ্য পাওয়া যায়। তার ভাষ্য, বাংলাদেশি পর্যটকেরা এলে তাদের ব্যয় করা অর্থ ভারতীয় অর্থনীতিতেই যুক্ত হবে। গত দুই বছরে মেডিকেল, জুতা, পোশাক ও মসলাসহ বিভিন্ন খাত ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এতে ভারত সরকারও কয়েক বিলিয়ন ডলারের সম্ভাব্য আয় হারিয়েছে।
গার্মেন্টস ব্যবসায়ী রামবাবু বলেন, বাংলাদেশি ক্রেতারা না আসায় দুই বছরে ব্যবসায় বড় প্রভাব পড়েছে। আবার যাতায়াত শুরু হলে পরিস্থিতির উন্নতি হবে।
স্থানীয় ব্যবসায়ী মহাম্মদ নিয়াজ, শোয়েব খান ও মো. মুনাজির খান জানান, আগে পর্যটকের কারণে ব্যবসা ভালো ছিল। মাঝখানে নানা সমস্যার কারণে পরিস্থিতি খারাপ হয়ে যায়। সরকারের নতুন সিদ্ধান্তে তারা সন্তুষ্ট।
ব্যবসায়ী অহসিন আহমেদ বলেন, নিউমার্কেট এলাকায় পর্যটক কমে যাওয়ার প্রভাব ছিল অত্যন্ত গুরুতর। অনেক দোকান বন্ধ হয়ে গেছে, অনেক প্রতিষ্ঠানে কর্মীরা বসে থেকেও কাজ পাচ্ছেন না। তার আশা, ট্যুরিস্ট ভিসা চালু হলে ব্যবসা আবার স্বাভাবিক হবে।
হোটেল ব্যবসায়ী ইকবাল আহমেদ বলেন, গত দুই বছরে অতিথি না থাকায় এক হাজার রুপির কক্ষ ৩০০ থেকে ৪০০ রুপিতেও ভাড়া দিতে হয়েছে। এখন পরিস্থিতির উন্নতি হলে দুই দেশের মানুষেরই উপকার হবে।
মেডিকেলসংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ী কামরুদ্দিন মল্লিক বলেন, মেডিকেল ভিসা চালু থাকলেও তাদের ব্যবসা এখনো আগের তুলনায় প্রায় ৬০ শতাংশ কম। নিউমার্কেট, ফ্রি স্কুল স্ট্রিট, মারকুইজ স্ট্রিট, মির্জা গালিব স্ট্রিট, এমনকি বাইপাস ও মুকুন্দপুর এলাকার হাসপাতালসংলগ্ন ব্যবসাও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ভারতীয় হাইকমিশনের নতুন সিদ্ধান্তে তারা আশাবাদী।






