দুর্নীতিতে দণ্ডিত অ্যাব নেতা খুলনা ওয়াসার ডিএমডি

খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের একাডেমিক ভবন নির্মাণে দুর্নীতির দায়ে শাস্তি হিসেবে পদাবনতি হয় প্রকৌশলী আরিফুল ইসলাম জুয়েলের। সেই কর্মকর্তাকেই এবার খুলনা ওয়াসার উপ-ব্যবস্থাপনা পরিচালক (ডিএমডি) হিসেবে নিয়োগ দিয়েছে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়।
গত ২৮ জুন তাকে প্রেষণে খুলনা বিশ্ববিদ্যালয় (খুবি) থেকে স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ে ন্যস্ত করা হয়। একই দিন তিনি খুলনা ওয়াসার নতুন পদে নিয়োগ পান।
খুবিতে তার মেয়াদকালে বিশ্ববিদ্যালয়ের তৃতীয় একাডেমিক ভবন চালু হয়। ভবনটি চালুর পর তৃতীয় তলার দুটি শ্রেণিকক্ষে হাঁটাচলার সময় কম্পন অনুভূত হয়। এতে শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের মধ্যে উদ্বেগ দেখা দেয়। বিষয়টি খতিয়ে দেখতে ২০১৬ সালের ৬ ডিসেম্বর তদন্ত কমিটি গঠন করে কর্তৃপক্ষ।
খুবি এবং খুলনা প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (কুয়েট) প্রবীণ শিক্ষকদের নিয়ে গঠিত এই কমিটি ছাদের চারটি স্থানের স্লাব কেটে বড় ধরনের অনিয়ম খুঁজে পায়।
নমুনা পরীক্ষায় দেখা যায়, ছাদের নকশায় কংক্রিটের পুরুত্ব থাকার কথা ছিল সাড়ে ৫ ইঞ্চি। কিন্তু বাস্তবে কোথাও তা মাত্র ৩ ইঞ্চি, কোথাও ৩ দশমিক ৭৫ ইঞ্চি পাওয়া যায়। মাত্রাতিরিক্ত সরু ছাদ নির্মাণের কারণে শিক্ষার্থীদের জীবন ঝুঁকির মুখে পড়ে।
তদন্তে উঠে আসে, তদারকির দায়িত্বে থাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রকৌশলীরা অনিয়মে বাধা না দিয়ে উল্টো ঠিকাদারের পক্ষে বিল ছাড়ের সুপারিশ করেন। কাজ শেষে ছাদে সাড়ে ৫ ইঞ্চি কংক্রিট রয়েছে মর্মে পুরো অর্থ পরিশোধ করা হয়।
শাস্তি থেকে পদোন্নতি
দুর্নীতিতে জড়িত থাকার প্রমাণ পাওয়ায় তৎকালীন সময়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের নির্বাহী প্রকৌশলী আরিফুল ইসলাম জুয়েলসহ কয়েকজনকে শাস্তি দেওয়া হয়। জুয়েলকে নির্বাহী প্রকৌশলী থেকে পদাবনতি দিয়ে সহকারী প্রকৌশলী করা হয়। এছাড়া চার বছরের জন্য তার পদোন্নতি স্থগিত রাখা হয়।
পরবর্তীতে অবশ্য তার বিরুদ্ধে দেওয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের শাস্তি বাতিল করানো হয়। ২০২৫ সালে তাকে বিশ্ববিদ্যালয়ের উপ-প্রধান প্রকৌশলী হিসেবে পদোন্নতি দেওয়া হয়। এরপর গত ২৮ জুন খুলনা ওয়াসার উপ-ব্যবস্থাপনা পরিচালক পদে নিয়োগ দেওয়া হয়। পরদিন ২৯ জুন মন্ত্রণালয়ে গিয়ে যোগদানপত্র জমা দেন জুয়েল।
আরিফুল ইসলাম জুয়েল বিএনপি সমর্থিত প্রকৌশলীদের সংগঠন অ্যাসোসিয়েশন অব ইঞ্জিনিয়ার্স বাংলাদেশের (অ্যাব) খুলনা জেলা কমিটির সাধারণ সম্পাদক ছিলেন।
রাজনৈতিক প্রভাব
খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের রেজিস্ট্রার দপ্তর সূত্র জানিয়েছে, অ্যাবের সাবেক কেন্দ্রীয় সভাপতি ও বর্তমান রাজউক চেয়ারম্যান প্রকৌশলী মো. রিয়াজুল ইসলামের আস্থাভাজন ছিলেন জুয়েল। বিশ্ববিদ্যালয়ের বর্তমান উপাচার্যসহ জ্যেষ্ঠ শিক্ষকদের অনেকেই অ্যাবের সদস্য।
জুলাই অভ্যুত্থানের পর বিএনপি ও অ্যাবের প্রভাব খাটিয়ে বিভিন্ন দপ্তরে খবরদারি শুরু করেন জুয়েল। বিভিন্ন দপ্তরে বদলি ও পদায়নে হস্তক্ষেপেরও অভিযোগ উঠে তার বিরুদ্ধে।
নিজের বিরুদ্ধে উঠা সব অভিযোগ অবশ্য অস্বীকার করেছেন জুয়েল। এশিয়া পোস্টকে তিনি বলেন, ‘রাজনৈতিকভাবে প্রতিশোধপরায়ণ হয়ে আমার বিরুদ্ধে অভিযোগ তোলা ও শাস্তি দেওয়া হয়। ছাদ ঢালাইয়ের দিন আমি উপস্থিত ছিলাম না। দুর্নীতির সঙ্গেও জড়িত ছিলাম না। অভ্যুত্থানের পর সেই শাস্তি প্রত্যাহার ও পদোন্নতি দিয়ে আমার ত্যাগের মূল্যায়ন করা হয়েছে।’
নথি অনুযায়ী, অনিয়ম তদন্তে গঠিত কমিটির প্রধান ছিলেন খুবি অধ্যাপক ড. শামীম মাহাবুবুল হক। তিন সদস্যের কমিটির দ্বিতীয় সদস্য ছিলেন কুয়েটের অধ্যাপক ড. কাজী সাজ্জাদ হোসেন। দুজনই বিএনপি সমর্থিত হিসেবে পরিচিত।
নিজে বিএনপির রাজনীতিতে যুক্ত থাকার পরও নিজ দল সমর্থিত শিক্ষকরা কেন তাকে রাজনৈতিক বিবেচনায় শাস্তি দেবেন? এমন প্রশ্নে জুয়েল বলেন, ‘২০১৪ থেকে ২০২৫ সাল পর্যন্ত অ্যাবের নেতা হিসেবে বিএনপির সব কর্মসূচিতে ছিলাম। এজন্যই তৎকালীন প্রশাসনের চক্ষুশূল হয়েছি।’
কর্মস্থলে অসদাচরণ
খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ে যোগ দেওয়ার পর থেকে সহকর্মীদের সঙ্গে দুর্ব্যবহার ও কর্মস্থলে দেরিতে উপস্থিত হওয়াসহ নানা অভিযোগে অন্তত পাঁচ থেকে ছয়বার জুয়েলকে কারণ দর্শানোর নোটিশ দেওয়া হয়। বিএনপি, আওয়ামী লীগ ও অন্তর্বর্তীকালীন; এই তিন আমলেই একাধিকবার শোকজ পেয়েছেন তিনি। জুলাই অভ্যুত্থানের পর আরও বেপরোয়া হয়ে উঠেন তিনি।
বিশ্ববিদ্যালয়ের ডিজিটাল হাজিরার ফিঙ্গারপ্রিন্ট রেকর্ডে দেখা যায়, ২০২৫ সালের নভেম্বর থেকে পরবর্তী ৫৪ কর্মদিবসের মধ্যে জুয়েল ৫৪ দিনই দেরিতে অফিসে উপস্থিত হয়েছেন। এর মধ্যে ৩০ দিন তিনি আগেভাগে অফিস ছেড়েছেন। প্রতিদিন গড়ে মাত্র ২ দশমিক ৮৬ ঘণ্টা অফিস করেছেন। এ নিয়ে গত ৪ মার্চ তাকে আবারও শোকজ করা হয়।
এ বিষয়ে আরিফুল ইসলাম জুয়েল বলেন, ‘ওই ফিঙ্গারপ্রিন্ট মেশিনে ভুল ছিল। পরে সেটি ঠিক করা হয়।’
খুবিতে শাস্তির ব্যাখ্যা আরিফুল ইসলাম জুয়েলের
আরিফুল ইসলাম জুয়েল এশিয়া পোস্টকে বলেন, ২০১৬ সালে যখন ৩ নম্বর একাডেমিক ভবনের ছাদ ঢালাই দেওয়া হয়, তখন তিনি স্ত্রীকে নিয়ে ভারতে চিকিৎসাধীন ছিলেন।
তার দাবি, তিনি অ্যাবের সাধারণ সম্পাদক থাকায় তৎকালীন সিন্ডিকেট তার বিরুদ্ধে অবৈধ তদন্ত কমিটি করে হয়রানিমূলক শাস্তি দিয়েছিল। ফলে ৫ আগস্টের পর বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন সেই তদন্ত প্রত্যাখ্যান করে তাকে নির্দোষ ঘোষণা করে এবং ওই কমিটিকে তিরস্কার করে।
তদন্ত কমিটিতে বিএনপিপন্থি সদস্যরা থাকার বিষয়ে জানতে চাইলে জুয়েল বলেন, ‘প্রশাসনের নির্দেশে তারা ওই রিপোর্ট দিতে বাধ্য হয়েছিলেন।’
খুলনা ওয়াসায় নিয়োগের বিষয়ে তার দাবি, নিজ যোগ্যতায় তিনি নিয়োগ পেয়েছেন। এর পেছনে কোনো রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ নেই।
মহানগর বিএনপির চিঠি
জুয়েলের বিরুদ্ধে নানা অভিযোগ উল্লেখ করে অ্যাবের সাবেক কেন্দ্রীয় সভাপতি ও ইনষ্টিটিউশন অব ইঞ্জিনিয়ার্স বাংলাদেশের (আইইবি) বর্তমান সভাপতি প্রকৌশলী মো. রিয়াজুল ইসলামকে চিঠি দেয় খুলনা মহানগর বিএনপি।
মহানগর বিএনপির সভাপতি এস এম শফিকুল আলম মনা ও সাধারণ শফিকুল আলম তুহিন সই করা চিঠিটি গত ২৬ জুন দেওয়া হয়।
চিঠিতে উল্লেখ করা হয়, গত ৭-৮ মাস ধরে জুয়েল কুয়েটসহ বিভিন্ন প্রকৌশল দপ্তরে বিভিন্ন প্রকৌলীকে হুমকি-ধামকি দিচ্ছেন। বিভিন্ন নিয়োগ পদোন্নতিতে অযাচিত হস্তক্ষেপ করছেন। বিভিন্ন জায়গায় আর্থিক সুবিধার বিনিময়ে কাজ করে দিবেন বলে তদবির বাণিজ্য করছেন। জাতীয়তাবাদী প্রকৌশলীদের সিনিয়র সদস্যদের বিভিন্নভাবে হয়রানির চেষ্টা করছেন।




