Advertisement

মাইলস্টোন ট্র্যাজেডি: বছর পার হলেও তদন্ত ও ক্ষতিপূরণ নিয়ে ক্ষোভ-অসন্তোষ

এশিয়া পোস্ট ডেস্ক
মাইলস্টোন ট্র্যাজেডি: বছর পার হলেও তদন্ত ও ক্ষতিপূরণ নিয়ে ক্ষোভ-অসন্তোষ
ছবি : সংগৃহীত

রাজধানীর উত্তরার দিয়াবাড়ীতে মাইলস্টোন স্কুল অ্যান্ড কলেজে ২০২৫ সালের ২১ জুলাই ঘটে বাংলাদেশের ইতিহাসের ভয়াবহ সামরিক বিমান দুর্ঘটনা। বিমানবাহিনীর প্রশিক্ষণ বিমান বিধ্বস্তের ঘটনার এক বছর পূর্ণ হয়েছে আজ। কিন্তু এ ঘটনার এখনও কোনো কিনারা করতে পারেনি। হতাহতদের ক্ষতিপূরণের অর্থ নিয়েও জটিলতা কাটেনি।

মর্মান্তিক ওই দুর্ঘটনায় ৩৫ জন নিহত হন। তাদের মধ্যে ২৮ জন শিক্ষার্থী, তিনজন শিক্ষক, তিনজন অভিভাবক ও বিমানের একজন পাইলট। আহত হয়েছে ১৭৫ জন। তাদের মধ্যে শিক্ষার্থীই ৬৩ জন।

সেদিনের ট্র্যাজেডিতে সন্তান হারানো পরিবারগুলো এই এক বছরে শোক কাটিয়ে উঠতে পারেনি। শোকের সঙ্গে ক্ষোভও আছে তাদের। বিশেষ করে দুর্ঘটনার তদন্ত প্রতিবেদন এখনও আলোর মুখ না দেখায় হতাশা প্রকাশ করেছেন তারা।

স্বাভাবিক হতে পারেননি অভিভাবকরা

সপ্তম শ্রেণির ইংলিশ ভার্সনের শিক্ষার্থী মাহতাব রহমানের বাবা মিনহাজ রহমান গণমাধ্যমকে বলেন, ‘ছেলের পড়ার টেবিলটা এক বছর ধরে একইভাবে পড়ে আছে। বই সরেনি, খাতা সরেনি। প্রতিদিন মা এসে বইগুলো মুছে দেন, গুছিয়ে রাখেন। মাহতাবকে ছাড়া আমরা কেউ ভালো নেই। আমাদের বাসাটা আগে প্রাণবন্ত ছিল, হাসি-খুশি ছিল। এখন এই বাসা কবরস্থানের মতো। মাহতাবের মা এখনও স্বাভাবিক হতে পারেননি। ড্রয়ারের ভেতর মাহাতাবের কাপড়গুলো বুকে জড়িয়ে ধরে পাগলের মতো করেন।’

তদন্ত প্রতিবেদন এখনও গোপন

মাইলস্টোনের ঘটনায় একটি তদন্ত কমিটি গঠন করেছিল তৎকালীন সরকার। পরে ৫ নভেম্বর তৎকালীন প্রধান উপদেষ্টার কাছে সুপারিশসহ প্রতিবেদন দেয় কমিটি।

গঠিত ৯ সদস্যের তদন্ত কমিশনের তথ্য অনুযায়ী, চীনে তৈরি এফটি-সেভেন যুদ্ধবিমানটিতে কোনো যান্ত্রিক ত্রুটি ছিল না। মূলত প্রশিক্ষণার্থী পাইলটের উড্ডয়ন অভিজ্ঞতার ঘাটতি এবং গ্রাউন্ড সুপারভাইজারের চরম নজরদারির অভাবেই ঘটে এই মর্মান্তিক দুর্ঘটনা। যদিও সরকার এই তদন্ত প্রতিবেদন এখনও গোপন রেখেছে।

তদন্তে আরও উঠে আসে, প্রশিক্ষণ বিমান উড্ডয়নের মাত্র সাত মিনিটের মাথায় পাইলটের ভুল কমান্ডের কারণে বিমানটির গতি ও উচ্চতার ভারসাম্য নষ্ট হয়ে যায়। এ ছাড়া রানওয়েসংলগ্ন এলাকায় রাজউকের ইমারত বিধি না মেনে ভবন তৈরি করা এবং একটিমাত্র বের হওয়ার পথ থাকায় প্রাণহানির সংখ্যা এত ভয়াবহ রূপ নেয়।

এই ট্র্যাজেডিতে যারা প্রাণ হারিয়েছেন, তাদের জন্য এখনও কাঁদেন পরিবার, স্বজন, সহপাঠী ও শিক্ষকরা। সেদিন যারা বেঁচে ফিরেছেন, তাদের মনে এখনও আছে এক অজানা আতঙ্ক। দুর্ঘটনায় আহতরা দীর্ঘ চিকিৎসা শেষে ক্লাসে ফিরলেও অধিকাংশই এখনও স্বাভাবিক জীবনে ফিরতে পারেনি। তারা নানা সমস্যার সম্মুখীন হচ্ছে। সেদিনের দুর্ঘটনার আগুনের লেলিহান শিখা, আর্তনাদ, সহপাঠীকে হারানোর শোকসহ নানা দুঃসহ স্মৃতি এখনও তাড়া করে তাদের।

ক্ষতিপূরণ নিতে অনীহা

আহতরা বিনা মূল্যে চিকিৎসাসেবা পেলেও হতাহতের পরিবার সরকারের পক্ষ থেকে কোনো আর্থিক সহায়তা পায়নি। অন্তর্বর্তী সরকার প্রথমে আহতদের সর্বোচ্চ ৬০ লাখ টাকা এবং নিহতদের পরিবারকে সর্বোচ্চ এক কোটি টাকা করে ক্ষতিপূরণ দিতে ডিসেম্বরে একটি উদ্যোগ নিয়েছিল। পরে নিহত প্রত্যেকের পরিবারকে ২০ লাখ ও আহতদের ৫ লাখ করে টাকা দিতে চেয়েছিল। কিন্তু এই টাকা খুবই সীমিত আখ্যায়িত করে তা প্রত্যাখ্যান করেন অভিভাবকরা।

অভিভাবকদের পক্ষ থেকে গত ১৭ জুন প্রধানমন্ত্রীর সাক্ষাৎ চেয়ে লিখিত আবেদন করা হয়েছে। কিন্তু এখনও সাক্ষাৎ পাননি তারা। গত ২১ জানুয়ারি ক্ষতিগ্রস্ত সব পরিবার বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমানের সঙ্গে দেখা করেছিলেন। সরকার গঠন করলে তাদের ন্যায্য অধিকার নিশ্চিত করারও আশ্বাস দিয়েছিলেন তিনি।

তবে দুর্ঘটনার পর এক বছর পার হলেও ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর জন্য স্থানীয় কোনো পুনর্বাসন পরিকল্পনা এখনও বাস্তবায়িত হয়নি। বর্তমানে আহত শিশুরা দগ্ধজনিত জটিলতা, প্লাস্টিক সার্জারি ও দীর্ঘমেয়াদি মানসিক সমস্যায় ভুগছেন।

চার দফা দাবি

প্রধানমন্ত্রীর সাক্ষাতের জন্য লিখিত আবেদনে শহীদ ও আহতদের পক্ষ থেকে চার দফা দাবি জানানো হয়েছে। দাবিগুলো হলো—শহীদ পরিবারের সুরক্ষায় ও আহতদের চিকিৎসার ব্যয়ভার বহনে পর্যাপ্ত আর্থিক ক্ষতিপূরণ প্রদান এবং দ্রুত হাইকোর্টের রিটের বাস্তবায়ন, আহতদের জন্য আজীবন বিনা মূল্যে চিকিৎসাসেবা ও সিএমএইচ থেকে বিশেষ মেডিক্যাল কার্ডের ব্যবস্থা করা, নিহতদের রাষ্ট্রীয়ভাবে শহীদি মর্যাদা ও সনদ প্রদান করা, ২১ জুলাইকে ‘জাতীয় শিক্ষা শোক দিবস’ ঘোষণা এবং শহীদদের স্মরণে উত্তরায় একটি মসজিদ নির্মাণ করতে হবে।