Advertisement

পাসপোর্ট জালিয়াতি চক্রের ৭ সদস্য গ্রেপ্তার, উঠে এলো চাঞ্চল্যকর তথ্য

এশিয়া পোস্ট প্রতিবেদক
পাসপোর্ট জালিয়াতি চক্রের ৭ সদস্য গ্রেপ্তার, উঠে এলো চাঞ্চল্যকর তথ্য
গ্রেপ্তার সাত সদস্য। ছবি: সিআইডি

প্রকৃত পাসপোর্টধারীর পরিবর্তে অন্য নারীকে ইতালিতে পাঠিয়ে মানবপাচার, ভিসা জালিয়াতি এবং বিদেশে নেওয়ার প্রলোভন দেখিয়ে বিপুল অর্থ আত্মসাতের অভিযোগে একটি সংঘবদ্ধ মানবপাচার চক্রের সাত সদস্যকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি)।

রাজধানীর গুলশান-১ এলাকায় অভিযান চালিয়ে তাদের গ্রেপ্তার করা হয়। অভিযানকালে চক্রটির কার্যালয় থেকে ৫৬টি পাসপোর্ট, ১৫৩টি দেশি-বিদেশি প্রতিষ্ঠান ও ব্যক্তির নামের সিল, তিনটি সিপিইউ, একটি ল্যাপটপ, একটি লোহার এমবোস সিল এবং নগদ আড়াই লাখ টাকা জব্দ করা হয়েছে।

মঙ্গলবার (২১ জুলাই) এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে সিআইডি জানায়, চক্রটি দীর্ঘদিন ধরে ইতালিগামী ব্যক্তিদের টার্গেট করে ভিসা পাইয়ে দেওয়ার নামে প্রতারণা করে আসছিল। অনুসন্ধানে তাদের বিরুদ্ধে ভিসা জালিয়াতির মাধ্যমে প্রকৃত পাসপোর্টধারীর বদলে অন্য ব্যক্তিকে বিদেশে পাঠানোর মতো গুরুতর অপরাধের প্রমাণ মিলেছে।

গতকাল সোমবার (২০ জুলাই) সিআইডির মানবপাচার শাখা (টিএইচবি) গোপন সংবাদের ভিত্তিতে গুলশান-১ এলাকায় এই অভিযান পরিচালনা করে। এ ঘটনায় গুলশান থানায় ‘মানবপাচার ও অভিবাসী চোরাচালান (প্রতিরোধ ও দমন) আইন’ এবং দণ্ডবিধির একাধিক ধারায় মামলা দায়ের করা হয়েছে।

গ্রেপ্তাররা হলেন মো. বেলায়েত হোসেন (৪০), নাজমুল হাসান (১৯), মেহেদী হাসান (৩৭), মো. সোলাইমান সুমন (৩২), ফজলে রাব্বী (২৭), মো. তৌহিদুর রহমান (২৪) এবং কাওসার হোসেন (৪২)।

যেভাবে ঘটানো হয় প্রতারণা

মামলার এজাহার সূত্রে জানা গেছে, ভুক্তভোগী নারীর স্বামী দীর্ঘদিন ধরে ইতালিতে বসবাস করছেন। স্বামী ও চার সন্তানকে নিয়ে ইতালিতে যাওয়ার আশায় তিনি দীর্ঘদিন ধরে ভিসার চেষ্টা করছিলেন। প্রয়োজনীয় কাগজপত্র ও পাসপোর্ট ইতালি দূতাবাসে জমা দেওয়ার পর পাসপোর্টের মেয়াদ শেষ হয়ে গেলে দূতাবাস থেকে তা নবায়নের জন্য যোগাযোগ করা হয়।

পাসপোর্ট সংগ্রহ করতে গিয়ে ভুক্তভোগী নারী অভিযুক্ত নাজমুল হাসানের সঙ্গে পরিচিত হন। নাজমুল নিজেকে দ্রুত পাসপোর্ট নবায়ন ও ইতালির ভিসা পাইয়ে দেওয়ার কাজে দক্ষ দাবি করে মাত্র ২৪ ঘণ্টার মধ্যে কাজ শেষ করার আশ্বাস দেন। পরে তিনি ওই নারীকে গুলশান-১ এলাকার একটি ট্যুরস অ্যান্ড ট্রাভেলস প্রতিষ্ঠানে নিয়ে যান এবং প্রতিষ্ঠানটির প্রধান মো. বেলায়েত হোসেনের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেন।

অভিযুক্তরা ইতালির ভিসা করিয়ে দেওয়ার আশ্বাস দিয়ে ভুক্তভোগীর সঙ্গে আর্থিক চুক্তি করে। গত ১৫ এপ্রিল ভুক্তভোগীর মোবাইলে দূতাবাস থেকে বার্তা আসে। পরদিন দূতাবাস থেকে পাসপোর্ট সংগ্রহ করে বের হওয়ার পর অভিযুক্তরা চুক্তির টাকা দাবি করে। টাকা সঙ্গে না থাকায় তারা জোরপূর্বক তার পাসপোর্টটি নিজেদের কাছে রেখে দেয়।

পাসপোর্ট ফেরত ও ভিসা প্রক্রিয়া সম্পন্ন করার আশায় ভুক্তভোগী গত ১৯ এপ্রিল ২ লাখ ৫০ হাজার টাকা এবং ১১ মে আরও ১ লাখ ৯০ হাজার টাকা পরিশোধ করেন। সব মিলিয়ে তিনি ৪ লাখ ৪০ হাজার টাকা অভিযুক্তদের হাতে তুলে দেন। টাকা গ্রহণের পরদিন তার পাসপোর্ট ফেরত দেওয়া হয়।

বিমানবন্দরে ধরা পড়ে ভয়ংকর জালিয়াতি

পরবর্তী সময়ে ভুক্তভোগীর স্বামী স্ত্রী ও সন্তানদের জন্য বিমানের টিকিট পাঠান। নির্ধারিত দিনে সন্তানদের নিয়ে বিমানবন্দরে গিয়ে ইমিগ্রেশন কার্যক্রম সম্পন্ন করতে গেলে কর্তৃপক্ষ জানায়, তার পাসপোর্টে থাকা ইতালির ভিসা ব্যবহার করে গত ২৪ এপ্রিল অন্য এক নারী এরই মধ্যে ইতালি চলে গেছেন।

এই তথ্য জানতে পেরে ভুক্তভোগী অনুধাবন করেন যে, তার অজান্তেই পাসপোর্ট ও ভিসা জালিয়াতি করে অন্য কাউকে বিদেশে পাঠানো হয়েছে এবং তার কাছ থেকে বিপুল অর্থ হাতিয়ে নেওয়া হয়েছে। পরে ইমিগ্রেশন কর্তৃপক্ষের পরামর্শে তিনি সিআইডির মানবপাচার শাখায় লিখিত অভিযোগ জানান।

চক্রের কার্যালয়ে মিলল ৫৬ পাসপোর্ট ও ১৫৩ সিল

অভিযোগ পেয়ে সিআইডি তদন্ত শুরু করে এবং প্রাথমিক সত্যতা মেলায় অভিযান চালিয়ে চক্রের সাত সদস্যকে গ্রেপ্তার করে। তাদের কার্যালয়ে তল্লাশি চালিয়ে তিনটি সিপিইউ, একটি এইচপি ল্যাপটপ, বিভিন্ন ব্যক্তির ৫৬টি পাসপোর্ট, সরকারি, বেসরকারি ও বিদেশি ব্যক্তি এবং প্রতিষ্ঠানের নামে ব্যবহৃত ১৫৩টি নকল সিল, একটি লোহার এমবোস সিল এবং নগদ ২ লাখ ৫০ হাজার টাকা জব্দ করা হয়।

সিআইডির প্রাথমিক তদন্তে উঠে এসেছে, চক্রটি দীর্ঘদিন ধরে পরিকল্পিতভাবে বিদেশগামী ব্যক্তিদের কাছ থেকে পাসপোর্ট সংগ্রহ করে নিজেদের কাছে আটকে রাখত। পরে প্রসেসিং জালিয়াতি করে প্রকৃত পাসপোর্টধারীর পরিবর্তে অন্য কোনো ব্যক্তিকে বিদেশে পাঠিয়ে দিত।

মূলহোতা বেলায়েত

তদন্তে আরও জানা গেছে, চক্রটির মূলহোতা মো. বেলায়েত হোসেন দীর্ঘদিন ধরে এই একই কৌশলে বিদেশে লোক পাঠানোর সঙ্গে জড়িত। ২০১৬ সাল থেকে এ পর্যন্ত অন্তত ৩০ জনকে ইতালিতে পাঠানোর সঙ্গে তার সরাসরি সম্পৃক্ততার তথ্য পাওয়া গেছে। প্রতি ক্ষেত্রেই হাতিয়ে নেওয়া হয়েছে বিপুল অর্থ।

এ ছাড়া একই ধরনের অপরাধের অভিযোগে ২০২৪ সালে বিমানবন্দর থানায় দায়ের করা একটি মামলায় বর্তমানে তিনি জামিনে রয়েছেন। মামলাটি এখনো বিচারাধীন।

সিআইডির সতর্কবার্তা

সিআইডি জানিয়েছে, জব্দ করা পাসপোর্ট, সিল ও ডিজিটাল আলামতের ফরেনসিক পরীক্ষা-নিরীক্ষা চলছে। পাশাপাশি অভিযুক্তদের আর্থিক লেনদেনের উৎস, বিদেশি সহযোগীদের সম্পৃক্ততা এবং অন্য কোনো ভুক্তভোগী রয়েছেন কি না, তা খতিয়ে দেখতে তদন্ত অব্যাহত রয়েছে।

বিদেশে কর্মসংস্থান, অভিবাসন বা ভ্রমণের ক্ষেত্রে কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের প্রলোভনে পড়ে যাচাই-বাছাই ছাড়া অর্থ বা পাসপোর্ট হস্তান্তর না করার জন্য নাগরিকদের আহ্বান জানিয়েছে সিআইডি। একই সঙ্গে সরকার অনুমোদিত বৈধ প্রক্রিয়ায় বিদেশ যাওয়ার পরামর্শ দিয়ে ভিসা জালিয়াতি বা মানবপাচারের বিষয়ে সন্দেহ হলে দ্রুত আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে অবহিত করার অনুরোধ জানানো হয়েছে।