জুলাই বিপ্লবে মাদ্রাসাশিক্ষার্থী ও আলেম সমাজের পূর্ণাঙ্গ শহীদ তালিকা প্রকাশ

জুলাই গণঅভ্যুত্থানে মাদ্রাসাশিক্ষার্থী ও আলেম সমাজের অংশগ্রহণ, আত্মত্যাগ ও শাহাদাতের পূর্ণাঙ্গ তালিকা প্রকাশ করেছে সাধারণ আলেম সমাজ। সংগঠনটির অনুসন্ধান অনুযায়ী, জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে মাদ্রাসাশিক্ষার্থী ও আলেম সমাজের ৮৫ জন শাহাদাতবরণ করেছেন। তাদের এই আত্মদানকে প্রতীকীভাবে ‘জুলাইয়ের আবাবিল’ বলা হয়েছে।
সাধারণ আলেম সমাজ বলছে, পবিত্র কুরআনে আবাবিলের ঘটনা জালেম শক্তির বিরুদ্ধে আল্লাহর সাহায্য ও প্রতিরোধের এক ঐতিহাসিক প্রতীক। জুলাই গণঅভ্যুত্থানে মাদরাসা শিক্ষার্থীদের ‘আবাবিল’ হিসেবে অভিহিত করা হয়েছে সেই প্রতীকী অর্থেই। তারা কোনো সংগঠিত সামরিক শক্তি ছিল না; বরং ইমান, নৈতিক সাহস, দেশপ্রেম ও আত্মত্যাগের চেতনায় উদ্বুদ্ধ সাধারণ তরুণ হিসেবে তারা রাজপথে নেমে এসেছিলেন। তাদের কেউ শাহাদাতবরণ করেছেন, কেউ গুরুতর আহত হয়েছেন, আবার অনেকে ইতিহাসের আড়ালে থেকে গেছেন।
সাধারণ আলেম সমাজ বলছে, জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে মাদ্রাসাশিক্ষার্থীদের শাহাদাত নিয়ে এর আগে বিভিন্ন সময়ে একাধিক তালিকা প্রকাশ হলেও সেসব তালিকার যথার্থতা ও পূর্ণাঙ্গতা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। অনেক ক্ষেত্রে বিদ্যমান ও কথিত ‘ন্যাচারাল’ তালিকা অনুসরণ করে নাম সংযোজন করা হয়েছে, কিন্তু প্রত্যেক শহীদের পরিবারের সাক্ষ্য, ঘটনাপ্রবাহ ও সরকারি নথির সঙ্গে তথ্য যাচাই করে পূর্ণাঙ্গ তালিকা প্রণয়নের উদ্যোগ নেওয়া হয়নি।
সাধারণ আলেম সমাজের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, তাদের প্রণীত তালিকাটি কোনো পূর্বপ্রকাশিত তালিকার অনুকরণে তৈরি করা হয়নি। বরং প্রতিটি শহীদের ক্ষেত্রে শহীদ পরিবারের বক্তব্য, শাহাদাতের ঘটনাপ্রবাহ এবং সরকারি গেজেটে প্রকাশিত তথ্য পরস্পরের সঙ্গে মিলিয়ে যাচাই করা হয়েছে। দীর্ঘ ১০ মাসের অনুসন্ধান ও তথ্য-যাচাইয়ের পরই ৮৫ জন শহীদের তালিকা প্রস্তুত করা হয়েছে।
সম্প্রতি একটি জাতীয় দৈনিকে জুলাই গণঅভ্যুত্থানে ২৬ জন মাদ্রাসাশিক্ষার্থী শহীদ হওয়ার তথ্য প্রকাশিত হলেও তাদের অনুসন্ধানে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী প্রকৃত সংখ্যা এর চেয়ে অনেক বেশি। ফলে মাদরাসা শিক্ষার্থীদের আত্মত্যাগের প্রকৃত চিত্র জাতীয় ইতিহাসে যথাযথভাবে প্রতিফলিত হচ্ছে না বলে মনে করছে সাধারণ আলেম সমাজ।
এ বিষয়ে সংগঠনটির পক্ষ থেকে আরও বলা হয়, মাদ্রাসাশিক্ষার্থীদের শাহাদাতের ঘটনাপ্রবাহের একটি গুরুত্বপূর্ণ দিন ছিল ১৯ জুলাই। ওই দিনই মাদ্রাসাশিক্ষার্থীদের মধ্যে সর্বাধিকসংখ্যক অর্থাৎ ২৩ জন শহীদ হন বলে তাদের অনুসন্ধানে উঠে এসেছে। তাই মাদ্রাসাশিক্ষার্থীদের গণঅংশগ্রহণ ও আত্মত্যাগের ইতিহাস বুঝতে ১৯ জুলাইকে বিশেষ গুরুত্ব দিয়ে দেখা প্রয়োজন। শহীদবিহীন ২১ জুলাই মাদ্রাসাশিক্ষার্থীদের প্রতিরোধ দিবস হিসেবে ঘোষণা করা শহীদদের আত্মত্যাগের প্রতি অবহেলার শামিল।
সংগঠনটির মতে, জুলাইয়ের ইতিহাসকে কোনো নির্দিষ্ট তারিখ ও বয়ানের মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে প্রত্যক্ষ ঘটনা ও তথ্যের ভিত্তিতে নির্মোহভাবে উপস্থাপন করা জরুরি।
মাদ্রাসাশিক্ষার্থী ও আলেম সমাজের শহীদদের জীবন ও আত্মত্যাগকে প্রামাণ্যভাবে সংরক্ষণের লক্ষ্যে ‘জুলাইয়ের আবাবিল’ নামে একটি বই প্রকাশিত হয়েছে। বইটিতে ৮৫ জন শহীদের জীবনবৃত্তান্ত, তাদের পারিবারিক পরিচয়, জুলাই গণঅভ্যুত্থানে তাদের অসামান্য ভূমিকা এবং শাহাদাতের ঘটনাপ্রবাহ তুলে ধরা হয়েছে। বইটি লিখেছেন সাধারণ আলেম সমাজের সাধারণ সম্পাদক আকিফ আব্দুল্লাহ এবং সম্পাদনা করেছেন সংগঠনটির মুখপাত্র রিদওয়ান হাসান।
সাধারণ আলেম সমাজের ভাষ্য অনুযায়ী, ‘জুলাইয়ের আবাবিল’ কেবল শহীদদের জীবনী সংকলন নয়, বরং শহীদদের জীবন ও আত্মত্যাগের মধ্য দিয়ে জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের গণমুখী প্রকৃত ঘটনাপ্রবাহ ও ইতিহাসকে নির্মোহভাবে উপস্থাপনের একটি গবেষণাধর্মী প্রয়াস। এতে প্রচলিত রাজনৈতিক বয়ানের বাইরে সাধারণ মানুষের অংশগ্রহণ, মাদ্রাসাশিক্ষার্থীদের ভূমিকা এবং তাদের আত্মত্যাগকে তথ্য ও প্রত্যক্ষ সাক্ষ্যের ভিত্তিতে তুলে ধরা হয়েছে।
বইটি ইতোমধ্যে জুলাই গণঅভ্যুত্থান নিয়ে গবেষণা, ইতিহাসচর্চা ও তথ্যসংগ্রহের ক্ষেত্রে বিশেষ গুরুত্ব পাচ্ছে বলে দাবি করেছে সাধারণ আলেম সমাজ। সংগঠনটির মতে, ৮৫ জন ‘জুলাইয়ের আবাবিল’ শুধু একটি সংখ্যা নয়, প্রত্যেকটি নামের পেছনে রয়েছে একটি পরিবার, একটি জীবন, একটি স্বপ্ন এবং শাহাদাতের ইতিহাস। তাই তাদের সঠিক পরিচয়, জীবন ও আত্মত্যাগ সংরক্ষণ করা শুধু মাদ্রাসাশিক্ষার্থী বা আলেম সমাজের দায়িত্ব নয়, এটা জুলাই গণঅভ্যুত্থানের প্রকৃত ইতিহাস সংরক্ষণের স্বার্থে সমগ্র জাতির দায়িত্ব।
সাধারণ আলেম সমাজ বলছে, জুলাইয়ের ইতিহাস কোনো একক শ্রেণি, দল বা গোষ্ঠীর ইতিহাস নয়, এটা বাংলাদেশের সাধারণ মানুষের ইতিহাস। সেই ইতিহাসে মাদ্রাসার ৮৫ জন শহীদের নাম ও আত্মত্যাগ যথাযথ মর্যাদায় সংরক্ষিত হওয়া জরুরি।
.png)






