১২ কোটি টাকার ট্রমা সেন্টার এখন মাদকের আড্ডাখানা

এশিয়া পোস্ট নিউজ, মাদারীপুর
১২ কোটি টাকার ট্রমা সেন্টার এখন মাদকের আড্ডাখানা
উদ্বোধনের আড়াই বছরও চালু হয়নি ‘ইলিয়াস আহমেদ চৌধুরী ট্রমা সেন্টার’। ছবি: এশিয়া পোস্ট

১২ কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত দৃষ্টিনন্দন ভবন আর কোটি টাকার আধুনিক চিকিৎসা সরঞ্জাম—সবই আছে, নেই শুধু চিকিৎসাসেবা। উদ্বোধনের আড়াই বছর পরও জনবল সংকটে তালাবদ্ধ থাকায় মাদারীপুরের শিবচরের ‘ইলিয়াস আহমেদ চৌধুরী ট্রমা সেন্টারটি’ এখন পরিণত হয়েছে মাদকসেবী ও জুয়াড়িদের নিরাপদ আখড়ায়। আর তদারকির অভাবে প্রতিনিয়ত চুরি হয়ে যাচ্ছে রাষ্ট্রীয় সম্পদ।

Advertisement

২০২২ সালের নভেম্বরে ট্রমা সেন্টারটির উদ্বোধন করা হয়। উদ্বোধনের আড়াই বছর কেটে গেলেও হাসপাতালের দরজা সাধারণ মানুষের জন্য আজও খোলেনি। চিকিৎসক, নার্স, টেকনিশিয়ান কিংবা প্রয়োজনীয় জনবল না থাকায় সেবা কার্যক্রম শুরু করা সম্ভব হয়নি।

সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, ট্রমা সেন্টার পরিচালনার জন্য সাতজন কনসালট্যান্ট, তিনজন অর্থোপেডিক সার্জন, দুজন অ্যানেসথেটিস্ট, দুজন আবাসিক চিকিৎসা কর্মকর্তা, ১০ জন নার্সসহ মোট ৩৪টি পদ সৃজনের প্রস্তাব করা হয়েছিল। কিন্তু স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় থেকে অনুমোদন না আসায় অবকাঠামো প্রস্তুত থাকার পরও হাসপাতালটি অচল হয়ে পড়ে আছে।

ছবি: এশিয়া পোস্ট
ছবি: এশিয়া পোস্ট

নিরাপত্তা ব্যবস্থা বা নিয়মিত তদারকি না থাকায় ইতোমধ্যে হাসপাতাল থেকে এসি, ফ্রিজ, টেলিভিশন, পানির মোটর ও স্যানিটারি সামগ্রীসহ বিভিন্ন মূল্যবান সরঞ্জাম চুরি হয়ে গেছে। সন্ধ্যার পর পুরো এলাকা পরিণত হয় এক ভুতুড়ে পরিবেশে। স্থানীয়দের অভিযোগ, রাতের এখানে মাদকসেবী ও অপরাধীদের অবাধ বিচরণ চলে।

স্থানীয় বাসিন্দা মোখলেসুর রহমান বলেন, কাজ শেষে সন্ধ্যায় এই পথ দিয়ে বাড়ি ফিরতে ভয় হয়। কারণ, এখানে মাদক এবং জুয়াড়িদের আড্ডা হয়। প্রশাসনকে বারবার বলার পরও কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি।

আলেয়া বেগম জানান, ‘হাসপাতালের পাশ দিয়ে দিনেও হাঁটতে ভয় লাগে। সম্প্রতি সন্ধ্যায় মেয়েকে নিয়ে হাসপাতালে যাচ্চিলাম। তখন কিছু পোলাপানকে নাচগান করতে দেখে জিজ্ঞাসা করলাম তোমরা এখানে কী করো। ওরা বলে বেশি কথা বললে তোরে মারমু।’

ট্রমা সেন্টারের পাশে মুদি দোকানদার আলমগীর হোসেন বলেন, সন্ধ্যার পর এখানে দোকান খোলা রাখতে ভয় লাগে। বিভিন্ন স্থান থেকে লোকজন এসে মাদক বিক্রি এবং সেবন করে। মাদকের ভাগাভাগি নিয়ে মাঝে মাঝে দ্বন্দ্বও হয়। প্রতিবাদ করলে তারা আমাকে মারতে আসে। এই ভয়ে সন্ধ্যার পরে আর দোকান খুলি না। হাসপাতালটি চালু থাকলে এমনটি হতো না।

স্থানীয় বাসিন্দা আব্দুল আল ইসলাম বলেন, আড়াই বছর আগে উদ্বোধন হলেও হাসপাতালটি এখনও চালু হয়নি। রক্ষণাবেক্ষণের লোক নেই, প্রতিদিন জিনিসপত্র চুরি হচ্ছে। আমরা দ্রুত হাসপাতাল চালুর দাবি জানাই।

পরিবহনচালক আরমান খান বলেন, ঢাকা-ভাঙ্গা মহাসড়কে ট্রমা সেন্টার অত্যন্ত জরুরি। দুর্ঘটনায় আহত রোগীকে ঢাকা বা ফরিদপুর নিতে নিতেই অনেকে মারা যায়। এখানে ট্রমা সেন্টার চালু হলে অনেক প্রাণ বাঁচানো সম্ভব।

শিবচর হাইওয়ে থানার ওসি মিজানুর রহমান বলেন, সড়কে আহত রোগীদের চিকিৎসার জন্য এই হাসপাতালটি গড়ে তোলা হয়েছিল, অথচ সেটা এখন অনুপযোগী। হাসপাতালটি দ্রুত চালু হলে দক্ষিণ অঞ্চলের তথা ফরিদপুর ও মাদারীপুরের আহত রোগীদের চিকিৎসাসেবা দেওয়া সহজ হবে।

ছবি: এশিয়া পোস্ট
ছবি: এশিয়া পোস্ট

শিবচর থানার ওসি কামাল হোসেন বলেন, ট্রমা সেন্টারটি শহর থেকে একটু দূরে। ওই স্থানে মানুষের যাতায়াত খুবই কম। ফলে সেখানে মাদকের আড্ডা হয় বলে জানতে পেরেছি। বিষয়টি আমাদের নজরে এসেছে। মাদকের বিরুদ্ধে অভিযান অব্যাহত রয়েছে।

শিবচর উপজেলা স্বাস্থ্য কর্মকর্তা ডা. ফাতিমা মাহজাবীন বলেন, আমাদের জনবল সংকট রয়েছে, যার কারণে সেখানে নিরাপত্তাকর্মী নিয়োগ করাও সম্ভব হয়নি। চুরির বিষয়টি ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানানো হয়েছে।

মাদারীপুরের সিভিল সার্জন ডা. শরীফুল আবেদীন কমল বলেন, ট্রমা সেন্টারটি আমাদের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে। তবে পরিচালনার জন্য প্রয়োজনীয় জনবল এখনও পাইনি। আমরা জনবল চেয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে চিঠি পাঠিয়েছি। আশা করছি দ্রুত এই সংকটের সমাধান হবে।