Advertisement

পলাশ হত্যায় আদালতে মায়ের মামলা: জিসানসহ ২৬ জনের বিরুদ্ধে অভিযোগ

এশিয়া পোস্ট প্রতিবেদক
পলাশ হত্যায় আদালতে মায়ের মামলা: জিসানসহ ২৬ জনের বিরুদ্ধে অভিযোগ
ঢাকার চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট (সিএমএম) আদালত। ছবি: সংগৃহীত

রাজধানীর হাতিরঝিল থানা এলাকার আলোচিত শীর্ষ সন্ত্রাসী ও ব্যবসায়ী মো. ইয়াছিন খান ওরফে পলাশ (৫০) হত্যাকাণ্ডে নতুন করে চাঞ্চল্য সৃষ্টি হয়েছে। এবার তার গর্ভধারিণী মা মোছা. আমেনা খান ঢাকার চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট (সিএমএম) আদালতে পৃথক একটি ফৌজদারি মামলা দায়ের করেছেন। এ মামলায় আরেক শীর্ষ সন্ত্রাসী জিসানকে ১নং আসামি করে ২৬ জনের নাম উল্লেখপূর্বক অভিযোগ আনা হয়েছে।

আদালতে জমা দেওয়া আবেদনে বলা হয়েছে, কারাগার থেকে মুক্তি পাওয়ার পর ব্যবসার কোটি কোটি টাকার হিসাব চাইতেই তাকে পরিকল্পিতভাবে হত্যা করা হয়েছে। কয়েকজন প্রভাবশালী ব্যবসায়ী, সাবেক সহযোগী, কথিত সন্ত্রাসী ও ভাড়াটে শুটারদের সমন্বয়ে গড়ে ওঠা একটি চক্র এ হত্যাকাণ্ডের নেপথ্যে কাজ করেছে।

মামলার নথি অনুযায়ী, সিআর মামলা নম্বর: ৭২৩/২০২৬ দায়ের করা হয় গত ৯ জুলাই। বাদী আমেনা খান দাবি করেন, তার একমাত্র ছেলে ইয়াছিন খান ওরফে পলাশ দীর্ঘদিন ধরে নির্মাণ ব্যবসার সঙ্গে জড়িত ছিলেন। একসময় তার ঘনিষ্ঠ সহযোগী ছিলেন মামলার ২ নম্বর আসামি মো. আহসানুল হক হাসান এবং ৩ নম্বর আসামি মো. মিজানুর রহমান ওরফে মিরাজ। এছাড়া মামলার আরও কয়েকজন আসামি তার ব্যবসা, অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড ও বিভিন্ন লেনদেনের সঙ্গে প্রত্যক্ষ কিংবা পরোক্ষভাবে যুক্ত ছিলেন।

মামলার অভিযোগে বলা হয়েছে, ৪ নম্বর আসামি সুজন ওরফে টোকাই সুজন একসময় পলাশের অধীনে চাকরি করতেন। পরবর্তীতে দুজন একই মামলায় যাবজ্জীবন সাজাপ্রাপ্ত হয়ে কারাগারেও ছিলেন। কারাগারে থাকা অবস্থায় টোকাই সুজন নিয়মিত ১ নম্বর আসামি জিসানের সঙ্গে যোগাযোগ রক্ষা করতেন। সেই সময় থেকেই পলাশকে হত্যার পরিকল্পনার ভিত্তি তৈরি হয়।

বাদীর দাবি, গত ৭ মে কারাগার থেকে মুক্তি পাওয়ার পর পলাশ তার অনুপস্থিতিতে পরিচালিত ব্যবসার হিসাব-নিকাশ চাইতে শুরু করেন। এ সময় তিনি কয়েকজন সহযোগীর সম্পদ ও অর্থনৈতিক অবস্থার অস্বাভাবিক পরিবর্তন দেখে বিস্মিত হন। টোকাই সুজনের বিপুল সম্পদ, বহুতল ভবন ও নগদ অর্থের উৎস সম্পর্কে জানতে চেয়েছিলেন পলাশ; পাশাপাশি ব্যবসার অর্থ কোথায় গেছে তারও হিসাব চান। কিন্তু কেউই সন্তোষজনক জবাব না দিয়ে উল্টো তাকে সরিয়ে দেওয়ার পরিকল্পনা করে।

বাদীর ভাষ্য অনুযায়ী, ২ নম্বর আসামি আহসানুল হক হাসান, ৩ নম্বর আসামি মিজানুর রহমান মিরাজ, ৪ নম্বর আসামি টোকাই সুজন এবং তাদের সহযোগীরা বিপুল অর্থের বিনিময়ে অস্ত্র ও শুটার ভাড়া করে পলাশকে হত্যার ব্যবস্থা করে। পরে ভাড়াটে খুনিরা সে পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করে।

মামলায় হত্যাকাণ্ডের বর্ণনা অনুযায়ী, গত ১২ জুন ছিল পরিবারের একটি বিশেষ দিন। পশ্চিম রামপুরার ৪৬০ নম্বর বাসায় জুম্মার পর দোয়া ও মিলাদ মাহফিলের আয়োজন করেছিলেন পলাশ। কাজের চাপে ক্লান্ত থাকায় তিনি প্রথমে জুমার নামাজে যেতে আগ্রহী ছিলেন না। কিন্তু আহসানুল হক হাসানের বারবার ফোন করে ডাকার কারণে শেষ পর্যন্ত তিনি নামাজে যান। নামাজ শেষে পায়ে হেঁটে বাসায় ফেরার সময় পশ্চিম রামপুরার বিটিভি ভবনের বিপরীতে ‘লাবিবা ডিপার্টমেন্টাল স্টোর’-এর সামনে পৌঁছালে মুখে মাস্ক পরা এক ব্যক্তি তাকে লক্ষ্য করে গুলি চালায়। গুলিটি তার মাথায় লাগে।

বাদীর অভিযোগ, হত্যাকাণ্ড নিশ্চিত করতে আরও কয়েক রাউন্ড গুলি ছোড়া হয়। এ সময় পলাশের ছেলে ইউসুফ খান পলকসহ স্থানীয় লোকজন চিৎকার করে এগিয়ে এলে হামলাকারীরা মোটরসাইকেলে দ্রুত পালিয়ে যায়। পরে রক্তাক্ত অবস্থায় পলাশকে প্রথমে রামপুরার ডেল্টা হাসপাতালে নেওয়া হয়; পরবর্তীতে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে স্থানান্তর করা হয়। সেখানে টানা আট দিন মৃত্যুর সঙ্গে লড়াই করে ২০ জুন রাত ১২টা ৪৪ মিনিটে তিনি মারা যান।

হত্যাকাণ্ডের পরদিন ১৩ জুন নিহতের স্ত্রী মাহমুদা খানম ইভা হাতিরঝিল থানায় একটি মামলা করেন, যা বর্তমানে তদন্তাধীন। নতুন মামলায় আমেনা খান আদালতের কাছে আবেদন জানিয়েছেন যেন দুটি মামলাকে একত্রে তদন্ত করে প্রকৃত হত্যাকারী ও পরিকল্পনাকারীদের শনাক্ত করা হয়।

মামলায় বাদী দাবি করেছেন, ছেলের চিকিৎসা ও পরবর্তী শোকের কারণে তিনি দীর্ঘদিন ঘটনাটির প্রকৃত কারণ অনুসন্ধান করতে পারেননি। পরে বিভিন্ন সূত্রে তথ্য সংগ্রহ করে তিনি আদালতের দ্বারস্থ হয়েছেন। তার অভিযোগ, ১ থেকে ২৬ নম্বর আসামি প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে পরস্পরের যোগসাজশে পূর্বপরিকল্পিতভাবে তার ছেলেকে হত্যা করেছে।

পলাশের মায়ের দায়ের করা মামলায় দেশের বাইরে অবস্থানরত শীর্ষ সন্ত্রাসী জিসানের নাম আসামিদের তালিকায় ১ নম্বরে রাখা হয়েছে। অন্য আসামিরা হলেন—মো. আহসানুল হক হাসান, মো. মিজানুর রহমান ওরফে মিরাজ, সুজন ওরফে টোকাই সুজন, শফিকুল ইসলাম ওরফে গুজা বাদশা, সাইফুল কন্ট্রাক্টর, বেলাল কন্ট্রাক্টর, রেজাউল করিম রাজু ওরফে লেংড়া রাজু, সফি উদ্দীন সিদ্দিকী, মনির হোসেন ওরফে লম্বা মনির, জাহিদ হোসেন ওরফে কালা জাহিদ, জীবন, মোল্লা জনি, নিজাম উদ্দীন টিপু ওরফে মোবাইল টিপু, বাদশা গাছি ওরফে বলদা বাদশা, পিচ্ছি আলামিন ওরফে ফরেন আলামিন ওরফে তোতলা আলামিন, মো. সোলাইমান, আক্তার (উবারচালক), শান্ত ওরফে পিচ্ছি শান্ত, ফারুক ওরফে চাচ্চা ফারুক, হেবেল, ফিরোজ মোহাম্মদ মোল্লা, সজীব, ইমাম হোসেন, মারুফ সুলতান ফেরদৌস ও মো. যুবরাজ।

মামলার শেষ অংশে বাদী আদালতের কাছে দাবি করেছেন, দণ্ডবিধির ৩০২, ৩০৭, ৩২৬ ও ৩৪ ধারার অভিযোগ আমলে নিয়ে পূর্বে দায়ের হওয়া হাতিরঝিল থানার মামলার সঙ্গে একত্রে তদন্তের নির্দেশ দেওয়া হোক। তার ভাষ্য, একমাত্র ছেলেকে হারিয়ে পরিবার আজ নিঃস্ব; তিনি আদালতের মাধ্যমে প্রকৃত ঘটনা উদ্ঘাটন ও ন্যায়বিচার প্রত্যাশা করছেন।

নতুন এই মামলা সম্পর্কে হাতিরঝিল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. আসাদুজ্জামান এশিয়া পোস্টকে বলেন, পলাশ হত্যাকাণ্ডে তার মায়ের দায়ের করা মামলাটির আদালতের আদেশ আমাদের কাছে এসেছে। আদালতের নির্দেশনা অনুযায়ী মামলাটির পরবর্তী তদন্তভার ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি) গ্রহণ করবে। নতুন মামলার কাগজপত্র ডিবির তদন্তকারী কর্মকর্তার কাছে পৌঁছে দেওয়া হয়েছে।