সম্পর্কে যে ভুলগুলো নষ্ট করে বিশ্বাস, কী বলছেন মনোবিজ্ঞানীরা

এশিয়া পোস্ট ডেস্ক
সম্পর্কে যে ভুলগুলো নষ্ট করে বিশ্বাস,  কী বলছেন মনোবিজ্ঞানীরা
ছবি : সংগৃহীত

একটি সম্পর্ক শুধু ভালোবাসার ওপর টিকে থাকে না, বরং একে অপরকে বিশ্বাসের ওপর বেড়ে ওঠে সম্পর্কের ভিত। আর সেই বিশ্বাসের সবচেয়ে বড় ভিত্তি হলো সততা। যখন একজন মানুষ বারবার সত্য গোপন করেন, অর্ধসত্য বলেন বা নিজের কথার সঙ্গে কাজের মিল রাখেন না, তখন সম্পর্কের ভিত ধীরে ধীরে দুর্বল হয়ে পড়ে।

Advertisement

অনেকেই মনে করেন, ছোটখাটো মিথ্যা বা কিছু তথ্য গোপন করা তেমন বড় বিষয় নয়। কিন্তু মনোবিজ্ঞানীরা বলছেন, এই ছোট ছোট অসততাই সময়ের সঙ্গে বড় দূরত্ব তৈরি করতে পারে।

শুধু বড় মিথ্যাই নয়, ছোট গোপনীয়তাও ক্ষতিকর

অসততা মানেই যে বড় কোনো প্রতারণা, তা নয়। অনেক সময় সম্পর্কের ক্ষতি শুরু হয় খুব সাধারণ কিছু আচরণ থেকে। যেমন—গুরুত্বপূর্ণ তথ্য ইচ্ছাকৃতভাবে না বলা, নিজের ভুলকে ছোট করে দেখানো, সঙ্গীর অনুভূতি অস্বীকার করা, ধরা পড়ার আগে সত্য না বলা এবং এমন পরিস্থিতি তৈরি করা যাতে অন্য ব্যক্তি ভুল ধারণা নিয়েই থাকেন।

এসব আচরণ ধীরে ধীরে সম্পর্কের নিরাপত্তাবোধ কমিয়ে দেয়।

সত্য গোপন করাও এক ধরনের মিথ্যা

অনেকেই ভাবেন, সরাসরি মিথ্যা না বললে কোনো সমস্যা নেই। কিন্তু যদি এমন কোনো তথ্য ইচ্ছা করে লুকিয়ে রাখা হয়, যা জানলে সঙ্গী কষ্ট পেতে পারেন বা তার সম্পর্ক নিয়ে সিদ্ধান্ত বদলে যেতে পারত, তাহলে সেটিও বিশ্বাস ভঙ্গের একটি রূপ।

ধরুন, আপনি কারও সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ রাখছেন কিন্তু সঙ্গীকে তা জানাচ্ছেন না। কিংবা কোনো আর্থিক বিষয় গোপন করছেন। এগুলো হয়তো সরাসরি মিথ্যা নয়, কিন্তু সম্পর্কের স্বচ্ছতা নষ্ট করে।

অসততা কেন মানসিক শান্তি কেড়ে নেয়

মিথ্যা বলা শুধু অন্য মানুষকে নয়, নিজেকেও প্রভাবিত করে। একটি মিথ্যা ধরে রাখতে হলে নতুন নতুন ব্যাখ্যা তৈরি করতে হয়। কী বলা হয়েছে, কাকে বলা হয়েছে, সেটি মনে রাখতে হয়। এর ফলে মানসিক চাপ বাড়তে থাকে।

মনোবিজ্ঞানীদের মতে, দীর্ঘদিন অসততার মধ্যে থাকলে যেসব সমস্যা দেখা দিতে পারে, সেগুলোর মধ্যে রয়েছে অপরাধবোধ, উদ্বেগ, ধরা পড়ার ভয়, মানসিক ক্লান্তি, নিজের পরিচয় নিয়ে দ্বন্দ্ব এবং আত্মসম্মান কমে যাওয়া। আর এর ফলে সম্পর্কের ঘনিষ্ঠতা কমে যায়।

একটি সুস্থ সম্পর্কে মানুষ নিজের দুর্বলতা, অনুভূতি ও বাস্তবতা ভাগ করে নিতে পারে। কিন্তু যখন সত্য গোপন করা শুরু হয়, তখন ধীরে ধীরে মানসিক দূরত্ব তৈরি হয়। একজন মানুষ যদি নিজের প্রকৃত অনুভূতি বা কাজ লুকিয়ে রাখেন, তাহলে তার সঙ্গী আসলে বাস্তব মানুষটিকে নয়, একটি সাজানো সংস্করণকে চিনতে থাকেন।

এভাবে সম্পর্কে ঘনিষ্ঠতা কমে যায় এবং একসময় একই সঙ্গে থেকেও দুজন মানুষ মানসিকভাবে অনেক দূরে সরে যেতে পারেন।

ছোট ছোট লক্ষণগুলোকে অবহেলা করবেন না

বিশ্বাস নষ্ট হওয়া সব সময় হঠাৎ করে ঘটে না। অনেক সময় এটি ধীরে ধীরে তৈরি হয়। কথার সঙ্গে কাজের মিল না থাকা, গুরুত্বপূর্ণ বিষয় বার বার এড়িয়ে যাওয়া, একই প্রশ্নের ভিন্ন ভিন্ন উত্তর দেওয়া, বারবার নিজের ব্যাখ্যা বদলে ফেলা এবং সত্য বলতে দেরি করা একটা সময়ে সম্পর্কের বিশ্বাস নষ্ট হওয়ার বড় কারণ হয়ে ওঠে।

আর তাই এসব লক্ষণ দেখলে সম্পর্কে সতর্ক হওয়া জরুরি।

সততা মানেই কঠোর হওয়া নয়

সত্য কথা বলা মানেই কাউকে আঘাত করা নয়। একই বিষয় ভদ্রতা, সহানুভূতি ও সম্মান বজায় রেখেও বলা সম্ভব। সততার সঙ্গে সংবেদনশীল আচরণ করলে সম্পর্ক আরও নিরাপদ হয়।

যদি বিশ্বাস ভেঙে যায়, তাহলে কী করবেন?

বিশ্বাস একবার নষ্ট হলে তা ফিরিয়ে আনতে সময় লাগে। কিস্তু অসম্ভব নয়।

তবে এর জন্য পুরো সত্য স্বীকার করা, নিজের ভুলের দায় নেওয়া, সঙ্গীর অনুভূতিকে গুরুত্ব দেওয়া, ভবিষ্যতে ধারাবাহিকভাবে সৎ থাকা এবং সময় দিয়ে আবার আস্থা তৈরি করা দরকার।

মনে রাখবেন, শুধু ‘দুঃখিত’ বললেই বিশ্বাস ফিরে আসে না। প্রতিদিনের আচরণের মাধ্যমে সেটি প্রমাণ করতে হয়।

সম্পর্কে সততার গুরুত্ব

একটি সম্পর্কে ভালোবাসা, সম্মান ও নিরাপত্তা একে অপরের সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত। আর এই তিনটির ভিত্তি হলো বিশ্বাস।

সত্য বলা সব সময় সহজ নাও হতে পারে। কখনও কখনও সত্য স্বীকার করা অস্বস্তিকর হতে পারে। কিন্তু সাময়িক অস্বস্তি এড়াতে মিথ্যার আশ্রয় নিলে ভবিষ্যতে তার মূল্য অনেক বেশি দিতে হতে পারে।

একটি সুস্থ ও দীর্ঘস্থায়ী সম্পর্কের জন্য তাই নিজের কথার মূল্য রাখা, প্রয়োজনীয় সত্য গোপন না করা এবং কাজের সঙ্গে কথার মিল রাখা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কারণ বিশ্বাস ভেঙে গেলে শুধু সম্পর্কই নয়, মানুষের মানসিক শান্তিও হারিয়ে যেতে পারে।

সূত্র: দ্য ক্যারি সেন্টার