নদী বাঁচলে ঢাকা বাঁচবে: যানজট, দূষণ ও ব্যর্থ উন্নয়নের জটিল সমীকরণ

ঢাকা আজ এক অদ্ভূত বৈপরীত্যের শহর—একদিকে ভয়াবহ যানজট, অন্যদিকে মৃতপ্রায় নদী। অথচ এই দুই সমস্যার সমাধান একই জায়গায়—নদীপথে। পরিকল্পিতভাবে নদীগুলো ব্যবহার করা গেলে যেমন যানজট কমানো যেত, তেমনি দূষণ নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমেও নগরজীবনকে টেকসই করা সম্ভব হত। কিন্তু বাস্তবতা হলো, আমরা দুই দিকেই ব্যর্থ।
বিশ্বব্যাংকের বিভিন্ন বিশ্লেষণ অনুযায়ী, ঢাকার যানজটের কারণে বছরে কয়েক বিলিয়ন ডলারের সমপরিমাণ অর্থনৈতিক ক্ষতি হয়। একইসঙ্গে নদী দূষণ বন্ধে কার্যকর ব্যবস্থা না নিলে আগামী ২০ বছরে এই ক্ষতির পরিমাণ দাঁড়াতে পারে প্রায় ৫১ বিলিয়ন মার্কিন ডলার। অর্থাৎ, যানজট ও নদী দূষণ—দুই সংকট মিলিয়ে ঢাকার অর্থনীতি এক দীর্ঘমেয়াদি ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে।
উন্নয়ন না ‘শোকেস’ প্রকল্প
এই শহরের চারপাশে বুড়িগঙ্গা, তুরাগ, শীতলক্ষ্যা ও বালু নদীকে ঘিরে একটি স্বাভাবিক জলপথ নেটওয়ার্ক রয়েছে, যা কার্যকরভাবে ব্যবহার করা গেলে ঢাকার যানজট উল্লেখযোগ্যভাবে কমানো সম্ভব ছিল।
নৌপথকে বিকল্প পরিবহন হিসেবে ব্যবহারের উদ্যোগ নতুন নয়। পতিত আওয়ামী লীগ সরকারের সাবেক নৌমন্ত্রী শাজাহান খানের সময় গাবতলী থেকে সদরঘাট পর্যন্ত চক্রাকার নৌযান চলাচল চালু করা হয়েছিল। কিন্তু তা টেকসই হয়নি। প্রকল্প বাস্তবায়নের আড়ালে অনিয়ম ও অর্থ লোপাটের অভিযোগ ওঠে, ফলে একটি সম্ভাবনাময় উদ্যোগ শুরুতেই থমকে যায়।
২০১৮ সালে সরকার ঢাকার চারপাশের নদী তীর রক্ষা প্রকল্প হাতে নেয়। প্রকল্পটির মূল ব্যয় ছিল ৮৪৮ কোটি ৫৫ লাখ টাকা, যা সংশোধিত হয়ে ১ হাজার ১৮১ কোটি ১০ লাখ টাকায় দাঁড়ায়। পরবর্তীতে ওয়াকওয়ে, স্ট্রিট লাইট ও অতিরিক্ত অবকাঠামো যুক্ত হওয়ায় ব্যয় আরও বৃদ্ধি পায়। একইভাবে প্রকল্পের মেয়াদ ২০২২ সাল থেকে বাড়িয়ে ২০২৩ সাল এবং এরপরও বাড়ানো হয়েছে।
বাস্তবায়নকারী সংস্থা বিআইডব্লিউটিএর তথ্যমতে, প্রকল্পের প্রায় ৭০ শতাংশ কাজ সম্পন্ন হয়েছে। নদী তীরে ৫২ কিলোমিটার ওয়াকওয়ে নির্মাণ, পিলার স্থাপন এবং কয়েকটি ইকোপার্ক গড়ে তোলা হয়েছে। কিন্তু প্রশ্ন থেকে যায়—এই প্রকল্প কি তার মূল উদ্দেশ্য পূরণ করতে পেরেছে?
প্রকল্পের লক্ষ্য ছিল নদী দখলমুক্ত করা এবং পরিবেশের উন্নয়ন। কিন্তু যানজট নিরসনের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়—নদীপথে কার্যকর নৌ চলাচল—সেটি নিশ্চিত করা যায়নি।
নদীর তীরে তৈরি হয়েছে ঝকঝকে ওয়াকওয়ে, বেইলি ব্রিজ, নান্দনিক রেলিং, আধুনিক জেটি ও শত শত পিলার। কিন্তু যে নদীর জন্য এই আয়োজন, সেই নদীর পানি আজ ‘আলকাতরার কালোকেও হার মানানো’ কুচকুচে কালো ও দুর্গন্ধময়। তাই নদীর ব্যবহার নিশ্চিতই যদি করা না যায়, তাহলে নদী তীর রক্ষা প্রকল্পের নামে কেন হাজার হাজার বাড়ি ঘর তখন ভেঙে ফেলা হলো, তা নিয়েও এখন প্রশ্ন দেখা দিয়েছে।
বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় (বুয়েট)-এর পরিবহন বিশেষজ্ঞদের মতে, ঢাকার মোট যাতায়াত চাহিদার একটি উল্লেখযোগ্য অংশ নদীপথে স্থানান্তর করা সম্ভব, যদি তা পরিকল্পিতভাবে পরিচালিত হয়। একইভাবে বিশ্বব্যাংকের একাধিক প্রতিবেদনে ঢাকার জন্য সমন্বিত মাল্টিমোডাল ট্রান্সপোর্ট সিস্টেম গড়ে তোলার কথা বলা হয়েছে, যেখানে নদীপথ একটি গুরুত্বপূর্ণ উপাদান হতে পারে।
দূষণের ভয়াবহ চিত্র
ঢাকার চারপাশের নদীগুলো এখন কার্যত এক একটি বিষাক্ত ভাগাড়ে পরিণত হয়েছে। নদী রক্ষা কমিশনের তথ্য অনুযায়ী, প্রায় ৭০০টি উৎস থেকে প্রতিনিয়ত রাসায়নিক, শিল্প বর্জ্য ও পয়ঃনিষ্কাশন এসে মিশছে এসব নদীতে।
শুধু তৈরি পোশাক শিল্প থেকেই ৭২ ধরনের ক্ষতিকর রাসায়নিক বুড়িগঙ্গা ও তুরাগে মিশছে। আন্তর্জাতিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান Ellen MacArthur Foundation-এর তথ্য অনুযায়ী, প্রতিবছর নদীতে যে পরিমাণ রঙ মেশে, তা দিয়ে ৩৭ মিলিয়ন অলিম্পিক আকারের সুইমিংপুল ভরে ফেলা সম্ভব।
স্থানীয়দের অভিজ্ঞতা আরও ভয়াবহ বাস্তবতা তুলে ধরে। এক বাসিন্দার ভাষায়, এই পানিতে এখন গোসলই করা যায় না। হাত-পা ধুলেই ঘা হয়ে যায়। আগে এই নদী থেকে বড় বড় মাছ খেয়েছি, এখন একটা পুটি মাছও পাওয়া যায় না।
দূষণের কারণে শুধু জীববৈচিত্র্যই ধ্বংস হচ্ছে না, মানুষের স্বাস্থ্যের ওপরও মারাত্মক প্রভাব পড়ছে। চর্মরোগ, সংক্রমণসহ নানা রোগ বাড়ছে নদীপাড়ের মানুষদের মধ্যে।
নদী শুকিয়ে গেলে প্রকল্পের মানে কী
দূষণ ও অব্যবস্থাপনার কারণে নদীর নাব্যতা কমে গিয়ে অনেক জায়গায় চর জেগে উঠেছে। বিশেষ করে তুরাগ নদীর ধউড় ব্রিজ থেকে টঙ্গী পর্যন্ত অংশ অনেকটা নালায় পরিণত হয়েছে।
এতে করে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন সামনে আসে—যে নদীই নেই, তার তীর রক্ষা করে কী লাভ?
সাবেক উপদেষ্টা পরিবেশ আইনজীবী সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান যথার্থই বলেছিলেন, ‘প্রকল্পগুলো যতটুকুই বাস্তবায়িত হয়েছে তার সুফল নগরবাসী পাচ্ছে না। নদী জনসম্পত্তি—পানির আধার নষ্ট করে উন্নয়ন টেকসই হতে পারে না।’
তিনি আরও সতর্ক করেন, নদীর পানি দূষিত হয়ে যাওয়ায় ভূগর্ভস্থ পানির ওপর চাপ বাড়ছে, ফলে ঢাকায় পানির স্তর ক্রমেই নিচে নেমে যাচ্ছে।
যানজট সমাধানে হারানো সুযোগ
নদীগুলো শুধু পরিবেশ নয়, পরিবহন ব্যবস্থারও বড় সমাধান হতে পারত। ঢাকা শহরের চারপাশে একটি চক্রাকার নৌপথ গড়ে তোলা গেলে সড়কের ওপর চাপ উল্লেখযোগ্যভাবে কমানো যেত।
কিন্তু তুরাগ নদীর আশুলিয়া থেকে টঙ্গী পর্যন্ত অংশে থাকা একাধিক নিচু সেতু এই সম্ভাবনাকে আটকে দিয়েছে। ফলে নৌযান আংশিক চললেও পূর্ণাঙ্গ নেটওয়ার্ক তৈরি হয়নি।
পরিবহন বিশ্লেষকদের মতে—
* নদীপথ চালু করা গেলে সড়কের যানবাহন ২০–৩০ শতাংশ পর্যন্ত কমানো সম্ভব।
* গাজীপুর–ঢাকা যাতায়াতে সময় অর্ধেকে নামিয়ে আনা সম্ভব।
* পণ্য পরিবহন ব্যয় ২-৩ গুণ পর্যন্ত কমানো সম্ভব।
ধরা যাক, প্রতিদিন যদি ঢাকার ১ কোটি যাত্রীর মাত্র ২০ শতাংশ নদীপথে স্থানান্তর করা যায়, তাহলে প্রায় ২০ লাখ যাত্রীর চাপ সড়ক থেকে কমে যাবে। এতে গড় গতি দ্বিগুণ না হলেও উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়বে—যা সরাসরি উৎপাদনশীলতা বাড়াবে।
সমাধান কী
সমাধান জটিল নয়, কিন্তু বাস্তবায়ন কঠিন। কারণ এটি পরিকল্পনা, সমন্বয় ও রাজনৈতিক সদিচ্ছার প্রশ্ন।
১. নদী দূষণের উৎসগুলো (৭০০+ আউটলেট) অবিলম্বে বন্ধ করতে হবে।
২. সব শিল্পকারখানায় কার্যকরভাবে ETP চালু নিশ্চিত করতে হবে।
৩. নদীর নাব্যতা ফিরিয়ে আনতে আধুনিক ড্রেজিং (গ্রাব ড্রেজারসহ) চালু করতে হবে।
৪. নিম্ন উচ্চতার সেতুগুলো আন্তর্জাতিক মান অনুযায়ী পুনর্নির্মাণ করতে হবে।
৫. যাত্রী ও পণ্য—উভয় ধরনের নৌপরিবহন চালু করতে হবে।
৬. নদীপথকে সড়ক ও রেলপথের সঙ্গে সংযুক্ত করতে হবে।
বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌপরিবহন কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান কমডোর আরিফ আহমেদ মোস্তফা বলেছেন, নদীর তলদেশের প্লাস্টিক অপসারণে গ্রাব ড্রেজার সংগ্রহ করা হচ্ছে, যা পানি প্রবাহ বাড়াতে সহায়ক হবে। অন্যদিকে সরকারও স্বীকার করেছে—অনেক শিল্প প্রতিষ্ঠানে ETP থাকলেও তা ব্যবহার করা হয় না, এবং ‘স্মার্ট মনিটরিং’-এর মাধ্যমে তা নিশ্চিত করার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।
শেষ কথা
ঢাকার সমস্যা নতুন নয়, সমাধানও অজানা নয়। কিন্তু বাস্তবায়নের ঘাটতি, সমন্বয়ের অভাব এবং জবাবদিহিতার সংকট আমাদের একই জায়গায় আটকে রেখেছে। নদীকে বাদ দিয়ে ঢাকার উন্নয়ন সম্ভব নয়। নদী শুধু সৌন্দর্যের বিষয় নয়, এটি পরিবহন, পরিবেশ এবং অর্থনীতির কেন্দ্রবিন্দু।
নদী বাঁচলে ঢাকা বাঁচবে।
নদী মরলে—ঢাকাও ধীরে ধীরে অচল হয়ে পড়বে।
লেখক: পরিবেশ বিষয়ক গণমাধ্যমকর্মী




