পার্বত্য তিন জেলায় বাঙালিদের আয়কর মওকুফের দাবি

এশিয়া পোস্ট নিউজ, বান্দরবান
পার্বত্য তিন জেলায় বাঙালিদের আয়কর মওকুফের দাবি
পার্বত্য চট্টগ্রাম নাগরিক পরিষদের সংবাদ সম্মেলন। ছবি: এশিয়া পোস্ট

রাঙ্গামাটি, খাগড়াছড়ি ও বান্দরবান—এই তিন পার্বত্য জেলায় বসবাসরত বাঙালি জনগোষ্ঠীর জন্য আয়কর মওকুফ এবং বাজারফান্ড এলাকায় দীর্ঘদিন ধরে বন্ধ থাকা ব্যাংক ঋণ পূর্বের ন্যায় চালুর দাবি জানিয়েছে পার্বত্য চট্টগ্রাম নাগরিক পরিষদ।

সোমবার (৬ জুলাই) সকাল ১০টায় বান্দরবান সদর উপজেলার গ্র্যান্ডভ্যালি রেস্তোরাঁয় আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে সংগঠনের কেন্দ্রীয় কার্যনির্বাহী কমিটির চেয়ারম্যান কাজী মো. মজিবর রহমান লিখিত বক্তব্যে এসব দাবি তুলে ধরেন।

সংবাদ সম্মেলনে তিনি বলেন, জাতীয় বাজেটে সরকার সমতল ও পার্বত্য এলাকার উপজাতীয় ও ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর জন্য আয়কর অব্যাহতির প্রস্তাব করায় সংগঠন সরকারের প্রতি কৃতজ্ঞতা জানায়। তবে একই সঙ্গে তিনি দাবি করেন, পার্বত্য চট্টগ্রামে বসবাসরত বাঙালি জনগোষ্ঠী এই সুবিধার বাইরে থাকায় তাদের সঙ্গে বৈষম্য করা হয়েছে।

সংগঠনের দাবি, রাঙ্গামাটি, খাগড়াছড়ি ও বান্দরবান জেলার মোট জনসংখ্যার প্রায় ৫৪ শতাংশ বাঙালি হলেও শিক্ষা, চাকরি, ব্যবসা-বাণিজ্য, ভূমি ব্যবস্থাপনা ও অর্থনৈতিক সুযোগ-সুবিধাসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে তারা দীর্ঘদিন ধরে বঞ্চনার শিকার। তাই শুধু একটি জনগোষ্ঠীর জন্য কর অব্যাহতি না দিয়ে পার্বত্য অঞ্চলে বসবাসরত পিছিয়ে থাকা বাঙালিদেরও একই সুবিধার আওতায় আনার দাবি জানানো হয়।

লিখিত বক্তব্যে আরও বলা হয়, দীর্ঘ কয়েক দশক ধরে কর অব্যাহতির সুবিধা ভোগ করায় উপজাতীয় জনগোষ্ঠীর একটি অংশ অর্থনৈতিকভাবে শক্তিশালী অবস্থানে পৌঁছেছে। অপরদিকে একই অঞ্চলে বসবাসকারী বাঙালি ব্যবসায়ী ও চাকরিজীবীরা নিয়মিত কর প্রদান করলেও তারা কোনো বিশেষ সুবিধা পাচ্ছেন না। সংগঠনের মতে, এ ধরনের ব্যবস্থা সংবিধানে বর্ণিত সমঅধিকারের নীতির সঙ্গে সাংঘর্ষিক।

সংবাদ সম্মেলনে অভিযোগ করা হয়, সম্প্রতি পার্বত্য অঞ্চলের কয়েকজন সংসদ সদস্য অর্থ মন্ত্রণালয়ে পাঠানো এক যৌথ চিঠিতে উপজাতীয় জনগোষ্ঠীর জন্য বিদ্যমান আয়কর অব্যাহতি বহাল রাখার সুপারিশ করেছেন। পার্বত্য চট্টগ্রাম নাগরিক পরিষদের দাবি, ওই সুপারিশে বাঙালি জনগোষ্ঠীর বিষয়টি উপেক্ষা করা হয়েছে, যা বৈষম্যমূলক।

সংগঠনটি তাদের বক্তব্যে উল্লেখ করে, বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো (বিবিএস), পরিকল্পনা কমিশন ও আন্তর্জাতিক সংস্থার বিভিন্ন প্রতিবেদনে বান্দরবানকে দেশের অন্যতম দরিদ্র জেলা হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। সেই বাস্তবতায় পার্বত্য অঞ্চলের দরিদ্র বাঙালি জনগোষ্ঠীর জন্যও বিশেষ অর্থনৈতিক সুবিধা প্রয়োজন বলে তারা মনে করেন।

সংবাদ সম্মেলনে বাজারফান্ড এলাকার জটিলতা নিয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়। সংগঠনের নেতারা বলেন, বান্দরবান, রাঙ্গামাটি ও খাগড়াছড়ির বাজারফান্ডভুক্ত এলাকায় জমি বন্ধক রেখে ব্যাংক ঋণ গ্রহণের যে ব্যবস্থা দীর্ঘদিন ধরে চালু ছিল, তা ২০১৯ সালের ডিসেম্বর থেকে কার্যত বন্ধ রয়েছে। এর ফলে ব্যবসা-বাণিজ্যে স্থবিরতা দেখা দিয়েছে এবং ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তারা মারাত্মক সংকটে পড়েছেন।

তাদের দাবি, বাজারফান্ড সংক্রান্ত প্রশাসনিক ও আইনি জটিলতার কারণে বর্তমানে সোনালী ব্যাংক, জনতা ব্যাংক, রূপালী ব্যাংক, অগ্রণী ব্যাংক, ইসলামী ব্যাংক, পূবালী ব্যাংকসহ প্রায় ১৭টি ব্যাংক নতুন ঋণ বিতরণ এবং পুরোনো ঋণ নবায়ন কার্যক্রম বন্ধ রেখেছে। এতে হাজার হাজার ব্যবসায়ী ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন এবং নতুন উদ্যোক্তা তৈরির সুযোগও সংকুচিত হচ্ছে।

সংবাদ সম্মেলনে বলা হয়, পার্বত্য চট্টগ্রাম শাসনবিধির আওতায় প্রায় দেড় শতাব্দী ধরে বাজারফান্ড এলাকার জমি বন্ধক রেখে ঋণ গ্রহণের যে প্রচলন ছিল, তা হঠাৎ বন্ধ হয়ে যাওয়ায় স্থানীয় অর্থনীতিতে নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে। বাজারফান্ড এলাকায় বসবাসকারী অধিকাংশ মানুষ ব্যবসা-বাণিজ্যের সঙ্গে যুক্ত থাকায় এই সংকট তাদের জীবন-জীবিকাকে সরাসরি প্রভাবিত করছে।

সংগঠনের চেয়ারম্যান কাজী মো. মজিবর রহমান বলেন, পার্বত্য অঞ্চলে স্থায়ী শান্তি, সম্প্রীতি ও ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার জন্য সকল নাগরিকের প্রতি সমান আচরণ নিশ্চিত করা প্রয়োজন। পার্বত্য অঞ্চলের পিছিয়ে থাকা বাঙালিদের জন্য আয়কর মওকুফের ব্যবস্থা গ্রহণ এবং বাজারফান্ড এলাকায় ব্যাংক ঋণ কার্যক্রম দ্রুত পুনরায় চালু করা হলে অর্থনৈতিক বৈষম্য হ্রাস পাবে এবং উন্নয়ন কার্যক্রম আরও গতিশীল হবে।

তিনি আরও বলেন, পার্বত্য অঞ্চলের চারজন সংসদ সদস্য সরকারের সঙ্গে আলোচনা করে বিষয়টির সমাধানে উদ্যোগ নিলে এলাকার মানুষের মধ্যে আস্থা ও সম্প্রীতি আরও সুদৃঢ় হবে।

সংবাদ সম্মেলনের শেষে পার্বত্য চট্টগ্রাম নাগরিক পরিষদের পক্ষ থেকে প্রধানমন্ত্রী, সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় এবং সরকারের উচ্চপর্যায়ের নীতিনির্ধারকদের কাছে তিন পার্বত্য জেলার বাঙালিদের জন্য আয়কর মওকুফ এবং বাজারফান্ড এলাকায় ব্যাংক ঋণ দ্রুত চালুর দাবি জানানো হয়। একই সঙ্গে উপস্থিত সাংবাদিকদের মাধ্যমে দাবিগুলো জনসমক্ষে তুলে ধরার আহ্বান জানান সংগঠনের নেতারা।