অতিরিক্ত ফোন ব্যবহার, শরীরে দেখা দিতে পারে এসব পরিবর্তন

স্মার্টফোন এখন আমাদের দৈনন্দিন জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ। ঘুম থেকে ওঠার পর থেকে রাতে ঘুমাতে যাওয়ার আগ পর্যন্ত নানা কাজে ফোন ব্যবহার করেন প্রায় সবাই। তবে দীর্ঘ সময় ফোন, ল্যাপটপ বা ট্যাবলেট ব্যবহারের প্রভাব শুধু মানসিক স্বাস্থ্যের ওপর নয়, শরীরের বিভিন্ন অংশেও পড়তে পারে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, অতিরিক্ত স্ক্রিন ব্যবহারের কারণে ঘাড়ের গঠন বদলে যাওয়া, চোখের সমস্যা, হাতের শক্তি কমে যাওয়া, এমনকি সূক্ষ্ম নড়াচড়ার দক্ষতাও ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। সুখবর হলো, কিছু সহজ অভ্যাস গড়ে তুললে এসব ঝুঁকি অনেকটাই কমানো সম্ভব।
টেক নেক বা ঘাড়ের সমস্যা
ফোন ব্যবহার করার সময় বেশিরভাগ মানুষ মাথা নিচু করে স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে থাকেন। এই ভঙ্গিকে বলা হয় ফরওয়ার্ড হেড পোস্টার। দীর্ঘদিন এমন অবস্থায় থাকলে ঘাড়ের ওপর অতিরিক্ত চাপ পড়ে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, মাথা যত বেশি নিচু হয়, ঘাড়ের ওপর তত বেশি ওজনের চাপ তৈরি হয়। এতে মেরুদণ্ডের ডিস্ক, জয়েন্ট ও পেশিতে সমস্যা দেখা দিতে পারে। এমনকি ফুসফুসের কার্যক্ষমতাও কিছুটা কমে যেতে পারে।
কী করবেন
- ফোন চোখের সমান উচ্চতায় ধরে ব্যবহার করুন।
- সম্ভব হলে স্ক্রিন মুখ থেকে এক হাত দূরত্বে রাখুন।
- কম্পিউটার মনিটরও চোখের সমান উচ্চতায় রাখুন।
- প্রতি ৩০ মিনিট পর অন্তত ২০ মিনিটের জন্য স্ক্রিন থেকে বিরতি নিন অথবা কিছুক্ষণ অন্যদিকে তাকান।
ফোন ব্যবহারে কি ঘাড়ে ভাঁজ পড়ে?
অনেকে মনে করেন, বারবার মাথা নিচু করে ফোন দেখার কারণে ঘাড়ে দ্রুত বলিরেখা পড়ে।
চর্মরোগ বিশেষজ্ঞদের মতে, তাত্ত্বিকভাবে এটি সম্ভব হলেও এখন পর্যন্ত এ বিষয়ে শক্ত বৈজ্ঞানিক প্রমাণ পাওয়া যায়নি। তাই শুধুমাত্র টেক নেকের জন্য বাজারে পাওয়া বিশেষ প্রসাধনী ব্যবহার করার আগে সতর্ক থাকা উচিত।
স্মার্টওয়াচে হতে পারে ত্বকের সমস্যা
অনেকেই দিন-রাত স্মার্টওয়াচ পরে থাকেন। এতে ঘাম জমে ত্বক দীর্ঘ সময় ভেজা থাকে, যা ছত্রাক, একজিমা বা ত্বকের জ্বালাপোড়ার ঝুঁকি বাড়াতে পারে।
তাই নিয়মিত স্মার্টওয়াচ খুলে ত্বক পরিষ্কার করুন। প্রয়োজন হলে ময়েশ্চারাইজার বা ব্যারিয়ার ক্রিম ব্যবহার করুন এবং ত্বকে চুলকানি বা র্যাশ দেখা দিলে চিকিৎসকের পরামর্শ নিন।
দৃষ্টিশক্তির ওপর প্রভাব
অনেকের ধারণা, ফোনের ছোট স্ক্রিনে দীর্ঘক্ষণ তাকিয়ে থাকলেই চোখের পাওয়ার বাড়ে। তবে গবেষণায় দেখা গেছে, বিষয়টি এতটা সরল নয়।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, কাছ থেকে স্ক্রিন দেখার চেয়ে বড় সমস্যা হলো মানুষ এখন আগের তুলনায় অনেক কম সময় বাইরে কাটায়। প্রাকৃতিক আলো চোখের স্বাভাবিক বিকাশে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
এক্ষেত্রে প্রতিদিন কিছু সময় খোলা পরিবেশে কাটানোর চেষ্টা করুন। বাইরে গেলে রোদ থেকে সুরক্ষার জন্য সানগ্লাস ও সানস্ক্রিন ব্যবহার করুন্রেবং দীর্ঘ সময় স্ক্রিন ব্যবহারের সময় নিয়মিত চোখকে বিশ্রাম দিন।
হাতের শক্তি কমে যেতে পারে
গবেষণায় দেখা গেছে, হাতের গ্রিপ শক্তি বা কিছু শক্ত করে ধরে রাখার ক্ষমতা মানুষের সামগ্রিক স্বাস্থ্যের একটি গুরুত্বপূর্ণ সূচক।
বিশেষজ্ঞদের ধারণা, বর্তমানে মানুষ আগের তুলনায় কম শারীরিক পরিশ্রম করছে এবং দীর্ঘ সময় কম্পিউটার বা ফোন ব্যবহার করছে। এর ফলে হাতের পেশি ও শরীরের সামগ্রিক শক্তি কমে যেতে পারে।
কী করবেন
- নিয়মিত ব্যায়াম করুন।
- সপ্তাহে কয়েক দিন শক্তি বাড়ানোর ব্যায়াম বা রেজিস্ট্যান্স ট্রেনিং করুন।
- হাত ও কবজির ব্যায়ামও উপকারী হতে পারে।
- হাত-চোখের সমন্বয়েও প্রভাব পড়তে পারে
ফোন ব্যবহার করলে স্ক্রল করা বা ট্যাপ করার দক্ষতা বাড়লেও বাস্তব জীবনের সূক্ষ্ম কাজ করার দক্ষতা কমে যেতে পারে।
বিশেষ করে শিশুদের ক্ষেত্রে বেশি স্ক্রিন টাইমের সঙ্গে মোটর স্কিল বা হাতের সূক্ষ্ম নড়াচড়ার দক্ষতা কমে যাওয়ার সম্পর্ক পাওয়া গেছে। এটি ভবিষ্যতে শেখার ক্ষমতা ও মানসিক বিকাশেও প্রভাব ফেলতে পারে।
কী করবেন
প্রতিদিন এমন কিছু কাজ করার চেষ্টা করুন যেখানে হাতের ব্যবহার বেশি হয়। যেমন- রান্না করা, ছবি আঁকা, হস্তশিল্প, বাদ্যযন্ত্র বাজানো ও হাতের লেখা চর্চা করা।
প্রযুক্তি ব্যবহার বন্ধ নয়, প্রয়োজন সঠিক অভ্যাস
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, প্রযুক্তি ব্যবহার করলেই শরীরের ক্ষতি হবে, বিষয়টি এমন নয়। বরং সমস্যা হয় যখন দীর্ঘ সময় একই ভঙ্গিতে বসে থাকা, কম নড়াচড়া করা এবং পর্যাপ্ত বিশ্রাম না নেওয়ার অভ্যাস তৈরি হয়।
সুস্থ থাকতে যা করবেন
- ফোন বা ল্যাপটপ ব্যবহার করার সময় সঠিক ভঙ্গি বজায় রাখুন।
- প্রতি কিছুক্ষণ পরপর উঠে হাঁটুন ও শরীর স্ট্রেচ করুন।
- প্রতিদিন নিয়মিত ব্যায়াম করুন।
- বাইরে খোলা পরিবেশে কিছু সময় কাটান।
- স্ক্রিন ব্যবহারের মাঝে চোখকে বিশ্রাম দিন।
- স্মার্টওয়াচ বা অন্যান্য পরিধানযোগ্য ডিভাইস নিয়মিত খুলে ত্বক পরিষ্কার রাখুন।
প্রযুক্তি আমাদের জীবনকে সহজ করেছে, কিন্তু এর অতিরিক্ত ব্যবহার শরীরের ওপর ধীরে ধীরে প্রভাব ফেলতে পারে। ঘাড়ের ব্যথা, চোখের ক্লান্তি, হাতের দুর্বলতা কিংবা ত্বকের সমস্যা অনেক সময় ছোট বিষয় মনে হলেও দীর্ঘমেয়াদে এগুলো বড় সমস্যার কারণ হতে পারে। তাই প্রযুক্তি ব্যবহার করুন প্রয়োজন অনুযায়ী, তবে শরীরের যত্ন নেওয়ার অভ্যাসও সমান গুরুত্ব দিন।
সূত্র:বিবিসি





