গরমে কেন কমে যায় মনোযোগ, বিজ্ঞানীরা জানালেন কারণ

বাইরে প্রচণ্ড গরম। এমন দিনে অনেকেরই মাথা ঝিমঝিম করে, মনোযোগ কমে যায় কিংবা অস্বস্তি বাড়ে। বেশির ভাগ মানুষ এটিকে স্বাভাবিক বলেই মনে করেন। কিন্তু বিজ্ঞানীরা বলছেন, অতিরিক্ত গরম শুধু শরীরকে ক্লান্ত করে না, এটি আমাদের মস্তিষ্কের ওপরও গভীর প্রভাব ফেলতে পারে।
জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে বিশ্বজুড়ে তাপমাত্রা দ্রুত বাড়ছে। এর সঙ্গে বাড়ছে দীর্ঘস্থায়ী তাপপ্রবাহের সংখ্যাও। আর এই পরিবর্তন মানুষের মস্তিষ্ক, মানসিক স্বাস্থ্য এবং স্নায়ুতন্ত্রকে কীভাবে প্রভাবিত করছে, তা নিয়ে এখন গবেষণা চলছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, অতিরিক্ত গরম শুধু বিদ্যমান স্নায়ুরোগকে আরও জটিল করে তোলে না, বরং স্মৃতিশক্তি, সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা, ঘুম, মানসিক অবস্থা এমনকি ভবিষ্যতে মস্তিষ্কের বিভিন্ন রোগের ঝুঁকিও বাড়াতে পারে।
যুক্তরাজ্যের ইউনিভার্সিটি কলেজ লন্ডনের স্নায়ুরোগ বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক সঞ্জয় সিসোদিয়া বহু বছর ধরে মৃগীরোগ নিয়ে কাজ করছেন।
তিনি জানান, গরমের সময় রোগীদের পরিবারের কাছ থেকে প্রায়ই একই অভিযোগ শুনতেন। তাপমাত্রা বাড়লেই রোগীর অবস্থা খারাপ হয়ে যায়।
এরপর তিনি বিষয়টি নিয়ে গবেষণা শুরু করেন। গবেষণায় দেখা যায়, শুধু মৃগীরোগ নয়, আরও অনেক স্নায়বিক রোগ অতিরিক্ত গরমে বেড়ে যেতে পারে।
এর মধ্যে রয়েছে মৃগীরোগ, স্ট্রোক, এনসেফালাইটিস, মাল্টিপল স্ক্লেরোসিস, মাইগ্রেন ও ডিমেনশিয়া।
তার মতে, জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব ইতোমধ্যেই মানুষের মস্তিষ্কে দেখা দিতে শুরু করেছে।
গরমে মস্তিষ্কের কী হয়
মানবদেহের সবচেয়ে বেশি শক্তি ব্যবহারকারী অঙ্গগুলোর একটি হলো মস্তিষ্ক। চিন্তা করা, শেখা, মনে রাখা কিংবা সিদ্ধান্ত নেওয়ার সময় মস্তিষ্ক নিজেই প্রচুর তাপ তৈরি করে। এই অতিরিক্ত তাপ নিয়ন্ত্রণ করার জন্য শরীরকে অনেক পরিশ্রম করতে হয়। রক্তনালির মাধ্যমে রক্ত চলাচল সেই তাপ দূরে সরিয়ে দেয়।
কিন্তু অতিরিক্ত গরমে এই ভারসাম্য নষ্ট হতে পারে।
মস্তিষ্কের কোষ তাপমাত্রার প্রতি অত্যন্ত সংবেদনশীল। অতিরিক্ত গরমে কোষগুলোর মধ্যে তথ্য আদানপ্রদানও ব্যাহত হতে পারে।
অধ্যাপক সিসোদিয়া বলেন, বিষয়টি অনেকটা এমন একটি ঘড়ির মতো, যার প্রতিটি অংশ আলাদাভাবে ঠিক থাকলেও একসঙ্গে আর সঠিকভাবে কাজ করছে না।

সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতাও কমে যেতে পারে
অতিরিক্ত গরম শুধু অসুস্থ মানুষদের নয়, সুস্থ মানুষের মস্তিষ্কেও প্রভাব ফেলে।
গবেষণায় দেখা গেছে, প্রচণ্ড গরমে মানুষের মনোযোগ কমে যায়, ভুল সিদ্ধান্ত নেওয়ার ঝুঁকি বাড়ে এবং ঝুঁকিপূর্ণ আচরণ করার প্রবণতাও বেড়ে যেতে পারে।
এ ছাড়া রাগ, বিরক্তি, উদ্বেগ ও বিষণ্নতার অনুভূতিও বেড়ে যেতে পারে।
ঘুমের সমস্যা বাড়ায় গরম
তাপপ্রবাহের সময় রাতের তাপমাত্রা বেশি থাকলে অনেকেরই ঘুম ভালো হয় না।
খারাপ ঘুমের কারণে মেজাজ খিটখিটে হয়ে যেতে পারে এবং বিভিন্ন স্নায়বিক রোগ আরও জটিল হয়ে উঠতে পারে।
অধ্যাপক সিসোদিয়া বলেন, মৃগীরোগে আক্রান্ত অনেক মানুষের ক্ষেত্রে পর্যাপ্ত ঘুম না হলে খিঁচুনির ঝুঁকি বেড়ে যায়।
ডিমেনশিয়া রোগীদের জন্যও বড় ঝুঁকি
গবেষণায় দেখা গেছে, তাপপ্রবাহের সময় ডিমেনশিয়ায় আক্রান্ত মানুষের হাসপাতালে ভর্তি হওয়া এবং মৃত্যুর হার বাড়ে। এর একটি কারণ বয়সজনিত সমস্যা। বয়স্ক মানুষের শরীর সহজে তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণ করতে পারে না।
আবার স্মৃতিশক্তির সমস্যার কারণে অনেকেই পর্যাপ্ত পানি পান করতে ভুলে যান, জানালা বন্ধ রাখেন অথবা প্রচণ্ড গরমেও বাইরে বেরিয়ে পড়েন।
স্ট্রোকের ঝুঁকিও বাড়তে পারে
২৫টি দেশের তথ্য বিশ্লেষণ করে করা এক গবেষণায় দেখা গেছে, বছরের সবচেয়ে গরম দিনগুলোতে স্ট্রোকজনিত মৃত্যুর সংখ্যাও বেড়ে যায়।
যুক্তরাজ্যের ইউনিভার্সিটি হসপিটালস সাসেক্সের জেরিয়াট্রিক বিশেষজ্ঞ ডা. বেথান ডেভিস বলেন, প্রতিটি এক হাজার স্ট্রোকজনিত মৃত্যুর মধ্যে গরমের কারণে অতিরিক্ত দুটি মৃত্যু ঘটতে পারে।
সংখ্যাটি ছোট মনে হলেও, বিশ্বজুড়ে বছরে প্রায় ৭০ লাখ মানুষ স্ট্রোকে মারা যান। ফলে অতিরিক্ত গরমের কারণে প্রতিবছর কয়েক হাজার অতিরিক্ত মৃত্যুর আশঙ্কা রয়েছে।
তিনি আরও বলেন, জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে ভবিষ্যতে এই ঝুঁকি আরও বাড়বে।
গর্ভের শিশুও ঝুঁকিতে
অতিরিক্ত গরম শুধু বড়দের নয়, গর্ভের শিশুর ওপরও প্রভাব ফেলতে পারে।
যুক্তরাজ্যের ইম্পেরিয়াল কলেজ লন্ডনের গ্লোবাল উইমেন্স হেলথ বিভাগের অধ্যাপক জেন হার্স্ট বলেন, তাপপ্রবাহের সঙ্গে অপরিণত সময়ে সন্তান জন্মের সম্পর্ক পাওয়া গেছে।
বিভিন্ন গবেষণার তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, তাপপ্রবাহের সময় সময়ের আগেই সন্তান জন্মের ঝুঁকি প্রায় ২৬ শতাংশ বেড়ে যেতে পারে।
অপরিণত শিশুর ক্ষেত্রে পরে স্নায়ুবিকাশ ও শেখার সক্ষমতায় সমস্যা দেখা দিতে পারে।
তবে তিনি বলেন, এখনো অনেক প্রশ্নের উত্তর অজানা। কেন কিছু নারী বেশি ঝুঁকিতে থাকেন, আর অন্যরা থাকেন না, তা নিয়ে আরও গবেষণা দরকার।
মস্তিষ্কের সুরক্ষাব্যবস্থাও দুর্বল হতে পারে
বিজ্ঞানীরা আরও বলছেন, অতিরিক্ত গরম মস্তিষ্ককে সুরক্ষা দেওয়া বিশেষ প্রতিবন্ধকের কার্যকারিতা কমিয়ে দিতে পারে। ফলে ক্ষতিকর জীবাণু, ভাইরাস কিংবা বিষাক্ত পদার্থ সহজে মস্তিষ্কে পৌঁছানোর ঝুঁকি বাড়তে পারে।
এদিকে জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে মশাবাহিত রোগও বাড়ছে। জিকা, ডেঙ্গু এবং চিকুনগুনিয়ার মতো ভাইরাস কিছু ক্ষেত্রে স্নায়ুতন্ত্রকে আক্রান্ত করতে পারে।
সুইস ট্রপিক্যাল অ্যান্ড পাবলিক হেলথ ইনস্টিটিউটের চিকিৎসা কীটতত্ত্ববিদ টোবিয়াস সুটার বলেন, তাপমাত্রা বেড়ে যাওয়ায় মশার বংশবিস্তার মৌসুম আরও দীর্ঘ হচ্ছে। ফলে এসব রোগের বিস্তারের আশঙ্কাও বাড়ছে।
কেন সবার ক্ষেত্রে প্রভাব এক রকম নয়?
সব মানুষ গরমে একইভাবে অসুস্থ হন না। কেউ গরম সহজে সহ্য করতে পারেন, আবার কেউ দ্রুত অসুস্থ হয়ে পড়েন।
অধ্যাপক সিসোদিয়ার মতে, এর পেছনে জিনগত কারণও থাকতে পারে। কিছু মানুষের শরীরে এমন জিনগত বৈশিষ্ট্য থাকতে পারে, যা অতিরিক্ত গরমে তাদের মস্তিষ্ককে বেশি সংবেদনশীল করে তোলে। তবে এই বিষয়টি নিয়ে এখনো গবেষণা চলছে।
ভবিষ্যতের জন্য কী ভাবছেন বিজ্ঞানীরা?
বিজ্ঞানীরা এখনো জানার চেষ্টা করছেন, কোন বিষয়টি সবচেয়ে বেশি ক্ষতিকর - সবচেয়ে বেশি তাপমাত্রা, দীর্ঘদিন ধরে চলা তাপপ্রবাহ নাকি গরম রাত?
এই প্রশ্নগুলোর উত্তর এখনো পুরোপুরি জানা যায়নি।
তবে বিশেষজ্ঞদের মতে, সবচেয়ে ঝুঁকিতে থাকা মানুষদের আগে থেকেই চিহ্নিত করতে পারলে তাদের সুরক্ষায় কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া সম্ভব হবে। এর মধ্যে থাকতে পারে তাপপ্রবাহের আগাম সতর্কতা, ঝুঁকিপূর্ণ রোগীদের জন্য বিশেষ স্বাস্থ্যসেবা এবং অতিরিক্ত গরমে কাজ করতে না পারা শ্রমিকদের জন্য আর্থিক সহায়তা।
জাতিসংঘের মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেস ২০২৩ সালে বলেছিলেন, বৈশ্বিক উষ্ণায়নের যুগ শেষ, এখন শুরু হয়েছে বৈশ্বিক ফুটন্ত পৃথিবীর যুগ।
বিজ্ঞানীরাও বলছেন, জলবায়ু পরিবর্তন এখন আর ভবিষ্যতের কোনো আশঙ্কা নয়, এটি বর্তমানের বাস্তবতা।
এই পরিবর্তনের প্রভাব শুধু প্রকৃতি বা আবহাওয়ায় সীমাবদ্ধ নয়। আমাদের মস্তিষ্ক, মানসিক স্বাস্থ্য এবং স্নায়ুতন্ত্রও ধীরে ধীরে এর প্রভাব অনুভব করতে শুরু করেছে।
তাই অতিরিক্ত গরমের সময় পর্যাপ্ত পানি পান করা, রোদ এড়িয়ে চলা, ঘর ঠান্ডা রাখা, পর্যাপ্ত ঘুম নিশ্চিত করা এবং বিশেষ করে স্নায়বিক রোগে আক্রান্ত ব্যক্তিদের অতিরিক্ত সতর্ক থাকা আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
সূত্র: বিবিসি







