‘নেইমারকে আঁকড়ে ধরেই ডুবলেন আনচেলত্তি’

এশিয়া পোস্ট স্পোর্টস
‘নেইমারকে আঁকড়ে ধরেই ডুবলেন আনচেলত্তি’
আনচেলত্তি ও নেইমার। ছবি: সংগৃহীত

নরওয়ের কাছে ২-১ গোলে হেরে বিশ্বকাপের শেষ ষোলো থেকেই বিদায় নিয়েছে ব্রাজিল। মাঠের হার যতটা বড়, তার চেয়েও বড় হয়ে উঠেছে সেই হারের প্রতিক্রিয়া। ব্রাজিলীয় সংবাদমাধ্যমে শুরু হয়েছে তীব্র কাটাছেঁড়া। কোথাও আর্লিং হালান্ডের নির্মম ফিনিশিংকে সামনে আনা হচ্ছে, কোথাও কাঠগড়ায় কার্লো আনচেলত্তির পরিকল্পনা, আবার কোথাও নেইমারের দলে থাকা নিয়েই উঠছে কঠিন প্রশ্ন।

নিউইয়র্ক নিউ জার্সি স্টেডিয়ামে ব্রাজিলের রাতটা শেষ হয়েছে হতাশায়। প্রথমার্ধে পেনাল্টি পেয়েও গোল করতে পারেননি ব্রুনো গিমারায়েস। দ্বিতীয়ার্ধে এন্দ্রিকও বড় সুযোগ নষ্ট করেন। এরপর শেষ দিকে দুই আঘাতে ম্যাচের নিয়ন্ত্রণ বদলে দেন হালান্ড। যোগ করা সময়ে নেইমার পেনাল্টি থেকে গোল করলেও সেটি শুধু ব্যবধানই কমিয়েছে, ব্রাজিলের বিদায় ঠেকাতে পারেনি।

ম্যাচের পর ব্রাজিলীয় সংবাদমাধ্যমে সমালোচনার কেন্দ্রে উঠে আসে তিনটি বিষয়, সুযোগ নষ্ট, আনচেলত্তির বদলি এবং নেইমারকে ঘিরে আবেগনির্ভর সিদ্ধান্ত। গ্লোবোস্পোর্তে তাদের প্রতিবেদনে হালান্ডের প্রভাবকে বড় করে দেখিয়েছে। একই সঙ্গে ব্রাজিলের বিদায়ের কারণ হিসেবে খেলোয়াড়দের ভুল, সিদ্ধান্তহীনতা ও গোলের সামনে নিখুঁততার অভাবও সামনে আনা হয়েছে।

ইএসপিএন ব্রাজিলের ভাষা আরও কড়া। তাদের প্রতিবেদনে হালান্ডকে বলা হয়েছে ‘অনিবার্য’। ব্রাজিল নাকি সেই অনিবার্য হালান্ডের কাছেই ভেঙে পড়েছে। একই সঙ্গে ইউরোপীয় দলের বিপক্ষে বিশ্বকাপ নকআউটে টানা ষষ্ঠ বিদায়ের কথাও তুলে ধরা হয়েছে। নেইমারের প্রসঙ্গেও ভাষা ছিল আবেগী, শেষ বিশ্বকাপে সীমিত সময় খেলে, শেষ স্পর্শে গোল করেও তিক্ত বিদায় নিতে হলো তাকে।

তবে সবচেয়ে তীব্র সমালোচনা এসেছে কলামগুলোতে। ইএসপিএন ব্রাজিলের কলামিস্ট পাওলো কোবোস লিখেছেন, নরওয়ের কাছে হার ব্রাজিলিয়ান ফুটবলের ধীরে ধীরে নিভে যাওয়ার আরেকটি দুঃখজনক অধ্যায়। তার মতে, ২০২৬ বিশ্বকাপে ব্রাজিলের ব্যর্থতায় অবাক হওয়ার কিছু নেই। নেইমারকে স্কোয়াডে নেওয়াকে তিনি অদ্ভুত সিদ্ধান্ত এবং আনচেলত্তির কাজকে বিপর্যয়কর হিসেবে দেখেছেন।

ইউওএল-এ সমালোচনার মাত্রা আরও বেড়েছে। সাংবাদিক আর্নালদো রিবেইরোর কলামে আনচেলত্তির ম্যাচ ব্যবস্থাপনাকে কঠোর ভাষায় প্রশ্ন করা হয়েছে। সবচেয়ে আলোচিত মন্তব্যটি ছিল নেইমারকে ঘিরে। তার ভাষায়, ‘নেইমার আনচেলত্তিকে আঁকড়ে ধরে মরেননি, আনচেলত্তিই নেইমারকে আঁকড়ে ধরে মরেছেন।’

এই মন্তব্যের পেছনের যুক্তি ছিল আনচেলত্তির শেষ দিকের বদলি। এন্দ্রিক ও নেইমারকে নামাতে গিয়ে উইঙ্গারদের তুলে নেওয়া, জনমতের চাপের কাছে নতি স্বীকার করা এবং এতে দলের ভারসাম্য নষ্ট হওয়া, এসব নিয়েই প্রশ্ন তুলেছে ব্রাজিলীয় সংবাদমাধ্যম। মাউরো সেজার পেরেইরাও একই সুরে বলেছেন, আনচেলত্তির পরিবর্তনগুলোই শেষ পর্যন্ত ব্রাজিলকে আরও দুর্বল করেছে, বিশেষ করে নেইমারের অন্তর্ভুক্তি।

মিলি লাকোম্বের কলাম ছিল আরও বিস্ফোরক। তার লেখায় বর্তমান ব্রাজিল দলকে ছোট, ভীরু, নিয়ন্ত্রিত ও লজ্জাজনক হিসেবে বর্ণনা করা হয়েছে। নেইমারের ডাক পাওয়া নিয়েও তিনি কড়া ভাষা ব্যবহার করেছেন। তার মতে, নেইমারকে দলে নেওয়াই ছিল এক ধরনের কেলেঙ্কারি। বর্তমান ব্রাজিলকে তিনি জনগণের ব্রাজিল নয়, বরং ক্ষমতার ব্রাজিল হিসেবে দেখেছেন।

এই সমালোচনার কেন্দ্রে আছে ম্যাচের কয়েকটি বড় মুহূর্ত। ব্রুনো গিমারায়েসের পেনাল্টি মিস, এন্দ্রিকের একক সুযোগ নষ্ট, ভিনিসিয়ুস জুনিয়রের নিষ্প্রভতা, নেইমারের দেরিতে মাঠে নামা এবং শেষ দিকে রক্ষণের ভেঙে পড়া। অন্যদিকে হালান্ড দুই বড় সুযোগেই দুই গোল করে দেখিয়েছেন, নকআউট ম্যাচে নির্মম ফিনিশিং কতটা জরুরি।

ব্রাজিলের এই বিদায় শুধু একটি ম্যাচের হার নয়। ১৯৯০ সালের পর প্রথমবার বিশ্বকাপের শেষ আটে ওঠার আগেই বিদায় নিল তারা। ২০০২ সালের পর বিশ্বকাপ জেতা হয়নি। ২০৩০ সালে গিয়ে সেই অপেক্ষা দাঁড়াবে ২৮ বছরে। তাই সংবাদমাধ্যমের ক্ষোভও শুধু নরওয়ে ম্যাচ নিয়ে নয়, বরং পুরো এক প্রজন্মের অপূর্ণতা নিয়ে।

নেইমারের চোখের জল, আনচেলত্তির সিদ্ধান্ত, ভিনিসিয়ুসের অদৃশ্য হয়ে যাওয়া, এন্দ্রিকের মিস আর হালান্ডের নির্মমতা, সব মিলিয়ে ব্রাজিলে এখন চলছে বড় আত্মসমালোচনা। পাঁচবারের বিশ্বচ্যাম্পিয়নরা বিদায় নিয়েছে, আর তাদের সংবাদমাধ্যম প্রশ্ন করছে, ব্রাজিলিয়ান ফুটবল কি সত্যিই নিজের ছায়া হয়ে যাচ্ছে?