ব্রাজিলের ব্যর্থ কোচই যেভাবে আর্জেন্টিনার সাফল্যের অনুপ্রেরণা

এশিয়া পোস্ট স্পোর্টস
ব্রাজিলের ব্যর্থ কোচই যেভাবে আর্জেন্টিনার সাফল্যের অনুপ্রেরণা
কার্লো আনচেলত্তি ও লিওনেল স্কালোনি। ছবি: সংগৃহীত

কার্লো আনচেলত্তি এখন ব্রাজিলের ব্যর্থ বিশ্বকাপ অভিযানের কোচ। নরওয়ের কাছে শেষ ষোলোতেই হেরে বিদায় নিয়েছে পাঁচবারের বিশ্বচ্যাম্পিয়নরা। কিন্তু ফুটবলের গল্প কখনো কখনো অদ্ভুত মোড় নেয়। যে আনচেলত্তিকে ঘিরে এখন ব্রাজিলে প্রশ্ন, সেই ইতালিয়ান কোচের দর্শনই একসময় লিওনেল স্কালোনির আর্জেন্টিনাকে নতুন করে ভাবতে শিখিয়েছিল।

২০২২ কাতার বিশ্বকাপজয়ী আর্জেন্টিনার পেছনে শুধু লিওনেল মেসির জাদু ছিল না। ছিল স্কালোনির একটি বড় উপলব্ধিও। দায়িত্ব নেওয়ার পর শুরুতে তিনি ভেবেছিলেন, আধুনিক ফুটবল মানেই দ্রুত কাউন্টার অ্যাটাক, গতিময় উইঙ্গার, লম্বা পাস ও সরাসরি আক্রমণ। ২০১৮ রাশিয়া বিশ্বকাপ দেখে তার মনে হয়েছিল, ফুটবল হয়তো সেদিকেই যাচ্ছে।

কিন্তু শিগগিরই স্কালোনি বুঝতে পারেন, আর্জেন্টিনার সেরা ফুটবলারদের স্বভাব সেই ধরনের নয়। তাদের শক্তি বল ধরে রাখা, ছোট পাস, জায়গা তৈরি করা, ধৈর্য ধরে আক্রমণ সাজানো। দি মারিয়া, মেসি, পারেদেসদের দিয়ে শুধু ৩০-৪০ মিটার পাস আর দৌড়নির্ভর ফুটবল খেলালে তাদের সেরাটা পাওয়া যাবে না।

এই ভাবনার বদলে বড় প্রভাব ফেলেছিল আনচেলত্তির দর্শন। স্কালোনি একাধিকবার বলেছেন, কোচ হিসেবে আনচেলত্তিকে তিনি গভীরভাবে শ্রদ্ধা করেন এবং তার কাজ থেকে শেখার চেষ্টা করেন। আনচেলত্তির ফুটবল-দর্শনের মূল কথাও অনেকটা সেটিই, খেলোয়াড়কে নিজের ছকের মধ্যে বন্দী না করে তার স্বাভাবিক শক্তি বের করে আনা।

আনচেলত্তি নিজে একসময় বলেছিলেন, বল পায়ে খেলোয়াড়দের অতিরিক্ত নির্দেশ দিলে সৃজনশীলতা কমে যায়। রক্ষণে শৃঙ্খলা দরকার, কিন্তু আক্রমণে খেলোয়াড়কে স্বাধীনতা দিতে হয়। কারও যদি একটু বাইরে গিয়ে খেলতে স্বাচ্ছন্দ্য লাগে, তাকে জোর করে ভেতরে ঢোকানো তার পদ্ধতি নয়।

এই দর্শনই স্কালোনিকে নতুনভাবে ভাবতে বাধ্য করে। তিনি বুঝলেন, কোচের কাজ শুধু নিজের পদ্ধতি প্রতিষ্ঠা করা নয়, বরং খেলোয়াড়দের সেরা সংস্করণ বের করে আনা। তাই আর্জেন্টিনার খেলার ধরনও বদলে যায়। অতিরিক্ত সরাসরি ফুটবল থেকে বেরিয়ে তারা বল ধরে রাখা, ছন্দ নিয়ন্ত্রণ, পাসের ধারাবাহিকতা ও খেলোয়াড়দের স্বাচ্ছন্দ্যকে গুরুত্ব দিতে শুরু করে।

স্কালোনির আর্জেন্টিনায় সেই পরিবর্তন ধীরে ধীরে স্পষ্ট হয়। মেসিকে শুধু শেষ পাস বা গোলের জন্য অপেক্ষা করা ফুটবলার নয়, বরং খেলার ছন্দ নির্ধারণের স্বাধীনতা দেওয়া হয়। দি মারিয়াকে তার শক্তির জায়গায় ব্যবহার করা হয়। পারেদেস, দে পল, ম্যাক আলিস্টাররা পাসের ধারাবাহিকতা, চাপ সামলানো এবং জায়গা বন্ধ করার মধ্যে ভারসাম্য তৈরি করেন।

ফলও আসে দ্রুত। ২০২১ কোপা আমেরিকার ফাইনালে মারাকানায় ব্রাজিলকে হারিয়ে দীর্ঘ ২৮ বছরের শিরোপাখরা কাটায় আর্জেন্টিনা। পরের বছর কাতারে জেতে বিশ্বকাপ। এরপর ২০২৪ কোপা আমেরিকাও জিতে নিজেদের আধিপত্য আরও দৃঢ় করে স্কালোনির দল।

আর্জেন্টিনা এখন মিশরের বিপক্ষে শেষ ষোলোর ম্যাচের আগে সেই ধারাবাহিকতার আরেক পরীক্ষা দিচ্ছে। দলটি বয়সে অভিজ্ঞ, কয়েকজন ফুটবলার ক্লান্তির ঝুঁকিতে, কিন্তু স্কালোনির মূল দর্শন বদলায়নি। খেলোয়াড়কে বুঝে পরিকল্পনা, ম্যাচ অনুযায়ী রূপ বদলানো এবং দলের স্বাচ্ছন্দ্যকে প্রাধান্য দেওয়া, এই পথেই গত কয়েক বছর আর্জেন্টিনা সাফল্য পেয়েছে।


অন্যদিকে আনচেলত্তির নিজের ব্রাজিল সেই শিক্ষা মাঠে নামাতে পারেনি। নরওয়ের বিপক্ষে তারা সুযোগ তৈরি করেও গোলের ধার পায়নি। ব্রুনো গিমারায়েসের পেনাল্টি মিস, এন্দ্রিকের সুযোগ নষ্ট, নেইমারের বদলি হিসেবে নামা এবং শেষ দিকে হালান্ডের নির্মম ফিনিশিং, সব মিলিয়ে ব্রাজিলের পরিকল্পনা ভেঙে পড়ে। আনচেলত্তি পরে বলেছেন, ব্রাজিলকে এখন নতুন ধারণা খুঁজতে হবে, বিশেষ করে মাঝমাঠে নতুন প্রতিভা দরকার।

এখানেই গল্পটা আরও ব্যঙ্গাত্মক হয়ে ওঠে। যে কোচের দর্শন আর্জেন্টিনাকে নিজেদের স্বভাব বুঝতে সাহায্য করেছিল, তার নিজের ব্রাজিলই সেই ভারসাম্য খুঁজে পেল না। আর্জেন্টিনা আনচেলত্তির একটি নীতিকে নিজেদের বাস্তবতায় মিলিয়ে সাফল্য পেয়েছে। ব্রাজিল আনচেলত্তিকে পেয়েও নিজের বাস্তবতার সঠিক উত্তর খুঁজে পায়নি।

ফুটবলে সাফল্য শুধু বড় নাম, বড় ইতিহাস বা বড় প্রতিভায় আসে না। সাফল্য আসে সঠিক প্রশ্ন থেকে। স্কালোনি সেই প্রশ্ন করেছিলেন, আমার খেলোয়াড়রা কীভাবে সবচেয়ে ভালো খেলবে? আর সেই উত্তরের সূত্র তিনি খুঁজে পেয়েছিলেন আনচেলত্তির দর্শনে।

আজ আনচেলত্তির ব্রাজিল ব্যর্থ। কিন্তু তার ফুটবল ভাবনা ব্যর্থ নয়। সেই ভাবনাই একসময় আর্জেন্টিনাকে নিজের পথ চিনতে সাহায্য করেছিল। পার্থক্য শুধু এতটুকু, স্কালোনি সেই দর্শনকে নিজের দলের ভেতর বসাতে পেরেছিলেন। ব্রাজিলে আনচেলত্তি এখনো সেটি পারেননি।