বিদায়ের আগে নিজ এলাকায় ১৫৬ কোটি বরাদ্দ দেন এজাজ

বিদায়ের আগে নিজ এলাকায় ১৫৬ কোটি বরাদ্দ দেন এজাজ
ডিএনসিসির সাবেক প্রশাসক মোহাম্মদ এজাজ। ছবি : সংগৃহীত

রাজধানীর শেরেবাংলা নগরে বিজ্ঞান জাদুঘরের উল্টো দিকে ‘ভূইয়া বাড়ি’ নামের পাঁচতলা ভবনটির মালিক ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের (ডিএনসিসি) সাবেক প্রশাসক মোহাম্মদ এজাজ। প্রশাসক থাকাকালীন ক্ষমতার অপব্যহার করে নিজের বাড়ির সামনে সরকারি জায়গায় ডিএনসিসির অর্থায়নে পার্ক ও লাইব্রেরি নির্মাণের উদ্যোগ নিয়ে সমালোচনার জন্ম দেন তিনি। গত ৯ ফেব্রুয়ারি নিয়োগ বাতিলের পর প্রশাসক পদে থেকে এজাজের একের পর এক অনিয়মের তথ্য সামনে আসছে। 

অভিযোগ উঠেছে, প্রশাসকের চেয়ার ছাড়ার আগে নিজের বাড়ির আশপাশের এলাকার (ডিএনসিসির অঞ্চল-৫) সব সড়ক, আর্চ সেতুসহ আগারগাঁও এলাকার বিভিন্ন উন্নয়নমূলক কাজের জন্য বিশেষ বরাদ্দ থেকে ১৫৬ কোটি টাকার ৫৯টি টেন্ডার আহ্বান করেন মোহাম্মদ এজাজ। এসব টেন্ডার ডাকতে গিয়ে ক্ষমতার দাপটে নিয়মের ধার ধারেননি তিনি। ডিএনসিসির প্রশাসনিক, আর্থিক ও কারিগরি বিভাগের অনুমোদন না থাকায় নতুন প্রশাসক নিয়োগ পাওয়ার পর এজাজের আহ্বান করা ৫৯ টেন্ডারেরর মধ্যে ৩০টি এরই মধ্যে বাতিল হয়েছে। বাকিগুলোও নতুন করে মূল্যায়ন করা হচ্ছে।

ডিএনসিসির ঊর্ধ্বতন কয়েকজন প্রকৌশলী এশিয়া পোস্টকে জানান, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে ঢাকা উত্তরের প্রত্যেক অঞ্চলের জন্য বিশেষ উন্নয়ন বরাদ্দ ছিল সর্বোচ্চ ৭০ কোটি টাকা। কিন্তু তৎকালীন প্রশাসক এজাজের নিজের বাড়ি অঞ্চল-৫ এ নিয়ম না মেনে ১৫৬ কোটি টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়। তার বাসা ঘিরে আগারগাঁও ও শ্যামলী এলাকার আশপাশের সব সড়ক, ড্রেন, ফুটপাত এবং আর্চ সেতু সংস্কারের জন্য টেন্ডারও ডাকা হয়। কিন্তু এজাজের নিয়োগ বাতিল হওয়ার পর সেসব টেন্ডারও বাতিল হয়েছে। 

নিয়ম না মেনেই টেন্ডার আহ্বান 
ডিএনসিসি সূত্র জানায়, এজাজ প্রশাসক থাকাকালীন তার নির্দেশে চলতি অর্থবছরের জন্য ৫৯টি টেন্ডার আহ্বান করা হয়। আর্থিক ও কারিগরি অনুমোদন ছাড়াই প্রশাসকের মদদে ১৫৬ কোটি টাকার এসব দরপত্রের আহ্বান করেন ডিএনসিসির অঞ্চল-৫-এর ভারপ্রাপ্ত নির্বাহী প্রকৌশলী (বর্তমানে বহিষ্কৃত) মো. মিজানুর রহমান। প্রশাসকের ছাত্রছায়া পেয়ে বেপরোয়া হয়ে ওঠা এ প্রকৌশলী নিয়ম না মেনে আহ্বান করা দরপত্র অনুমোদনের জন্য করপোরেশনের ঊধ্বর্তন কর্মকর্তাদের চাপ প্রয়োগ করতেন বলেও অভিযোগ রয়েছে ।

সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানায়, প্রকৌশলী মিজানুর রহমানের আহ্বান করা ৫৯ দরপত্রের অধিকাংশেই আর্থিক ও কারিগরি কমিটির অনুমোদন ছিল না। এ নিয়ে প্রকাশ্যে কেউ আপত্তি না জানালেও ডিএনসিসির কর্মকর্তাদের মধ্যে এ নিয়ে সমালোচনার সৃষ্টি হয়। এমন প্রেক্ষাপটে পরবর্তী জটিলতা এড়াতে অন্তর্বর্তী সরকারের শেষ সময়ে এসে এসব দরপত্রে বৈধতা দেওয়ার তোড়জোড় শুরু করেন প্রশাসক এজাজ। কিন্তু তাতে ব্যর্থ হয়ে গা বাঁচাতে তড়িঘড়ি করে এজাজ নিজের চুক্তির মেয়াদের শেষ সপ্তাহে পাঁচটি দরপত্র বাতিল ঘোষণা করেন। পরবর্তী সময়ে নতুন প্রশাসক আরও ২৫টি দরপত্র বাতিল করেন ।

এ বিষয়ে ডিএনসিসির অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী আরিফুর রহমান এশিয়া পোস্টকে বলেন, বাতিল হওয়া দরপত্রগুলোতে প্রশাসনিক, আর্থিক ও কারিগরি অনুমোদনের অভাব ছিল। তবে ৫৯টি দরপত্রের মধ্যে মাত্র কয়েকটির প্রশাসনিক, আর্থিক ও কারিগরি অনুমোদন ছিল, বাকিগুলোর কোনো অনুমোদন ছিল না। দরপত্রগুলো বর্তমানে দাপ্তরিক তদন্তের অধীনে রয়েছে।

এজাজের বাড়ির পাশের ৯টি কাজসহ বাতিল হয়েছে যেসব টেন্ডার 
এজাজের সময়ে আহ্বান করা দরপত্রগুলোর মধ্যে যে ৩০টি বাতিল হয়েছে তার তালিকা রয়েছে এশিয়া পোস্টের হাতে। সেগুলো হলো—ডিএনসিসির ৩৪ নম্বর ওয়ার্ডের রায়েরবাজার কমিউনিটি সেন্টারের মেরামত, ২৬ নম্বর ওয়ার্ডের আব্দুল হালিম কমিউনিটি সেন্টারের সংস্কার, ৩৩ নম্বর ওয়ার্ডের নবীনগর হাউজিংয়ের রাস্তা ও ড্রেনেজ ব্যবস্থার উন্নয়নের একাধিক, ২৮ নম্বর ওয়ার্ডের আগারগাঁও এলাকায় গাস ট্রান্সমিশন কোম্পানি লিমিটে ভবনের পাশের খালের ওপর আর্চ সেতু, ৩০ নম্বর ওয়ার্ডের বায়তুল আমান হাউজিং সোসাইটির সড়কের ও ড্রেনের সংস্কারের একাধিক কাজ, ৩৩ নম্বর ওয়ার্ডের ঢাকা উদ্যানের পাশের বিভিন্ন সড়ক, ফুটপাত ও ড্রেন সংস্কারে একাধিক কাজ, ৩৩ নম্বর ওয়ার্ডের মোহাম্মদীয়া হাউজিং লিমিটেড এলাকার সড়ক ও ড্রেনের উন্নয়ন, ২৮ নম্বর ওয়ার্ডের শ্যামলী ২, ৩, ৪ নম্বর সড়ক ও ড্রেনের উন্নয়নে একাধিক কাজ, ২৮ নম্বর ওয়ার্ডের পূর্ব আগারগাঁও এলাকার ভূঁইয়া গলির সড়ক সংস্কার, বনলতা হাউজিং এলাকার সড়ক ও ড্রেন সংস্কার, বাংলাদেশ ফিল্ম আর্কাইভ ভবনের পাশের আর্চ সেতুর সংস্কার এবং ২৭ নম্বর ওয়ার্ডের আগারগাঁও মেট্রো স্টেশন থেকে প্রধান উপদেষ্টার দপ্তর পর্যন্ত এলাকার রোড মিডিয়ান, ফুটপাতের উন্নয়নকাজ। এর মধ্যে এজাজের বাড়ি ঘিরে আগারগাঁও ও শ্যামলীর সড়ক, ফুটপাত, ড্রেন এবং আর্চ সেতু সংস্কারের ৯টি দরপত্রও রয়েছে। 

বাড়ির সামনে দ্রুত এগোচ্ছে সড়ক, পার্ক ও লাইব্রেরির কাজ
শেষ সময়ে ডাকা টেন্ডার আটকে গেলেও এজাজের বাড়ির আশপাশ ঘিরে আগেই শুরু হওয়া সড়ক, পার্ক ও লাইব্রেরির কাজ এখনও চলমান। সরেজমিন গিয়ে দেখা যায়, শেরেবাংলা নগরে মোহাম্মদ এজাজের বাড়িটি সম্প্রতি নতুন করে রং করা হয়েছে । আগে তার বাড়িতে ছিল কম প্রশস্তের একটি সিঁড়ি। তিনি প্রশাসক হওয়ার পরপরই সেখানে নতুন লিফট যুক্ত হয়েছে। বাড়ির সামনে প্রায় ২০ ফুটের মতো রাস্তা। আগে গাড়ি নিয়ে এজাজের বাড়িতে যেতে হলে আগারগাঁও কেন্দ্রীয় ঈদগাহ মাঠের সামনে দিয়ে ইউটার্ন নিয়ে তারপর কয়েকটি বাড়ি পার হয়ে আসা লাগত। 

মোহাম্মদ এজাজের এলাকার একাধিক বাসিন্দা ও কয়েকজন ঘনিষ্ঠ ব্যক্তির সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, প্রশাসক হওয়ার পর প্রভাব খাটিয়ে নিজের বাড়ির সামনের একটি স্কুল উচ্ছেদের উদ্যোগ নেন তিনি। বিকল্প জায়গা দেওয়ার আশ্বাস দিয়ে স্কুলটি উচ্ছেদ করে সেখানে শুরু হয় পার্ক ও পাবলিক লাইব্রেরি নির্মাণের কাজ। এ ছাড়া মূল সড়ক থেকে প্রশাসকের বাড়িতে ঢোকার জন্য প্রায় ৩০ ফুট চওড়া একটি সংযোগ সড়ক নির্মাণের কাজ চলছে দ্রুতগতিতে। 

এ কাজে সংশ্লিষ্ট ডিএনসিসির কর্মকর্তারা বলেন, পার্কের জায়গাটি মূলত গণপূর্তের। সেখানে বড় বড় অবকাঠামো নির্মাণ হয়েছে, সড়ক হয়েছে, কিন্তু কেউ স্কুল উচ্ছেদ করেনি। আওয়ামী লীগ সরকারও স্কুল উচ্ছেদের উদ্যোগ নেয়নি। কিন্তু এজাজ প্রশাসক হয়ে প্রথমেই স্কুলটি উচ্ছেদ করেন। এরপর নিজের ক্ষমতা দেখিয়ে গণপূর্তের কাছ থেকে জায়গাটি সিটি করপোরেশনের পার্কের জন্য বরাদ্দ করিয়ে নেন। 

দায় এড়ানোর চেষ্টা এজাজের
নিজ এলাকার উন্নয়নে বেশি বরাদ্দ দিতে অনুমোদন ছাড়া টেন্ডার আহ্বান ও বাতিলের বিষয়টি অস্বীকার করেন মোহাম্মদ এজাজ। এশিয়া পোস্টকে তিনি বলেন, ‘দরপত্র আহ্বানের আগে প্রধান প্রকৌশলী, তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী এবং সংশ্লিষ্টদের নিয়ে আর্থিক ও কারগরি কমিটি যাচাই-বাছাই করলে প্রশাসক দরপত্র অনুমোদন করেন। আমার কাজ শুধু দরপত্র অনুমোদন করা ছিল। বাকি কাজ ছিল কমিটির। এতে যারা আমার সংশ্লিষ্টতা তুলছেন তারা হয়তো মিথ্যা বলছেন অথবা না বুঝে বলছেন।’

যা বলছেন নতুন প্রশাসক
মোহাম্মদ এজাজের অনিয়মের বিষয়ে জানতে চাইলে ডিএনসিসির নতুন প্রশাসক শফিকুল ইসলাম মিল্টন এশিয়া পোস্টকে বলেন, ‘আমি শুনেছি, আপনারাও শুনেছেন। এই বিষয়ে আমি কথা না বলে অফিশিয়ালি কোনো অন্যায় আছে কি না তা খতিয়ে দেখব। এই বিষয়টিকে তদন্তের মাধ্যমে দেখে তারপর পরবর্তী ব্যবস্থা নেব।’ 

এদিকে মঙ্গলবার (৩ মার্চ) সচিবালয়ে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন ঢাকা উত্তর, দক্ষিণ ও গাজীপুর সিটি করপোরেশনের প্রশাসকরা। সেখান থেকে বেরিয়ে ডিএনসিসি প্রশাসক শফিকুল ইসলাম মিল্টন গণমাধ্যমকে বলেন, ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন এখন ভঙ্গুর অবস্থায়। ফান্ড নেই। অথচ ১৪৭০ কোটি টাকার টেন্ডারে ওয়ার্ক অর্ডার দিয়ে দেওয়া হয়েছে। সাবেক প্রশাসক যিনি ছিলেন তিনি ১০ ফেব্রুয়ারি শেষ অফিস করে ৩৪টি ফাইল সই করে গেছেন; যেখানে বিল দিতে হবে। আসলে কোনো টাকাই নেই।