পাকিস্তানি নাগরিকের জমি ও সড়ক দখল করে নির্মাণ হয় আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় কার্যালয়

পাকিস্তানি নাগরিকের জমি ও সড়ক দখল করে নির্মাণ হয় আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় কার্যালয়
ছবি: এশিয়া পোস্ট গ্রাফিকস

১৯৮১ সাল থেকে দলের কেন্দ্রীয় কার্যালয় হিসেবে গুলিস্তানের ২৩ বঙ্গবন্ধু অ্যাভিনিউয়ের ঠিকানা ব্যবহার শুরু করে বর্তমানে কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগ। তবে ভবনটি যে জমিতে দাঁড়িয়ে আছে, তার মূল মালিক একজন পাকিস্তানি নাগরিক।

Advertisement

মুক্তিযুদ্ধের পর মূল মালিক আর বাংলাদেশে ফেরেননি। এক পর্যায়ে পরিত্যক্ত চারতলা ভবনসহ পুরো জায়গাটির নিয়ন্ত্রণ নিয়ে সেখানে আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় কার্যালয় বানানো হয়।

এরপর থেকে গত ৪৫ বছরে কখনো হোল্ডিং ট্যাক্স বা ভূমি উন্নয়ন কর পরিশোধ করেনি দলটি। এমনকি মূল জমির সঙ্গে সিটি করপোরেশনের সড়কের জমিও দলের প্রধান কার্যালয়ের অন্তর্ভুক্ত করা হয়।

১৯৮১ সালের ১৩ থেকে ১৫ ফেব্রুয়ারি গুলিস্তানের হোটেল ইডেনে শেখ হাসিনাকে আওয়ামী লীগের সভাপতি নির্বাচিত করা হয়। সম্মেলনের সময় তিনি ভারতে ছিলেন। ১৭ মে দেশে ফেরার পর নেতাকর্মীরা ২৩ বঙ্গবন্ধু অ্যাভিনিউয়ের পরিত্যক্ত ভবনে দলীয় কার্যক্রম শুরু করে।

চারতলা ভবনটির মূল মালিক ছিলেন পাকিস্তানের নাগরিক মাম্মা বাই আদমজী। মুক্তিযুদ্ধের সময় তৎকালীন পশ্চিম পাকিস্তানে চলে যান। বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর আর ফেরেননি তিনি। ফলে ৬ দশমিক ৩১ শতাংশ জমির ওপর থাকা তার ভবনটি পরিত্যক্ত পড়ে থাকে।

বছরের পর বছর খাজনা, কর বা অন্যান্য পাওনা পরিশোধ না হওয়ায় সরকার জমিসহ ভবনটিকে ‘অনিবাসী সম্পদ’ ঘোষণা করে। নিয়ন্ত্রণ যায় গণপূর্ত অধিদপ্তরের হাতে।

ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের হোল্ডিং ট্যাক্সের পুরোনো বইয়ে এখনও মালিক হিসেবে মাম্মা বাই আদমজীর নাম রয়েছে।

বর্তমান ১০ তলা ভবন নির্মাণের আগ পর্যন্ত ওই চারতলা ভবনই ছিল আওয়ামী লীগের প্রধান কার্যালয়।

সড়কের জমি দখল করে ‘জয় মার্কেট’

৯০-এর দশকে পুরোনো ভবনসংলগ্ন সড়কের জমি দখলে নিয়ে কার্যালয় সম্প্রসারণের উদ্যোগ নেন আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা। ভবনের পাশে ১৮০৫ নম্বর দাগে ৪ দশমিক ১২ শতাংশ জমিতে ছিল সিটি করপোরেশনের সড়ক।

প্রসঙ্গত, ১৯৮৬ সালে বঙ্গবন্ধু অ্যাভিনিউয়ের ১ দশমিক ২০ একর খালি জায়গা পার্কিংয়ের জন্য সিটি করপোরেশনকে দেয় গণপূর্ত বিভাগ। সিটি করপোরেশনের জরিপের রেকর্ড অনুযায়ী, ওই জমির ১৮১৬ দাগের ৪৪ শতাংশে নির্মিত হয় উদয়ন মার্কেট। আর ১৮০৫ দাগের ৪ দশমিক ১২ শতাংশ জমি ছিল সেই মার্কেটে প্রবেশের সড়ক।

১৯৯৬ সালে তৎকালীন অবিভক্ত ঢাকা সিটি করপোরেশনের মেয়র ছিলেন আওয়ামী লীগ নেতা মোহাম্মদ হানিফ। ওই সময়ে তার নেতাকর্মীরা সড়কের জায়গা এবং জাতীয় যক্ষ্মা নিরোধ সমিতির (নাটাব) ভবন কমপ্লেক্সের একাংশ দখল করে দোকানপাট গড়ে তোলেন। নতুন মার্কেটের নাম রাখা হয় শেখ হাসিনার পুত্র সজীব ওয়াজেদ জয়ের নামে ‘জয় মার্কেট’।

১৯৯৯ সালের ফেব্রুয়ারিতে করপোরেশনের প্রধান সম্পত্তি কর্মকর্তা ওই জমিতে গড়ে ওঠা জয় মার্কেট উচ্ছেদের জন্য ম্যাজিস্ট্রেট শহিদুল আলমকে দায়িত্ব দেন। আইনশৃঙ্খলা নিয়ন্ত্রণে ঢাকা মহানগর পুলিশের উপপুলিশ কমিশনারকেও চিঠি দেওয়া হয়।

একই বছরের আগস্টে মেয়র হানিফ আইন উপেক্ষা করে কাঠের অবকাঠামোর মার্কেট নির্মাণে সড়কটি অস্থায়ী বরাদ্দ দেন। সেপ্টেম্বরে সড়কে সামান্য চলাচলের জায়গা রেখে দুই পাশে ও ওপরে টিনের কাঠামো তৈরি হয়।

ব্যবসায়ীদের দিয়ে আবেদন

২০০৯ সালে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় এলে জয় মার্কেটের ব্যবসায়ীরা অভিযোগ করেন, সেখানে তাদের ব্যবসা হচ্ছে না। গুলিস্তানের ফুলবাড়িয়া সুপার মার্কেট, সিটি সুপার মার্কেট বা নগরপ্লাজায় তাদের ব্যবসা স্থানান্তরের দাবি তোলেন তারা।

সূত্র বলছে, প্রকৃতপক্ষে আওয়ামী লীগের কার্যালয় সম্প্রসারণের জন্য জমি খালি করাতে ব্যবসায়ীদের দিয়ে ওই আবেদন করানো হয়েছিল।

জয় মার্কেট সমিতির নেতারা জানান, মেয়র মোহাম্মদ হানিফ তাদের সড়কের জায়গাটি মার্কেট হিসেবে বরাদ্দ দিয়েছিলেন। ২০০৯ সালে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসার পর দলের উপদপ্তর সম্পাদক মৃণাল কান্তি দাস মার্কেটের জায়গা খালি করে অন্য মার্কেটে স্থানান্তরের প্রস্তাব দেন।

এ নিয়ে তিনি কয়েকবার ব্যবসায়ীদের প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের কর্মকর্তা কবির বিন আনোয়ারের সঙ্গে দেখা করান। সেই প্রস্তাবের পরিপ্রেক্ষিতে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে একটি চিঠি দেওয়া হয়।

এরই মধ্যে ২০১০ সালে মৃণাল কান্তি দাস সিটি করপোরেশনে আবেদন করেন, ব্যবসায়ীরা চলে গেলে ফাঁকা জমি আওয়ামী লীগকে বরাদ্দ দেওয়া হোক। তৎকালীন মেয়র বিএনপি নেতা সাদেক হোসেন খোকা সে প্রস্তাবে সায় দেননি।

২০১১ সালের ৪ জানুয়ারি প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের তৎকালীন পরিচালক (প্রশাসন) কবির বিন আনোয়ার জয় মার্কেটের ৪১৯ জন ব্যবসায়ীকে যাত্রাবাড়ী কাঁচামালের আড়তে বরাদ্দ দিতে স্থানীয় সরকার সচিবকে চিঠি দেন। সে অনুযায়ী ১৪ ফেব্রুয়ারি স্থানীয় সরকার বিভাগ সিটি করপোরেশনকে চিঠি দেয়। কিন্তু সাদেক হোসেন খোকা তাতেও সাড়া দেননি।

সিটি করপোরেশনের কাছ থেকে সাড়া না পেয়ে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় ঢাকার জেলা প্রশাসকের মাধ্যমে জয় মার্কেটের জায়গাটি ১ নম্বর খাস খতিয়ানভুক্ত করার নির্দেশ দেয়। ২০১১ সালে মহানগর জরিপে সড়কের ১৮০৫ নম্বর দাগের জায়গা জেলা প্রশাসকের নামে অকৃষি জমি হিসেবে রেকর্ডভুক্ত হয়।

বরাদ্দ চেয়ে আবেদন আওয়ামী লীগের

অকৃষি জমি হিসেবে রেকর্ডভুক্ত হওয়ার পর জমিটি বরাদ্দ চেয়ে আবেদন করে আওয়ামী লীগ। তৎকালীন জেলা প্রশাসক ২০১২ সালের ১ ফেব্রুয়ারি আওয়ামী লীগকে বরাদ্দ দিতে ভূমি মন্ত্রণালয়ে প্রস্তাব পাঠান।

বরাদ্দ চেয়ে আওয়ামী লীগের আবেদন।
বরাদ্দ চেয়ে আওয়ামী লীগের আবেদন।

মন্ত্রণালয় ৪ দশমিক ১২ শতাংশ জমি ৪ কোটি ৬৬ লাখ ২৬ হাজার ৫৪০ টাকায় দীর্ঘমেয়াদি বন্দোবস্তের প্রস্তাব অনুমোদন করে। ১৩ মার্চ বরাদ্দপত্র জারি হয়।

১৪ শর্তে ২০১২ সালের ৬ জুন জেলা প্রশাসক মো. মহিবুল হক তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নামে দলিল রেজিস্ট্রেশন করে দেন। দলিল নম্বর ১৯৯১/২০১২।

জেলা প্রশাসন সূত্র বলছে, বাস্তবে ওই বরাদ্দের বৈধতা নিয়েই প্রশ্ন রয়েছে।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে ঢাকা জেলা প্রশাসক কার্যালয়ের ভূমিবিষয়ক একজন কর্মকর্তা এশিয়া পোস্টকে বলেন, ‘সড়কের জায়গা কোনোভাবেই দীর্ঘমেয়াদি বন্দোবস্ত দেওয়ার সুযোগ নেই। তৎকালীন জেলা প্রশাসক সরকারের কাছে সুবিধা নিতে এই বন্দোবস্ত দিয়েছেন।’

মূল জমিও গেছে শেখ হাসিনার নামে

মাম্মা বাই আদমজীর নামের পুরোনো চারতলা ভবনটির জমিও শেখ হাসিনার নামে নিবন্ধিত হয়েছে।

১৯৮১ সাল থেকে ভবনটি ব্যবহার শুরু করলেও আওয়ামী লীগ আনুষ্ঠানিকভাবে বরাদ্দের আবেদন করে অনেক পরে। তখন গণপূর্তমন্ত্রী ছিলেন দলের প্রেসিডিয়াম সদস্য মোহাম্মদ নাসিম। মন্ত্রণালয় নথিপত্র পর্যালোচনা করলেও বরাদ্দ প্রক্রিয়া সম্পন্ন করতে পারেনি।

২০০১ থেকে ২০০৬ সাল পর্যন্ত বিএনপির শাসনামলেও ভবনটিতে আওয়ামী লীগের কার্যালয় চালু ছিল।

২০০৭ সালে সেনাসমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকার জমিটি উন্মুক্ত দরপত্রে ইজারা দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়। কিন্তু সেই সরকারের ঘনিষ্ঠ সাবেক মেয়র ও আওয়ামী লীগ নেতা সাঈদ খোকন এটি সেনাসমর্থিত প্রগতিশীল গণতান্ত্রিক পার্টির (পিডিপি) নামে বরাদ্দ নেওয়ার চেষ্টা করেন। তবে শেষ পর্যন্ত সেই বরাদ্দ হয়নি।

২০০৯ সালে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় এলে জমিটি বরাদ্দ নেওয়ার বদলে স্থায়ীভাবে কিনে নেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হয়। পরের বছর ৮ এপ্রিল সূত্রাপুর সাবরেজিস্ট্রি অফিসে ১৪৫৬ নম্বর দলিলে ৬ দশমিক ৩১ শতাংশ জমি ৯০ লাখ টাকায় শেখ হাসিনার কাছে বিক্রি করে গৃহায়ণ ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়।

আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ের দলিল।

নতুন ভবনে বাড়তি জমি

এক পর্যায়ে পুরোনো চারতলা ভবন ভেঙে আধুনিক ১০ তলা ভবন নির্মাণের উদ্যোগ নেয় আওয়ামী লীগ।

মাম্মা বাই আদমজীর নামে মূল জমি ছিল ৬ দশমিক ৩১ শতাংশ। কিন্তু বর্তমান ভবনের মোট জমির পরিমাণ ১০ দশমিক ৪৩ শতাংশ। বাড়তি ৪ দশমিক ১২ শতাংশ জমি ছিল সিটি করপোরেশনের সড়কের জন্য নির্ধারিত।

দুই জমি একত্র করে ২০১৬ সালে নতুন বহুতল ভবনের নির্মাণকাজ শুরু হয়। ২০১৮ সালের ২৩ জুন শেখ হাসিনা ভবনটির আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করেন। নির্মাণের আগেই জমি দুটি শেখ হাসিনার নামে বরাদ্দ দেয় তৎকালীন আওয়ামী লীগ সরকার।

ডিএসসিসির বক্তব্য

ডিএসসিসির প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা জহিরুল ইসলাম এশিয়া পোস্টকে বলেন, ‘সিটি করপোরেশনের সড়কের নামে রেকর্ডকৃত জায়গা হয়ে থাকলে সেটি অবশ্যই পুনরুদ্ধার করা হবে। আমরা সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে যোগাযোগ করব। এ ছাড়াও হোল্ডিং ট্যাক্স আদায়ে করপোরেশনের বিধি অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’

ঢাকার জেলা প্রশাসক ফরিদা খানম বলেন, ‘আমি ডকুমেন্টটা দেখিনি। সেখানে যদি শর্ত অনুযায়ী ভূমিকরসহ অন্যান্য কর অনেক বছর পর্যন্ত না দেওয়া হয়ে থাকে, তাহলে ভূমি ব্যবস্থাপনা আইনের আওতায় যে ব্যবস্থা নেওয়া প্রয়োজন, তাই নেওয়া হবে।’