সপ্তাহজুড়ে জ্বলছে মাতুয়াইলের ভাগাড়, ধোঁয়ায় নাকাল জনজীবন

রাজধানীর মাতুয়াইলে অবস্থিত দেশের সবচেয়ে বড় ল্যান্ডফিলে (বর্জ্যের ভাগাড়) আগুন জ্বলছে প্রায় এক সপ্তাহ ধরে। ডেমরা, কোনাপাড়া, যাত্রাবাড়ী, জুরাইনসহ পার্শ্ববর্তী এলাকা ছাড়িয়ে বর্জ্য পোড়া ধোঁয়া ছড়িয়ে পড়েছে মতিঝিল পর্যন্ত। ধোঁয়ায় দিশাহারা স্থানীয় বাসিন্দারা শ্বাস-প্রশ্বাসের সমস্যায় ভুগছেন।
ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের (ডিএসসিসি) কর্মকর্তারা ফায়ার সার্ভিসের সহায়তায় আগুন নিয়ন্ত্রণে আনার দাবি জানালেও বৃহস্পতিবার (২৬ ফেব্রুয়ারি) রাতেও ল্যান্ডফিলের বিভিন্ন স্থানে আগুন জ্বলতে দেখা গেছে। ডিএসসিসি বলছে, রোববার (২২ ফেব্রুয়ারি) এ আগুনের সূত্রপাত ঘটে। তবে এলাকাবাসীর দাবি, আগুন জ্বলছে শুক্রবার (২০ ফেব্রুয়ারি) থেকে। শনি ও রোববার আগুনের তীব্রতা ছিল সবচেয়ে বেশি। ১০-২০ কিলোমিটার দূর থেকেও মাতুয়াইল ল্যান্ডফিলের আগুনের শিখা দেখা গেছে। এখন আগুন কিছুটা কমলেও ধোঁয়ার কারণে অবর্ণনীয় ভোগান্তি পোহাতে হচ্ছে।
এদিকে আগুনের এ ঘটনার পর ল্যান্ডফিলটির অগ্নিনিরাপত্তার প্রশ্ন নতুন করে সামনে এসেছে। এখানে কর্মরত একাধিক প্রকৌশলীর সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, দেশের সবচেয়ে বড় এই ভাগাড়ে প্রায়ই মিথেন গ্যাস থেকে আগুনের সূত্রপাত ঘটলেও এখানে অগ্নিনির্বাপনের স্থায়ী ব্যবস্থা এখন পর্যন্ত নেই। সম্প্রতি ল্যান্ডফিল এলাকার ৪০টি পয়েন্টে ফায়ার হাইডেন্ট বসানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এরই মধ্যে এ সংক্রান্ত জরিপ সম্পন্ন হয়েছে।
‘অবস্থা খুবই খারাপ, নিঃশ্বাস নিতে কষ্ট হচ্ছে’
ডিএসসিসি সূত্র জানায়, বর্জ্য থেকে সৃষ্ট মিথেন গ্যাস মাতুয়াইল ল্যান্ডফিলের টানেলসহ বিভিন্ন কোণে জমে রয়েছে। সেখানে আগুনের কোনো উৎস পৌঁছলে প্রায়ই আগুন ধরে যায়। এবারও তেমনভাবেই আগুনের সূত্রপাত হয়ে থাকতে পারে। বৃহস্পতিবার সরেজমিনে ঘুরে দেখা যায়, মাতুয়াইল ল্যান্ডফিলে বর্জ্যের স্তূপ যেন ছোট ছোট টিলায় পরিণত হয়েছে। সেসব টিলার এখানে সেখানে আগুন জ্বলছে। ময়লার স্তূপের ওপর ঘুরপাক খাচ্ছে ধোঁয়ার কুণ্ডলী। দিনের আলোয় আগুনের খুব বেশি তীব্রতা দেখা না গেলেও সন্ধ্যার পর রীতিমতো লেলিহান শিখা দেখা গেছে। বর্জ্য পোড়া ধোঁয়া মাতুয়াইল ছাড়িয়ে ছড়িয়ে পড়েছে যাত্রাবাড়ী, ডেমরা, কোনাপাড়া, স্টাফ কোয়ার্টার, সাইনবোর্ড, মুগদা, মান্ডা, মানিকনগর, সায়েদাবাদ ও জুরাইন পর্যন্ত।
রায়েরবাগ এলাকার বাসিন্দা মোবারক হোসেন বলেন, ‘কয়েক দিন ধরে অবস্থা খুবই খারাপ। নিঃশ্বাস নিতে কষ্ট হচ্ছে। অক্সিজেন পাওয়া যাচ্ছে না ঠিকঠাক। সারাক্ষণ নাকে পোড়া গন্ধ লাগে। আসলে আমরা সাধারণ নাগরিকরা বিষে তিলে তিলে মরে যাচ্ছি, আমাদের কথা কোনো সরকারই ভাবছে না।’
মাতুয়াইলের আজাদুল ইসলাম বলেন, ‘ভাগাড়ের ময়লার গন্ধে এমনিতেই ভোগান্তির শেষ নেই। বছরজুড়ে রোগশোক লেগেই আছে। বিশেষ করে বাচ্চাদের নিঃশ্বাসের সমস্যা ব্যাপক। এর মধ্যে আগুনের কারণে দুর্গন্ধ এবং ধোঁয়ায় জীবন অতিষ্ঠ হয়ে উঠেছে।’
একই ভোগান্তির কথা জানা গেছে ল্যান্ডফিল সংলগ্ন এলাকার অন্তত ডজনখানেক বাসিন্দার সঙ্গে কথা বলে। এই ভাগাড়ের কারণে স্থানীয়দের জনজীবন বিপর্যয়ের মুখে পড়েছে বলেও জানান তারা। ল্যান্ডফিল এখান থেকে সরিয়ে নেওয়ার দাবিও জানিয়েছেন কেউ কেউ।
ল্যান্ডফিলের শ্রমিকরা জানান, কয়েক দিন ধরে অল্প অল্প করে ল্যান্ডফিলের বর্জ্যে আগুন লাগা শুরু হয়। গত শুক্রবার (২০ ফেব্রুয়ারি) থেকে আগুনের তীব্রতা বাড়ে। এতে ধোঁয়ার পরিমাণও বেড়ে যায়। মুহূর্তেই তা আশপাশের এলাকায় ছড়িয়ে পড়ে।
ডিএসসিসির বর্জ্যবাহী গাড়ির কয়েকজন চালক এশিয়া পোস্টকে বলেন, ধোঁয়ার কারণে এখন ল্যান্ডফিলে গাড়ি নিয়ে আসাই যাচ্ছে না।
ঢাকার বাতাস দূষিত করছে মাতুয়াইল ল্যান্ডফিলের ধোঁয়া
ডিএসসিসি সূত্র জানায়, অবিভক্ত ঢাকার বর্জ্য ব্যবস্থাপনার জন্য ১৯৮৯ সালে ৫০ একর জমি অধিগ্রহণ করে মাতুয়াইলে ল্যান্ডফিল স্থাপন করা হয়। ২০০৬ সালে ল্যান্ডফিলের বর্জ্য ধারণক্ষমতা ফুরিয়ে এলে আরও ৫০ একর জমি অধিগ্রহণ করে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন। এ জমির ব্যবহারও শেষ পর্যায়ে।
সরেজমিনে পরিদর্শন এবং ল্যান্ডফিল্ডের শ্রমিক-কর্মচারী ও স্থানীয় বাসিন্দাদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, এরই মধ্যে ল্যান্ডফিলের বর্জ্যের উচ্চতা ৭০ ফুট ছাড়িয়ে গেছে। মাতুয়াইলের ল্যান্ডফিলে প্রবেশের রাস্তার ওপরে ও এর আশপাশেও জমেছে বর্জ্যের পাহাড়। বর্জ্যের দূষিত কালো পানি ড্রেনের মাধ্যমে আশপাশের ডোবা-নালায় মিশে যাচ্ছে। ল্যান্ডফিলের আশপাশে গড়ে ওঠা আবাসিক ভবনের বাসিন্দারা দুর্গন্ধে নাজেহাল হয়ে পড়েছেন।
ডিএসসিসির পরিসংখ্যান বলছে, গত পাঁচ বছরে মাতুয়াইল ল্যান্ডফিল থেকে করপোরেশন প্রায় ৪৭ লাখ টন বর্জ্য চূড়ান্তভাবে অপসারিত করলেও গড়ে বছরে প্রায় ১৩ শতাংশ বর্জ্য বাড়ছে ঢাকা দক্ষিণে। প্রতিদিন প্রায় এক হাজার ট্রিপে ছোট বড় ট্রাক, হুইলডোজার, এক্সক্যাভেটর ও বুলডোজারের মাধ্যমে প্রায় চার হাজার টন বর্জ্য স্থানান্তর করা হয় এই ল্যান্ডফিলে।
জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ডা. লেনিন চৌধুরী এশিয়া পোস্টকে বলেন, ‘মাতুয়াইল ল্যান্ডফিলটি থেকে প্রচুর পরিমাণে মিথেন গ্যাস উৎপন্ন হয়। কোভিড মহামারির সময় স্যাটেলাইটের ছবি বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, পৃথিবীতে সবচেয়ে বেশি মিথেন গ্যাস উৎপন্ন হয় এই ল্যান্ডফিল থেকে। শুধু মিথেন গ্যাস চিহ্নিত হলেও এই ল্যান্ডফিলে আর কী কী গ্যাস উৎপন্ন হয় তা চিহ্নিত করার বা পরীক্ষার কোনো উদ্যোগ এখনো নেওয়া হয়নি। এখান থেকে যে ধোঁয়া উৎপন্ন হচ্ছে সেটি ঢাকার বায়ু আরও দূষিত করছে। প্রতি বছর বায়ুদূষণে ঢাকা বিশ্বে পৃথিবীর ১-৪ এর ভিতরে থাকে—এর অন্যতম কারণ এই ল্যান্ডফিলের ধোঁয়া।’
এই জনস্বাস্থ্যবিদ আরও বলেন, ‘বায়ুদূষণের কারণে ঢাকার শিশু-কিশোরদের মধ্যে ৬০-৬৫ ভাগ কোনো না কোনোভাবে অ্যালার্জি ও শ্বাসের সমস্যায় ভুগছে। নারী-পুরুষের বন্ধ্যাত্ব বাড়ছে, হৃদরোগ বাড়ছে। পৃথিবীতে যত মানুষ হার্টঅ্যাটাকে আক্রান্ত হয় তার মধ্যে ২৫ শতাংশ হচ্ছে বায়ুদূষণের কারণে। ঢাকায় এর প্রবণতা বাড়ছে। অ্যাজমা, হাঁপানির পাশাপাশি ফুসফুস, কিডনি ও লিভারের রোগ বাড়ছে; এতে সরাসরি ও পরোক্ষ বায়ুদূষণের প্রভাব আছে।’
এ পরিস্থিতি থেকে উত্তরণের জন্য নগরপরিকল্পনাবিদ ও জনস্বাস্থ্যবিদদের একসঙ্গে কাজ করতে হবে বলে মনে করেন ডা. লেনিন চৌধুরী।
ল্যান্ডফিলে নেই অগ্নিনির্বাপন ব্যবস্থা
ডিএসসিসির তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী ও মাতুয়াইল স্যানিটারি ল্যান্ডফিল সম্প্রসারণসহ ভূমি উন্নয়ন প্রকল্পের পরিচালক ড. মোহাম্মদ সফিউল্লাহ সিদ্দিক ভুঁইয়া এশিয়া পোস্টকে বলেন, ‘মাতুয়াইল ল্যান্ডফিলটি অনেক পুরোনো। এর পুরোনো লেন বা বিভিন্ন পকেট জায়গায় মিথেন গ্যাস জমা হয়ে আছে। এখানে কখনো যদি কোনো আগুনের সোর্স চলে আসে তখন অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটে। গত ২২ ফেব্রুয়ারি সেখানে অগ্নিকাণ্ডের সূত্রপাত হয়। আমরা ফায়ার সার্ভিস ও করপোরেশন যৌথভাবে পানি ছিটিয়ে আগুন নিয়ন্ত্রণে এনেছি।’
কিন্তু আগুন নিয়ন্ত্রণে আনতে কেন এত সময় লাগছে সে বিষয়ে খোঁজ নিতে গিয়ে জানা যায়, মাতুয়াইল ল্যান্ডফিলে কোনো স্থায়ী অগ্নিনির্বাপন ব্যবস্থা নেই। ৯ বছর আগে ২০১৯ সালে ৭২৫ কোটি টাকার প্রকল্পটি সংশোধন করে ১ হাজার ২৫০ কোটি টাকা ব্যয়ে ল্যান্ডফিলটির আধুনিকায়ন ও সম্প্রসারণের উদ্যোগ নেওয়া হলেও জমি অধিগ্রহণ ছাড়া আর কোনো কাজ সম্পন্ন হয়নি। মাতুয়াইল স্যানিটারি ল্যান্ডফিল সম্প্রসারণসহ ভূমি উন্নয়ন প্রকল্পটির ১ম পর্যায়ের মেয়াদ বৃদ্ধির এবং ২য় পর্যায়ের আরেকটি প্রকল্প অনুমোদনের জন্য এরই মধ্যে মন্ত্রণালয়ে প্রস্তাব পাঠিয়েছে ডিএসসিসি। সেটি এখনো অনুমোদন পায়নি।
এ প্রসঙ্গে প্রকল্প পরিচালক ড. মোহাম্মদ সফিউল্লাহ সিদ্দিক ভুঁইয়া বলেন, ‘ঢাকার এই ল্যান্ডফিলটিতে কখনই স্থায়ী অগ্নিনির্বাপন ব্যবস্থা ছিল না। তবে নতুন করে ল্যান্ডফিল এরিয়ায় ফায়ার হাইড্রেট সিস্টেম স্থাপনের কাজ শুরু হয়েছে। এর মধ্যেই ফায়ার সার্ভিস সেখানে একটি জরিপও সম্পন্ন করেছে। ল্যান্ডফিল এলাকায় ৪০টি পয়েন্টে ফায়ার হাইড্রেন্ড পয়েন্ট থাকবে। এতে করে কোথাও আগুন লাগলে দ্রুতই নিয়ন্ত্রণ করা যাবে।’
তিনি আরও জানান, ২০১৭ সালে ল্যান্ডফিল সম্প্রসারণ প্রকল্পটি শুরু হলেও এর জন্য ৮১ একর জমি অধিগ্রহণ প্রক্রিয়াটি চলে ২০২২ সাল পর্যন্ত। প্রথমে প্রকল্পটি ছিল ৭৫০ কোটি টাকার, পরবর্তীতে সেটি ১ হাজার ২৫০ কোটিতে এসে দাঁড়ায়। এর মধ্যে ১ হাজার ২০০ কোটি টাকা খরচ হয়েছে জমি অধিগ্রহণে। এ কাজ সম্পন্ন করেছে জেলা প্রশাসন। ২০২২ সালে সিটি করপোরেশন জায়গা বুঝে পাওয়ার পর ভারী যন্ত্রপাতি কেনাসহ কিছু কাজ হয়েছে। এরপর পিপিপি প্রজেক্টের মাধ্যমে বর্জ্য রিসাইক্লিং প্রক্রিয়া শুরু হবে। ৩০ একর জায়গায় বর্জ্য রিসাইক্লিংয়ের কাজ চলবে। এ ব্যাপারে দক্ষিণ কোরিয়ার একটি কোম্পানির সঙ্গেও এমওইউ চুক্তি হয়েছে।
সরকারের ব্যর্থতায় ভুগছে সাধারণ মানুষ, মন্তব্য নগর পরিকল্পনাবিদের
মাতুয়াইল ল্যান্ডফিলের ব্যবস্থাপনা নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন নগর পরিকল্পনাবিদরা। তাদের মতে, সরকার সঠিকভাবে বর্জ্য ব্যবস্থাপনা করতে পারছে না; এর খেসারত দিতে হচ্ছে সাধারণ মানুষকে।
নগর পরিকল্পনাবিদ ড. আদিল মুহাম্মদ খান এশিয়া পোস্টকে বলেন, ‘সরকার বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় ফেল করার কারণে সাধারণ মানুষ এখন ভুগছে। মানুষ ল্যান্ডফিলের আগুনের ধোঁয়ায় নিঃশ্বাস নিতে পারছে না। কিন্তু এ বর্জ্যের মধু খাওয়ার জন্য তো রাজনৈতিক নেতাকর্মীরা, কাউন্সিলররা, সিটি করপোরেশনের কর্মকর্তারা কাড়াকাড়ি করেন। এ বর্জ্য দিয়েই তো সবার পকেট ভরে। কিন্তু জনগণকে কেন সেবা দেওয়া হচ্ছে না, এটা আমাদের প্রশ্ন। সঠিকভাবে যদি বর্জ্য ব্যবস্থাপনা করা যেত, যদি দুর্নীতি-লুটপাট না হতো—তাহলে কিন্তু আমাদের বর্জ্য সম্পদে রূপান্তর করা যেত অনেক আগেই। নতুন সরকার এসেছে। আশা করব, তারা জনস্বাস্থ্য বিবেচনায় বর্জ্য ব্যবস্থাপনার প্রতি বিশেষ নজর দেবে।’




