Advertisement

বাংলাদেশের দুধের ৪১ নমুনার সবকটিতেই মিলল মাইক্রোপ্লাস্টিক

এশিয়া পোস্ট নিউজ
বাংলাদেশের দুধের ৪১ নমুনার সবকটিতেই মিলল মাইক্রোপ্লাস্টিক
গবেষকরা দুধের প্রতিটি নমুনায় প্লাস্টিক কণা খুঁজে পেয়েছে। ছবি: সংগৃহীত

বাংলাদেশের বাজারে পাওয়া কাঁচা দুধ, বিভিন্ন ব্র্যান্ডের প্যাকেটজাত দুধ ও দুগ্ধজাত পণ্যে ক্ষুদ্র প্লাস্টিক কণা বা মাইক্রোপ্লাস্টিকের উপস্থিতি পেয়েছেন গবেষকেরা। পরীক্ষা করা ৪১টি নমুনার প্রতিটিতেই মাইক্রোপ্লাস্টিক শনাক্ত হয়েছে। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি কণা পাওয়া গেছে বিভিন্ন ব্র্যান্ডের তরল ও গুঁড়া দুধে।

যশোর বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের পুষ্টি ও খাদ্যপ্রযুক্তি বিভাগের একদল গবেষকের গবেষণায় এসব তথ্য উঠে এসেছে। গবেষকেরা বলেছেন, দুধ গ্রহণের ধরন এবং শরীরের ওজন বিবেচনায় প্রাপ্তবয়স্কদের তুলনায় শিশুদের মাইক্রোপ্লাস্টিক গ্রহণের সম্ভাব্য হার বেশি।

গবেষণাটির শিরোনাম ‘মাইক্রোপ্লাস্টিকস কনটামিনেশন অব মিল্ক অ্যান্ড মিল্ক প্রোডাক্টস ইন বাংলাদেশ: ক্যারেক্টারাইজেশন, ডায়েটারি এক্সপোজার অ্যান্ড রিস্ক অ্যাসেসমেন্ট’। গবেষকদের দাবি, বাংলাদেশের দুধ ও দুগ্ধজাত পণ্যে মাইক্রোপ্লাস্টিক দূষণ, খাদ্যের মাধ্যমে মানুষের শরীরে প্রবেশের সম্ভাবনা এবং পলিমারভিত্তিক ঝুঁকি নিয়ে এটিই প্রথম বিস্তৃত গবেষণা।

গবেষণার প্রধান গবেষক ছিলেন সানাউল্লাহ মাজুমদার। গবেষক দলে আরও ছিলেন রেহেনুমা তারান্নুম, মো. মোশিউজ্জামান আদনান, তানজুম কবির খুকু, মো. রাসেল আলী, শাহুদা ইসলাম সোয়া, মো. আবদুর রাকিব, আলম তাজ আরা অর্থী, মো. মামুন ইসলাম ও মো. ওমর ফারুক।

বাংলাদেশ বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের ২০২৩-২৪ অর্থবছরের গবেষণা অনুদানের অর্থায়নে গবেষণাটি পরিচালিত হয়েছে।

সব নমুনাতেই প্লাস্টিক কণা

গবেষকেরা মোট ৪১টি নমুনা পরীক্ষা করেন। এর মধ্যে কাঁচা দুধের নমুনা ছিল ১৭টি, বিভিন্ন ব্র্যান্ডের তরল ও গুঁড়া দুধের নমুনা ১২টি এবং অন্যান্য দুগ্ধজাত পণ্যের নমুনা ১২টি।

কাঁচা দুধের নমুনাগুলো ঢাকা, যশোর, ঝিনাইদহ, মেহেরপুর, রাজশাহী, রংপুর ও চট্টগ্রামসহ দেশের বিভিন্ন এলাকা থেকে সংগ্রহ করা হয়। ব্র্যান্ডের দুধ ও দুগ্ধজাত পণ্য নেওয়া হয় বাজার ও সুপারশপ থেকে।

পরীক্ষাগারে নমুনা থেকে মাইক্রোপ্লাস্টিক কণা আলাদা করার পর মাইক্রোস্কোপ এবং ফোরিয়ার ট্রান্সফর্ম ইনফ্রারেড স্পেকট্রোস্কোপি বা এফটিআইআর প্রযুক্তির মাধ্যমে সেগুলোর রাসায়নিক গঠন ও প্লাস্টিকের ধরন শনাক্ত করা হয়।

ব্র্যান্ডের দুধে কণা সবচেয়ে বেশি

গবেষণায় প্রতি ১০০ মিলিলিটার ব্র্যান্ডের দুধে গড়ে ১৫৬ দশমিক ০৬টি মাইক্রোপ্লাস্টিক কণা পাওয়া গেছে। কাঁচা দুধে প্রতি ১০০ মিলিলিটারে গড়ে ৯৩ দশমিক ৩৯টি এবং দুগ্ধজাত পণ্যে ৭০ দশমিক ৮০টি কণা পাওয়া যায়।

গবেষকদের ধারণা, দুধ সংগ্রহ, কারখানায় পরিবহন, প্রক্রিয়াজাতকরণ, সংরক্ষণ ও প্যাকেটজাত করার বিভিন্ন পর্যায়ে প্লাস্টিকের সংস্পর্শের কারণে ব্র্যান্ডের দুধে কণার সংখ্যা বেড়ে থাকতে পারে।

প্লাস্টিকের প্যাকেট ও বোতল ছাড়াও উৎপাদনের কাজে ব্যবহৃত পাইপ, ফিল্টার, যন্ত্রপাতি, গ্লাভস, কর্মীদের পোশাক এবং কারখানার বাতাস থেকে ক্ষুদ্র কণা দুধে প্রবেশের সম্ভাবনা রয়েছে বলে গবেষণায় উল্লেখ করা হয়েছে। তবে কোন উৎস থেকে কত পরিমাণ কণা এসেছে, তা এ গবেষণায় আলাদাভাবে নিশ্চিত করা হয়নি।

আঁশের মতো কণাই বেশি

দুধ ও দুগ্ধজাত পণ্যে পাওয়া মাইক্রোপ্লাস্টিকের অধিকাংশ ছিল স্বচ্ছ, আঁশের মতো এবং আকারে ২৫০ মাইক্রোমিটারের কম।

কাঁচা দুধে পাওয়া কণার ৭৭ দশমিক ৪৮ শতাংশ ছিল আঁশ আকৃতির। ব্র্যান্ডের দুধে এ হার ছিল ৮২ দশমিক ৮৩ শতাংশ। গবেষকদের মতে, পোশাকের কৃত্রিম তন্তু, প্লাস্টিকের প্যাকেট, পাইপ, গ্লাভস এবং প্রক্রিয়াজাতকরণের পরিবেশ থেকে এ ধরনের কণা আসতে পারে।

গবেষণায় পিটিএফই বা টেফলন, পিইটি, নাইলন-৬, পলিইথিলিন, পিডিএমএস, পিপিএস, পিভিসি, পলিপ্রোপিলিন ও পলিস্টাইরিনসহ বিভিন্ন ধরনের প্লাস্টিক পলিমার শনাক্ত হয়েছে।

কাঁচা দুধে সবচেয়ে বেশি পাওয়া গেছে পিটিএফই ও পিইটি। ব্র্যান্ডের দুধে পিটিএফইর পাশাপাশি পিডিএমএস ও পিইটির উপস্থিতি বেশি ছিল। দুগ্ধজাত পণ্যে তুলনামূলক বেশি পাওয়া গেছে পিইটি, নাইলন-৬ ও পিপিএস।

শিশুদের শরীরে ঢুকছে বেশি মাইক্রোপ্লাস্টিক

গবেষকেরা বয়স, শরীরের ওজন এবং দুধ গ্রহণের পরিমাণ বিবেচনা করে খাদ্যের মাধ্যমে মাইক্রোপ্লাস্টিক শরীরে প্রবেশের সম্ভাব্য হার হিসাব করেছেন। এতে দেখা যায়, প্রাপ্তবয়স্কদের তুলনায় শিশুদের শরীরের ওজন কম এবং দুধের ওপর নির্ভরতা বেশি হওয়ায় তাদের শরীরে মাইক্রোপ্লাস্টিক ঢুঁকছে বেশি।

ছবি : সংগৃহীত
ছবি : সংগৃহীত

বিশেষ করে ৪ থেকে ১০ বছর বয়সী ব্র্যান্ডের দুধ পানকারী শিশুদের ক্ষেত্রে সম্ভাব্য গ্রহণের হার সর্বোচ্চ পাওয়া গেছে। গবেষণায় দীর্ঘমেয়াদি গ্রহণের একটি আনুমানিক হিসাবও দেওয়া হয়েছে।

কাঁচা দুধের পলিমারভিত্তিক ঝুঁকি বেশি

মাইক্রোপ্লাস্টিক দূষণের মাত্রা মূল্যায়নে গবেষকেরা মাইক্রোপ্লাস্টিক দূষণ ফ্যাক্টর, দূষণ বোঝা সূচক এবং পলিমারভিত্তিক ঝুঁকি সূচক ব্যবহার করেন।

এসব সূচকের ফলাফলে কাঁচা দুধকে উচ্চ, ব্র্যান্ডের দুধকে উল্লেখযোগ্য এবং দুগ্ধজাত পণ্যকে মাঝারি ঝুঁকি শ্রেণিতে রাখা হয়েছে। কাঁচা দুধে কণার গড় সংখ্যা ব্র্যান্ডের দুধের চেয়ে কম হলেও সেখানে পাওয়া কিছু পলিমারের রাসায়নিক বৈশিষ্ট্যের কারণে পলিমারভিত্তিক ঝুঁকি সূচক বেশি হয়েছে।

এ সূচকগুলো দূষণের মাত্রা ও পলিমারের সম্ভাব্য ক্ষতিকর বৈশিষ্ট্য তুলনা করতে ব্যবহার করা হয়েছে। এগুলো মানুষের নির্দিষ্ট রোগে আক্রান্ত হওয়ার সরাসরি পরিমাপ নয়।

গবেষকেরা বলেছেন, বাংলাদেশের দুগ্ধ সরবরাহ ব্যবস্থায় মাইক্রোপ্লাস্টিক দূষণ একটি উদীয়মান খাদ্যনিরাপত্তা সমস্যা। দুধ উৎপাদন ও প্রক্রিয়াজাতকরণের বিভিন্ন ধাপে প্লাস্টিকের ব্যবহার কমানো, উন্নত ফিল্টার ব্যবস্থা চালু, কম প্লাস্টিক নির্গমনকারী যন্ত্রপাতি ব্যবহার এবং নিয়মিত পরীক্ষার ব্যবস্থা করার সুপারিশ করেছেন তারা।