এডিপি ও উপজেলা বরাদ্দ: দুই খাতেই শীর্ষে কুমিল্লা

বাংলাদেশের মাঠপর্যায়ের উন্নয়ন বরাদ্দে এক নতুন রেকর্ড তৈরি হয়েছে। সরকারের সর্বশেষ প্রকাশিত দুটি ভিন্ন খাতের চূড়ান্ত হিসাব বিশ্লেষণে দেখা গেছে, প্রকল্পভিত্তিক কেন্দ্রীয় বরাদ্দ অর্থাৎ বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি (এডিপি) এবং প্রান্তিক প্রশাসনভিত্তিক স্থানীয় বরাদ্দ তথা উপজেলা তহবিল—উভয় খাতেই দেশের বাকি ৬৩টি জেলাকে পেছনে ফেলে এককভাবে শীর্ষস্থান দখল করেছে কুমিল্লা।
২০২৫-২৬ অর্থবছরের বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচির (এডিপি) আওতায় গত চার মাসে (১৮ ফেব্রুয়ারি থেকে ১৮ জুন ২০২৬) দেশের ৬৪ জেলায় অবকাঠামো ও গ্রামীণ উন্নয়নে মোট ৬ হাজার ৮১৪ দশমিক ৫৭ কোটি টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। এই খাতে জাতীয় পর্যায়ে সর্বোচ্চ ৩৯০ দশমিক ৩৬ কোটি টাকা বরাদ্দ পেয়ে শীর্ষে রয়েছে কুমিল্লা।
দ্বিতীয় স্থানে থাকা নরসিংদী পেয়েছে ২৬৩ দশমিক ৩০ কোটি টাকা। অর্থাৎ, দ্বিতীয় শীর্ষ জেলার চেয়েও কুমিল্লা প্রায় ১২৭ কোটি টাকা এগিয়ে রয়েছে। তালিকার পরবর্তী স্থানগুলোতে রয়েছে যথাক্রমে বাগেরহাট, ঢাকা ও চট্টগ্রাম জেলা।
একই সময়ে স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের উপজেলা শাখা কর্তৃক প্রকাশিত ২১ জুন ২০২৬ পর্যন্ত হালনাগাদকৃত তথ্য অনুযায়ী, দেশের উপজেলাগুলোর সাধারণ প্রশাসনিক ও গ্রামীণ উন্নয়নে মোট ৩৯৪ দশমিক ৩ কোটি টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। এখানেও শীর্ষ দুই স্থান দেশের বড় দুই বাণিজ্য ও প্রশাসনিক কেন্দ্রের কাছে গেছে।
একক জেলা হিসেবে সর্বোচ্চ ১৩ দশমিক ২২ কোটি টাকা বরাদ্দ পেয়ে প্রথম স্থানে রয়েছে কুমিল্লা জেলা। দ্বিতীয় স্থানে রয়েছে বাণিজ্যিক রাজধানী চট্টগ্রাম, যেখানে বরাদ্দের পরিমাণ ১২ দশমিক ৮৪ কোটি টাকা।
এই খাতে শীর্ষ ১০-এর বাকি জেলাগুলো হলো যথাক্রমে ময়মনসিংহ, সিলেট, দিনাজপুর, বগুড়া, কিশোরগঞ্জ, টাঙ্গাইল, সুনামগঞ্জ ও নওগাঁ। বগুড়া ৯ দশমিক ৮৫ কোটি টাকা নিয়ে রাজশাহী বিভাগে প্রথম হলেও জাতীয়ভাবে ষষ্ঠ স্থানে রয়েছে।
বিভাগভিত্তিক উপজেলা বরাদ্দের দিকে তাকালে দেখা যায়, ১১টি জেলা নিয়ে গঠিত চট্টগ্রাম বিভাগ সর্বোচ্চ ৮৯ দশমিক ৭৪ কোটি টাকা পেয়ে শীর্ষস্থান ধরে রেখেছে। দ্বিতীয় অবস্থানে থাকা ঢাকা বিভাগের ১৩টি জেলা পেয়েছে ৭২ দশমিক ৪৫ কোটি টাকা। এর বিপরীতে মাত্র ৪টি জেলা নিয়ে গঠিত ময়মনসিংহ বিভাগ মোট ২৮ দশমিক ৯৬ কোটি টাকা বরাদ্দ পেয়ে তালিকার একেবারে তলানিতে অবস্থান করছে।
বাকি বিভাগগুলোর মধ্যে সিলেট পেয়েছে ৩২ দশমিক ৬৯ কোটি টাকা, বরিশাল ৩২ দশমিক ৯৮ কোটি টাকা, খুলনা ৪৭ দশমিক ২৮ কোটি টাকা, রংপুর ৫১ দশমিক ৯৫ কোটি টাকা এবং রাজশাহী বিভাগ পেয়েছে ৫৩ দশমিক ৭১ কোটি টাকা।
উপজেলা বরাদ্দে সবচেয়ে কম পেয়েছে মেহেরপুর, মাত্র ২ দশমিক ৩০ কোটি টাকা। তালিকার নিচের দিকে থাকা জেলাগুলো হলো যথাক্রমে নড়াইল, ঝালকাঠি, মাগুরা, চুয়াডাঙ্গা, জয়পুরহাট, রাজবাড়ী, পঞ্চগড়, মাদারীপুর ও লালমনিরহাট।
উপাত্তের এই গভীর বিশ্লেষণে দেশের উন্নয়ন বরাদ্দের ক্ষেত্রে একটি বড় অর্থনৈতিক বৈষম্য ও কেন্দ্রীকরণের চিত্র ফুটে উঠেছে। দেখা গেছে, মোট এডিপি বরাদ্দের প্রায় ৩২ শতাংশ অর্থাৎ ২ হাজার ১৮০ কোটি টাকা চলে গেছে মাত্র ১০টি জেলার পকেটে। আর বাকি ৬৮ শতাংশ অর্থ ভাগাভাগি করতে হয়েছে অন্য ৫৪ জেলায়।
একই বৈষম্য উপজেলা বরাদ্দেও স্পষ্ট। দেশের সর্বোচ্চ বরাদ্দ পাওয়া জেলা কুমিল্লা, সর্বনিম্ন বরাদ্দ পাওয়া মেহেরপুর জেলার তুলনায় প্রায় ৬ গুণ বেশি অর্থ পেয়েছে।
অর্থনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, ভৌগোলিক আয়তন, উপজেলার সংখ্যা যেমন কুমিল্লার ১৭টি উপজেলা এবং জনসংখ্যার ঘনত্বের কারণে বরাদ্দের এই তারতম্য কিছুটা স্বাভাবিক। তবে টেকসই ও সুষম জাতীয় উন্নয়নের স্বার্থে পিরোজপুর কিংবা মেহেরপুরের মতো প্রান্তিক ও পিছিয়ে পড়া জেলাগুলোর জন্যও বিশেষ প্রকল্প গ্রহণ করা প্রয়োজন।





