তুরাগ নদে তিন দিনে চার লাশ/সামাজিক মাধ্যমে তোলপাড়, পুলিশ বলছে অপপ্রচার

নুরুল আমিন হাসান
সামাজিক মাধ্যমে তোলপাড়, পুলিশ বলছে অপপ্রচার
সুমন আহমেদ (বাঁয়ে) ও আরিফ হাসান (ডানে)। ছবি : এশিয়া পোস্ট কোলাজ

রাজধানীর অদূরে তুরাগ নদ থেকে লাশ উদ্ধারকে কেন্দ্র করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপক গুঞ্জন শুরু হয়েছে। কেউ কেউ দাবি করছেন, সেখানে নিষিদ্ধ সংগঠন ছাত্রলীগ ও কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের একাধিক কর্মীর লাশ উদ্ধার করা হয়েছে। যদিও বিষয়টি সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন ও গুজব বলে জানিয়েছে পুলিশ।

Advertisement

পুলিশের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, গত শুক্রবার (২৬ জুন) রাতে আশুলিয়ার তুরাগ নদ থেকে সুমন আহমেদ চৌধুরী নামে কেবল একজনেরই মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছে। অন্যদিকে কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের নেতাকর্মী এবং দলটির প্রতি অনুগত অনলাইন অ্যাক্টিভিস্টরা দাবি করছেন, গত ২২ জুন ঢাকার তুরাগ নদ থেকে তিন থেকে চারজন ছাত্রলীগ কর্মীর অর্ধগলিত লাশ উদ্ধার করা হয়েছে। এর প্রমাণ হিসেবে ৮-৯ জনের নিথর দেহ পড়ে থাকার একটি ভিডিও ফেসবুকে শেয়ার করা হচ্ছে।

তবে অনুসন্ধানে দেখা গেছে, ছড়িয়ে পড়া ভিডিওটির মূল উৎস কোনো বিশ্বস্ত সূত্র এখনও নিশ্চিত করতে পারেনি। ভিডিওর লাশের সংখ্যার সঙ্গে ছড়ানো বিবৃতির কোনো মিল নেই। ফলে, ভিডিওটি ভিন্ন কোনো ঘটনার হওয়ার সম্ভাবনা বেশি এবং ছড়িয়ে পড়া তথ্যটি মিথ্যা হওয়ার প্রবল সম্ভাবনা রয়েছে।

তবে জানা গেছে, তুরাগ নদ থেকে গত তিন দিনে চারজনের মরদেহ উদ্ধার করেছে থানা-পুলিশ ও নৌ পুলিশ। তারা হলেন রাজধানীর তুরাগের রানাভোলা এলাকার রানা আলীর ছেলে সুমন আহমেদ, একই এলাকার আব্দুল হাইয়ের ছেলে আরিফ হাসান, মনিপুরের মোল্লাপাড়া এলাকার কফিল উদ্দিন মোল্লার ছেলে রনি মোল্লা (৩৫) এবং তুরাগের দিয়াবাড়ি এলাকার আব্দুল খালেকের ছেলে মারুফ হাসান (১৪)।

এদের মধ্যে দুজনের নিষিদ্ধ সংগঠন ছাত্রলীগের রাজনীতির সঙ্গে জড়িত থাকার বিষয়ে গুঞ্জন উঠেছে। তারা হলেন আরিফ হাসান ও সুমন আহমেদ। দাবি করা হয়েছে, তারা তুরাগ থানা ছাত্রলীগের কর্মী ছিলেন। পরিবারের কেউ বিষয়টি নিয়ে মন্তব্য না করলেও সুমনের ফেসবুক আইডি পর্যালোচনা করে দেখা গেছে, আওয়ামী লীগের (কার্যক্রম নিষিদ্ধ) প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলক্ষে শোভাযাত্রার ভিডিও ছাড়াও বিভিন্ন সময় দলীয় কার্যক্রমের ভিডিও আপলোড করা হয়েছে। তবে আরিফের ফেসবুক আইডি খুঁজে পাওয়া যায়নি।

এ ছাড়াও ছাত্রলীগের ঢাকা মহানগর উত্তরের দেওয়া এক বিজ্ঞপ্তিতে দুজনকে ছাত্রলীগের কর্মী বলে দাবি করা হয়েছে। উত্তরের সভাপতি রিয়াজ মাহমুদ ও সাধারণ সম্পাদক সাগর আহমেদ শামীম স্বাক্ষরিত শোক ও প্রতিবাদ বার্তায় বলা হয়, গত ২২ জুন ঢাকা-১৮ আসনে আওয়ামী লীগের মিছিল থেকে আশুলিয়া থানা বিএনপি ও এর অঙ্গসংগঠনের সন্ত্রাসীরা তুরাগ থানা ছাত্রলীগের কর্মী আরিফ, ৫৩ নম্বর ওয়ার্ড ছাত্রলীগের কর্মী সুমন আহমেদসহ মোট সাতজনকে অপহরণ করে অমানবিক নির্যাতন চালায়। পরবর্তীতে পুলিশের উপস্থিতিতেই আরিফ, সুমন ও যুবলীগ কর্মী বিপ্লবকে হত্যা করে তুরাগ নদীতে ফেলে দেওয়া হয়। গত ২৪ জুন আরিফ ও বিপ্লবের মরদেহ এবং ২৬ জুন সুমনের মরদেহ নদীতে ভেসে ওঠে। এখনো চারজনের কোনো খোঁজ পাওয়া যায়নি।

যদিও তুরাগ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, ‘আমাদের এলাকায় এমন কোনো ঘটনাই ঘটেনি।’

খোঁজ নিয়ে জানা যায়, গত মঙ্গলবার (২৩ জুন) কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের ৭৭তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলক্ষে আগের দিন (২২ জুন) আশুলিয়া ও তুরাগ থানা এলাকায় ঝটিকা মিছিলের চেষ্টা করেন আওয়ামী লীগ ও এর অঙ্গসংগঠনের নেতাকর্মীরা। পরবর্তীতে খবর পেয়ে পুলিশ অভিযান চালিয়ে সাতজনকে গ্রেপ্তার করে। ওই সময় গ্রেপ্তার এড়াতে আওয়ামী লীগ, যুবলীগ ও ছাত্রলীগের নেতাকর্মীরা পুলিশের উপস্থিতি টের পেয়ে তুরাগ নদে ঝাঁপ দেন। এ ঘটনার পর তুরাগ নদ থেকে গত বুধবার (২৪ জুন) ভেসে আসে আরিফ এবং বৃহস্পতিবার (২৫ জুন) দিবাগত রাতে সুমনের ভাসমান মরদেহ পাওয়া যায়।

নিহত সুমনের বাবা রানা আলীর কাছে মৃত্যুর বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘আমার ছেলে মারা গেছে, আমার তো জ্বলে না। আপনাদের এত জ্বলে কেন? আপনাদেরকে আমি এ বিষয়ে কিছু বলছি? আপনারা আবার ফোন দিলে আমি সিম ভেঙে ফেলব।’

কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের মিছিলে আরিফ হাসান (নীল চিহ্নিত)। ছবি : সংগৃহীত
কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের মিছিলে আরিফ হাসান (নীল চিহ্নিত)। ছবি : সংগৃহীত

আরিফের চাচা দিয়াবাড়ি এলাকার বাসিন্দা জামাল মিয়া বলেন, ‘তুরাগ নদ থেকে ভাসমান অবস্থায় গত বুধবার আরিফের মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ। পরে ময়নাতদন্তের জন্য হাসপাতালের মর্গে পাঠানো হয়। তার মরদেহ ময়নাতদন্তের পর রংপুরে নিয়ে গিয়ে দাফন করা হয়েছে।’

সুমনের মরদেহ উদ্ধারের বিষয়ে আশুলিয়া থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) তরিকুল ইসলাম বলেন, ‘স্থানীয় লোকজনের দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে গত বৃহস্পতিবার (২৫ জুন) দিবাগত রাতে আশুলিয়া বাজারসংলগ্ন এলাকা থেকে সুমন (১৭) নামের এক যুবকের মরদেহ উদ্ধার করা হয়। পরে তার সঙ্গে থাকা মোবাইলের সূত্র ধরে পরিবারকে খবর দেওয়া হয়। পরিবার এসে লাশ শনাক্ত করে। পরবর্তীতে সুমনের মৃত্যুর সঠিক কারণ নির্ণয়ের জন্য শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের মর্গে পাঠানো হয়। ময়নাতদন্ত শেষে মরদেহটি পরিবারের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে। এ ঘটনায় নিহতের বড় ভাই সালাহউদ্দিন বাদী হয়ে একটি অপমৃত্যু মামলা করেছেন। মামলাটি তদন্তাধীন রয়েছে।’

পরিবারের বরাত দিয়ে ওসি তরিকুল বলেন, সুমন স্থানীয় কাঁচাবাজারের আড়তে কাজ করত। গত ২২ জুন স্থানীয় কয়েকজন পিকনিকের কথা বলে ট্রলারে নিয়ে যায়। সুমন সাঁতার জানত না। সে ট্রলার থেকে পড়ে নদীতে তলিয়ে যায়। এরপর থেকেই সে নিখোঁজ ছিল।

এক প্রশ্নের জবাবে ওসি তরিকুল বলেন, সুমনের মরদেহটি অর্ধগলিত অবস্থায় পাওয়া গেছে। মরদেহে কোনো আঘাতের চিহ্ন পাওয়া যায়নি। এ ছাড়া অন্য কোনো লাশ উদ্ধারের ঘটনা ঘটেনি। গত ২২ জুনের অভিযান ও গ্রেপ্তারের বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, আশুলিয়া বাজার এলাকায় অভিযান চালিয়ে কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগ ও এর অঙ্গসংগঠনের সাতজনকে গ্রেপ্তার করা হয়। সেখানে সুমন উপস্থিত ছিল কিনা, এমন কোনো তথ্য আমাদের জানা নেই।

ঢাকা মহানগর উত্তর ছাত্রলীগের প্রেস বিজ্ঞপ্তি। ছবি : সংগৃহীত
ঢাকা মহানগর উত্তর ছাত্রলীগের প্রেস বিজ্ঞপ্তি। ছবি : সংগৃহীত

আরিফের মরদেহ উদ্ধারের বিষয়ে আমিনবাজার নৌ পুলিশ ফাঁড়ির ইনচার্জ উপপরিদর্শক (এসআই) হুমায়ুন কবীর বলেন, আরিফ তার বন্ধুদের সঙ্গে নৌকা ভ্রমণে গিয়েছিলেন। পরে সে নদীতে পড়ে নিখোঁজ হয়ে যায়। তারপর আমরা তার লাশ উদ্ধার করে তার পকেটে থাকা আইডি কার্ড ও মোবাইলের সূত্র ধরে পরিচয় নিশ্চিত হই এবং পরিবারকে সংবাদ দিই। পরবর্তীতে তার মরদেহ ময়নাতদন্তের জন্য হাসপাতালের মর্গে পাঠানো হয়েছে। আরিফের মৃত্যুর ঘটনায় ডিএমপির দারুস সালাম থানায় একটি অপমৃত্যু মামলা হয়েছে।

অপরদিকে ডিএমপির দারুস সালাম থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) দুলাল হোসেন বলেন, নদী থেকে আরিফ নামের এক যুবকের মরদেহ উদ্ধারের ঘটনায় তার চাচা মো. আরশাদুল বাদী হয়ে একটি অপমৃত্যু মামলা করেছেন।

কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের মিছিলে সুমন আহমেদ (লাল চিহ্নিত)। ছবি : সংগৃহীত
কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের মিছিলে সুমন আহমেদ (লাল চিহ্নিত)। ছবি : সংগৃহীত

আরিফ ও সুমন ছাড়াও আরও দুজনের লাশ উদ্ধার করা হয়েছে। বুধবার (২৪ জুন) দুপুরে রনি এবং শনিবার (২৭ জুন) সন্ধ্যায় মারুফ হাসানের লাশ উদ্ধার করে আমিনবাজার নৌ পুলিশ।

রনির লাশ উদ্ধার প্রসঙ্গে এসআই হুমায়ুন কবীর বলেন, দিয়াবাড়ি ঘাটে গোসল করতে গিয়ে ওই দিন দুপুরেই রনি নামের ওই যুবক নদীতে তলিয়ে যায়। পরবর্তীতে ঘণ্টাখানেক চেষ্টা চালিয়ে তার মরদেহ উদ্ধার করা হয়। সাভার থানায় একটি অপমৃত্যু মামলা করেছেন তার বাবা।

রনির বাবা কফিল উদ্দিন মোল্লা জানান, রনি কোনো রাজনীতি করতেন না। দিয়াবাড়ির একটি হোটেলে কাজ করতেন। কয়েকজন একসঙ্গে গোসল করতে গিয়ে রনি পানিতে ডুবে মারা যায়।

মারুফ হাসানের মরদেহ উদ্ধারের বিষয়ে নৌ পুলিশের এসআই হুমায়ুন কবীর বলেন, তুরাগ নদের দিয়াবাড়ি ঘাটে মা ও অন্যান্য স্বজনদের সঙ্গে শনিবার বিকেল সাড়ে ৩টায় গোসল করছিল মারুফ হাসান। একপর্যায়ে সে স্রোতের কারণে পানিতে তলিয়ে হারিয়ে যায়।

তিনি আরও বলেন, খবর পেয়ে আমরা দীর্ঘক্ষণ খোঁজাখুঁজির পর বছিলা ব্রিজসংলগ্ন এলাকা থেকে সন্ধ্যায় মরদেহটি উদ্ধার করি। পরবর্তীতে পরিবারের আবেদনের ভিত্তিতে স্বজনদের কাছে মরদেহটি হস্তান্তর করা হয়েছে।

এদিকে বিষয়টিকে কেন্দ্র করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে পোস্ট দিয়েছেন ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ছেলে সজীব ওয়াজেদ জয়। তিনি অভিযোগ করেছেন, ‘তুরাগের ঘটনা’ ধামাচাপা দেওয়ার চেষ্টা চলছে। জয় বলেন, যে তিনজন কর্মীর লাশ পাওয়া গেছে তাদের পরিবারের সঙ্গে থানা থেকে যোগাযোগ করে পরিবারকে দিয়ে একটি অপমৃত্যুর মামলা করানোর জন্য চেষ্টা চলছে।

সজীব ওয়াজেদ জয় ছাড়াও এ ঘটনায় পোস্ট দিয়েছেন কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের একাধিক নেতাকর্মী। এমন পরিস্থিতিতে বিষয়টি ভিত্তিহীন দাবি করে পুলিশ সদরদপ্তর থেকে বিজ্ঞপ্তি পাঠানো হয়েছে। যেখানে বলা হয়েছে, ‘তুরাগ নদীতে ভাসছে আওয়ামী লীগ-ছাত্রলীগের সাত নেতাকর্মীর লাশ’ শিরোনামে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভিত্তিহীন তথ্য প্রচার করে জনমনে বিভ্রান্তি ছড়ানোর অপচেষ্টা চালানো হচ্ছে। প্রকৃতপক্ষে, এ ধরনের কোনো ঘটনার খবর পাওয়া যায়নি। এ ধরনের মিথ্যা অপপ্রচারে বিভ্রান্ত না হওয়ার জন্য সকলের প্রতি বাংলাদেশ পুলিশ অনুরোধ জানাচ্ছে।

বিজ্ঞপ্তিতে আরও বলা হয়, একটি মহল এ ধরনের বিভ্রান্তি ছড়িয়ে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর মনোবল নষ্ট করার অপচেষ্টায় লিপ্ত রয়েছে। যারা এ ধরনের বিভ্রান্তি ছড়াচ্ছে, পুলিশ তাদের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা গ্রহণে তৎপর রয়েছে। কেউ এ ধরনের অপপ্রচারে জড়িত থাকার প্রমাণ পাওয়া গেলে তার বিরুদ্ধে যথাযথ আইনি ব্যবস্থা গ্রহণে পুলিশ প্রতিশ্রুতিবদ্ধ।