ব্র্যাক-বিআইজিডির গবেষণা

রাজনীতিতে অংশ নেওয়ায় সহিংসতার শিকার হন নারীরা

এশিয়া পোস্ট নিউজ
রাজনীতিতে অংশ নেওয়ায় সহিংসতার শিকার হন নারীরা
বিআইজিডি আয়োজিত অনুষ্ঠানে বক্তব্য রাখেন আমন্ত্রিত অতিথিগণ। ছবি: সংগৃহীত

বাংলাদেশের রাজনীতি এবং নির্বাচনের ক্ষেত্রে সর্বস্তরে নারীর প্রতি সহিংসতা, প্রতিবন্ধকতা এবং এর থেকে উত্তরণের নির্দেশনা সামনে রেখে ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের ব্র্যাক ইনস্টিটিউট অব গভর্নেন্স অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট (বিআইজিডি) এবং ইউএন উইমেন যৌথভাবে একটি গবেষণা পরিচালনা করেছে। গবেষণায় পরিসংখ্যানের পাশাপাশি বিভিন্ন প্রেক্ষিত এবং অবস্থানে রাজনীতিতে সক্রিয়ভাবে অংশ নেওয়া ৪৩ জন নারীর অভিজ্ঞতা উঠে এসেছে যে, নির্বাচনের সময়সহ ‍বিবিধ প্রেক্ষিতে রাজনীতিতে অংশ নেওয়া সর্বস্তরের নারীরা বৈষম্য এবং সহিংসতার শিকার হয়েছেন।

Advertisement

গবেষণার ফলাফল ও বিশ্লেষণ উপস্থাপনে বিআইজিডি আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে আমন্ত্রিত অতিথি, গবেষক এবং অংশগ্রহণকারীরা আলোচনার মাধ্যমে বিভিন্ন অভিজ্ঞতা এবং পরামর্শ উপস্থাপন করেছেন। এতে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন সমাজকল্যাণ প্রতিমন্ত্রী ফারজানা শারমিন এমপি। সমাপনী সেশনে প্রধান অতিথি হিসেবে বক্তব্য রাখেন নির্বাচন কমিশনার ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) আবুল ফজল মোঃ সানাউল্লাহ। এছাড়া আলোচনায় অংশ নিয়েছেন রাশেদা বেগম হিরা এমপি, ব্যারিস্টার রুমিন ফারহানা এমপি, সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা রাশেদা কে. চৌধুরী, ডা. মণীষা চক্রবর্তী, রুহিন হোসেন প্রিন্স, সুইজারল্যান্ড দূতাবাসের প্রতিনিধি মিস করিন থেভোজ, ইউএন উইমেনের কান্ট্রি রিপ্রেজেন্টেটিভ, গীতাঞ্জলি সিং, গণমাধ্যম এবং বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধিরা।

রাজনৈতিক ব্যবস্থার জটিলতায় নারী রাজনীতিবিদদের যে কঠিন পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে যেতে হয় সে বিষয়ে কথা বলতে গিয়ে প্রতিমন্ত্রী ফারজানা শারমিন বলেন, ‘প্রতিপক্ষের মূল অভিযোগ ছিল আমার স্বামী ভিন্ন নির্বাচনি এলাকার। দ্বিতীয় অভিযোগ ছিল আমি নিজের এলাকার চেয়ে স্বামীর এলাকাকে প্রাধান্য দেব, অথচ সেই এলাকায় আমি জীবনে কখনও যাইনি। যখন সব অভিযোগ ব্যর্থ হলো, তখন তারা অনলাইনে ও সরাসরি হয়রানিমূলক প্রচারণা শুরু করল, যার জন্য নির্বাচন কমিশন তাদের শাস্তি দিয়েছে।’

তিনি আরও বলেন, ‘আমার নিজের একটি স্বতন্ত্র পরিচয় আছে। একটি সম্মানিত রাজনৈতিক পরিবার থেকে আসার পরেও যদি আমাকে এই ধরনের অনলাইন ও অফলাইন হয়রানির শিকার হতে হয়, তাহলে যেসব নারী আমার মতো সুবিধাজনক অবস্থানে নেই, তারা প্রতিদিন কী পরিস্থিতির মুখোমুখি হচ্ছেন সেটা ভাবলে শিউরে উঠতে হয়।’

আমন্ত্রিত অতিথিদের একাংশ। ছবি: সংগৃহীত
আমন্ত্রিত অতিথিদের একাংশ। ছবি: সংগৃহীত

সমাপনী অধিবেশনের প্রধান অতিথির বক্তব্যে নির্বাচন কমিশনার আবুল ফজল মোঃ সানাউল্লাহ বলেন, ‘সর্বশেষ নির্বাচনে নারীদের অংশগ্রহণ আগের চেয়ে বেড়েছে। যেসব আসনে নারী প্রার্থী ছিলেন না, সেখানেও দলগুলো প্রচারণায় ও ভোটারদের কাছে পৌঁছাতে নারীদের সাহায্য নিয়েছে। তবে শুধু অংশগ্রহণ যথেষ্ট নয়, নারীরা যেন রাজনীতিতে সত্যিকার অর্থে মতামত দিতে পারেন সেটা নিশ্চিত করাই সবচেয়ে জরুরি।’

সংরক্ষিত আসন নিয়ে চলমান বিতর্ক প্রসঙ্গে সংসদ সদস্য রাশেদা বেগম হিরা বলেন, ‘সংরক্ষিত আসন এখনও সরাসরি মানুষের সঙ্গে যোগাযোগ করার এবং তাদের আস্থা অর্জনের একটি সুযোগ দেয়। আমরা দেখেছি পুরুষ ভোটাররা এখন নারী জনপ্রতিনিধিদের সঙ্গে অনেক বেশি ইতিবাচকভাবে যোগাযোগ করছেন, কারণ তারা জানেন সেখানে তাদের কথা শোনা হবে।’

গবেষণায় নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতাকারী নারীদের কাঠামোগত বাধার বিষয়টিও উঠে আসে। নিজের অভিজ্ঞতার কথা তুলে ধরে রুমিন ফারহানা বলেন, স্বাধীন প্রতিষ্ঠানগুলো অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচন নিশ্চিত করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। নিজের স্বাধীন প্রচারণায় নানা বাধার মুখে পড়লেও তিনি সুষ্ঠু নির্বাচন নিশ্চিত করতে নির্বাচন কমিশন ও বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর ভূমিকার প্রশংসা করেন।

পারিবারিক রাজনৈতিক সংশ্লিষ্টতা থাকা নারীদের চ্যালেঞ্জ প্রসঙ্গে গণসংহতি আন্দোলনের রাজনৈতিক পরিষদের সদস্য তাসলিমা আক্তার বলেন, ‘আমার প্রার্থিতা নিয়ে দলের ভেতরে, বাইরে এবং পরিবারেও অনেক প্রশ্নের মুখে পড়তে হয়েছে। আমি মনে করি নারীকে তার স্বামীর পরিচয় থেকে আলাদা, একজন স্বতন্ত্র মানুষ হিসেবে দেখা জরুরি। শ্রমিকদের অধিকারের জন্য এত বছর লড়াই করাটাই আমার যোগ্যতার প্রমাণ হওয়া উচিত ছিল।’

নারীর রাজনীতিতে অংশগ্রহণে সম অধিকারের প্রেক্ষিতে ড. মনীষা চক্রবর্তী বলেন, ‘মানুষের জন্য কাজ করতে চাইলে সমালোচনা সহ্য করার মানসিকতা থাকতে হবে। আমরা চাই নারীরা সমানভাবে লড়াই করুক, কিন্তু দেশের আইন ও অর্থনৈতিক বাস্তবতা নারীদের সমান চোখে দেখে না। আমাদের জীবনের গণ্ডি টেনে দেওয়া হয় আলাদা আইনি মানদণ্ড দিয়ে। এটা অনেকটা পায়ে শিকল পরিয়ে নারীকে সমান প্রতিযোগী হিসেবে দৌড়ে নামতে বলার মতো।’

বিআইজিডির নির্বাহী পরিচালক ড. ইমরান মতিন উদ্বোধনী বক্তব্যে বলেন, ‘নারীর জনজীবনে অংশগ্রহণ, রাজনৈতিক সক্রিয়তা, দলীয় কার্যক্রম এবং দলের ভেতরে সিদ্ধান্ত গ্রহণ ও নেতৃত্বে তাদের ভূমিকা নিয়ে কথা না বললে নারীদের নিয়ে আলোচনা অসম্পূর্ণ থেকে যায়। গবেষণালব্ধ তথ্য-প্রমাণের ভিত্তিতে আলোচনার মধ্য দিয়ে গণতন্ত্রের চর্চাকে টিকিয়ে রাখাই আমাদের প্রধান উদ্দেশ্য।’

ইউএন উইমেনের কান্ট্রি রিপ্রেজেন্টেটিভ গীতাঞ্জলি সিং বলেন, ‘একটি সুষ্ঠু গণতন্ত্রের জন্য নারীর রাজনৈতিক অংশগ্রহণ অপরিহার্য। নারী যখন জনজীবন ও কর্মক্ষেত্র থেকে বাদ পড়ে যায়, তখন গণতন্ত্র দুর্বল হয়ে পড়ে।’

গবেষণাটি জাতিসংঘের নির্বাচনি সহায়তা কার্যক্রমের (ডিআরআইপি/বিএএলএলওটি) আওতায় পরিচালিত হয়েছে। এতে রাজনীতিতে নারীর বিরুদ্ধে সহিংসতাকে চিহ্নিত করা হয়েছে, যা অফলাইন ও অনলাইন উভয়ক্ষেত্রে পরিলক্ষিত হয় এবং নারীর অংশগ্রহণ ও নেতৃত্বে আসার পথে একটি অন্যতম প্রতিবন্ধক হিসেবে কাজ করে। গবেষণার ফলাফল অংশীজনদের সচেতনতা বৃদ্ধিতে এবং দেশের গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় নারী নেতৃত্বকে শক্তিশালী করার লক্ষ্যে গৃহীত পদক্ষেপগুলোকে কার্যকর করতে সহায়ক হবে বলে বিআইজিডি আশাবাদ প্রকাশ করেছে।