প্রতিদিন খেজুর খেলে পুরুষদের শরীরে কী ঘটে

এশিয়া পোস্ট ডেস্ক
প্রতিদিন খেজুর খেলে পুরুষদের শরীরে কী ঘটে
ছবি : সংগৃহীত

খেজুরকে অনেকেই পুরুষদের জন্য বিশেষ উপকারী খাবার হিসেবে মনে করেন। বিশেষ করে যৌন স্বাস্থ্য, শারীরিক শক্তি বৃদ্ধি এবং প্রজননক্ষমতা বাড়ানোর ক্ষেত্রে খেজুরের উপকারিতা নিয়ে নানা ধরনের প্রচলিত ধারণা রয়েছে।

Advertisement

তবে এ বিষয়ে বিজ্ঞান আসলে কী বলছে?

গবেষণার তথ্য অনুযায়ী, খেজুর সরাসরি পুরুষদের যৌনক্ষমতা বা প্রজননক্ষমতা বাড়ায় - এমন শক্ত প্রমাণ এখনো পাওয়া যায়নি। তবে খেজুরে থাকা ভিটামিন, খনিজ, ফাইবার এবং অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট সামগ্রিক স্বাস্থ্যের উন্নতিতে সাহায্য করতে পারে, যা পুরুষ ও নারী উভয়ের জন্যই উপকারী এবং প্রযোজ্য।


খেজুর কি বন্ধ্যত্বের ক্ষেত্রে সাহায্য করতে পারে?

আফ্রিকার কিছু ঐতিহ্যবাহী চিকিৎসা পদ্ধতিতে দীর্ঘদিন ধরে পুরুষদের বন্ধ্যত্বের চিকিৎসায় খেজুর ব্যবহার করা হয়ে আসছে। একটি প্রাথমিক গবেষণায় দেখা গেছে, খেজুর বন্ধ্যত্বে আক্রান্ত ইঁদুরের কিছু প্রজননসংক্রান্ত সমস্যার উন্নতি করতে পারে। তবে একই সঙ্গে গবেষণায় টেস্টোস্টেরনের মাত্রা কমে যাওয়ার বিষয়টিও দেখা গেছে।

গবেষকরা মনে করেন, মানুষের ক্ষেত্রে এর প্রকৃত প্রভাব জানতে আরও বিস্তৃত গবেষণা প্রয়োজন। তাই বর্তমানে খেজুরকে পুরুষদের বন্ধ্যত্বের চিকিৎসা হিসেবে বিবেচনা করার মতো যথেষ্ট বৈজ্ঞানিক প্রমাণ নেই।


মস্তিষ্কের স্বাস্থ্যের জন্য উপকারী হতে পারে

কিছু গবেষণায় দেখা গেছে, নিয়মিত খেজুর খাওয়া চিন্তাশক্তি ও স্মৃতিশক্তির জন্য উপকারী হতে পারে।

২০১৬ সালের একটি বৈজ্ঞানিক পর্যালোচনায় উল্লেখ করা হয়, খেজুরে থাকা অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট মস্তিষ্কে ক্ষতিকর প্রোটিন জমা হওয়ার ঝুঁকি কমাতে সাহায্য করতে পারে। এই ধরনের প্রোটিন জমা হওয়া আলঝেইমার রোগের সঙ্গে সম্পর্কিত।

যদিও অধিকাংশ গবেষণা প্রাণীর ওপর করা হয়েছে, তবুও ফলাফলগুলো আশাব্যঞ্জক।

অ্যান্টিঅক্সিডেন্টে ভরপুর

শরীরে ফ্রি র‌্যাডিক্যাল নামের অস্থিতিশীল অণুর কারণে অক্সিডেটিভ স্ট্রেস তৈরি হয়, যা ক্যানসার, হৃদরোগ, ডায়াবেটিস ও স্নায়ুবিক রোগের ঝুঁকি বাড়াতে পারে। খেজুরে প্রচুর অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট রয়েছে, যা শরীরকে এই ক্ষতিকর প্রভাব থেকে সুরক্ষা দিতে সাহায্য করতে পারে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, খেজুরে থাকা ফেনলিক অ্যাসিড, ক্যারোটিনয়েড এবং অন্যান্য অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট দীর্ঘমেয়াদে স্বাস্থ্যের জন্য উপকারী হতে পারে।

ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণে সহায়ক হতে পারে

খেজুর মিষ্টি হলেও এতে থাকা ফাইবারের কারণে এটি ধীরে ধীরে হজম হয়। ফলে রক্তে শর্করার মাত্রা হঠাৎ বেড়ে যাওয়ার ঝুঁকি তুলনামূলক কম থাকে। কিছু গবেষণায় দেখা গেছে, খেজুর অগ্ন্যাশয়ের কার্যকারিতা উন্নত করতে এবং ইনসুলিন নিঃসরণে সহায়তা করতে পারে। তবে ডায়াবেটিসে আক্রান্ত ব্যক্তিদের খেজুর খাওয়ার পরিমাণ সম্পর্কে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত।

হজমশক্তি ভালো রাখতে সাহায্য করে

খেজুরে প্রচুর পরিমাণে খাদ্যআঁশ বা ফাইবার রয়েছে। আর ফাইবারের উপকারিতার মধ্যে রয়েছে:

  • কোষ্ঠকাঠিন্য প্রতিরোধ
  • হজমশক্তির উন্নতি
  • অন্ত্রের স্বাস্থ্য ভালো রাখা
  • স্থূলতা ও হৃদরোগের ঝুঁকি কমাতে সহায়তা
  • ত্বকের জন্যও উপকারী হতে পারে

গবেষণায় দেখা গেছে, খেজুর নির্যাসযুক্ত কিছু ত্বক পরিচর্যা পণ্য ত্বকের আর্দ্রতা, উজ্জ্বলতা এবং স্থিতিস্থাপকতা বাড়াতে সাহায্য করতে পারে।

এছাড়া ত্বকের বয়সজনিত কিছু পরিবর্তন কমাতেও এটি সহায়ক হতে পারে বলে ধারণা করা হয়।

খেজুরের পুষ্টিগুণ

  • প্রায় ১০০ গ্রাম খেজুরে পাওয়া যায়
  • ক্যালোরি: ২৭৭
  • প্রোটিন: ১.৮ গ্রাম
  • ফাইবার: ৬.৭ গ্রাম
  • ম্যাগনেসিয়াম: ৫৪ মিলিগ্রাম
  • পটাশিয়াম: ৬৯৬ মিলিগ্রাম
  • ভিটামিন বি৬
  • কপার
  • ম্যাঙ্গানিজ

এছাড়া এতে রয়েছে বিভিন্ন ধরনের অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট ও উদ্ভিজ্জ যৌগ।

খেজুর খাওয়ার ক্ষেত্রে সতর্কতা

খেজুর অত্যন্ত পুষ্টিকর হলেও এতে প্রাকৃতিক চিনি ও ক্যালোরির পরিমাণ তুলনামূলক বেশি।

তাই এটি অতিরিক্ত খাওয়া উচিত নয়। ডায়াবেটিস থাকলে পরিমাণ নিয়ন্ত্রণে রাখা দরকার এবং ওজন কমানোর চেষ্টা করলে দৈনিক ক্যালোরির হিসাবের মধ্যে রাখা উচিত।


খাদ্যতালিকায় খেজুর যোগ করার উপায়

  • সকালের ওটস বা পায়েসে মিশিয়ে
  • ফল ও বাদামের সঙ্গে স্ন্যাকস হিসেবে
  • স্মুদি তৈরিতে
  • দইয়ের সঙ্গে
  • চিনি কমানোর বিকল্প হিসেবে খেজুরের পেস্ট ব্যবহার করে

প্রতিদিন কয়টি খেজুর খাওয়া ভালো

বেশিরভাগ মানুষের জন্য প্রতিদিন ৩ থেকে ৬টি খেজুর খাওয়াকে একটি উপযুক্ত পরিমাণ হিসেবে ধরা হয়। এই পরিমাণ খেজুর শরীরকে প্রাকৃতিক শক্তি, খাদ্যআঁশ এবং বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পুষ্টি উপাদান দিতে পারে, আবার অতিরিক্ত ক্যালোরি বা চিনি গ্রহণের ঝুঁকিও তুলনামূলক কম থাকে।

তবে সবার জন্য একই পরিমাণ উপযুক্ত নাও হতে পারে। একজন মানুষের বয়স, শারীরিক গঠন, স্বাস্থ্যগত অবস্থা এবং দৈনন্দিন কর্মকাণ্ডের মাত্রার ওপর খেজুর খাওয়ার পরিমাণ নির্ভর করে। উদাহরণস্বরূপ-

  • যারা নিয়মিত ব্যায়াম করেন বা শারীরিকভাবে খুব সক্রিয়, তারা তুলনামূলক বেশি খেজুর খেতে পারেন।
  • ডায়াবেটিসে আক্রান্ত ব্যক্তি বা যাদের রক্তে শর্করা নিয়ন্ত্রণে রাখতে হয়, তাদের ক্ষেত্রে কম পরিমাণ খাওয়াই ভালো হতে পারে।
  • ওজন কমানোর চেষ্টা করছেন এমন ব্যক্তিদেরও দৈনিক ক্যালোরির হিসাবের মধ্যে রেখে খেজুর খেতে হবে।

খেয়াল রাখবেন, খেজুরে প্রাকৃতিক চিনি থাকলেও এতে প্রচুর ফাইবার, পটাশিয়াম, ম্যাগনেসিয়াম এবং অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট রয়েছে। তাই পরিমিত পরিমাণে খেলে এটি একটি স্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাসের অংশ হতে পারে। তাই প্রতিদিন ৩ থেকে ৬টি খেজুর খাওয়া সাধারণত বেশিরভাগ সুস্থ মানুষের জন্য উপকারী ও নিরাপদ বলে বিবেচিত হয়। তবে ব্যক্তিগত স্বাস্থ্যগত প্রয়োজন অনুযায়ী এই পরিমাণ কিছুটা কম বা বেশি হতে পারে।

পুরুষদের যৌনক্ষমতা বা প্রজননক্ষমতা বাড়াতে খেজুরের সরাসরি ভূমিকা আছে - এমন প্রমাণ এখনো যথেষ্ট নয়। তবে খেজুরে থাকা ফাইবার, ভিটামিন, খনিজ এবং অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট সামগ্রিক স্বাস্থ্যের উন্নতিতে সাহায্য করতে পারে।

সুষম খাদ্যাভ্যাসের অংশ হিসেবে পরিমিত পরিমাণে খেজুর খাওয়া শরীরের জন্য উপকারী হতে পারে। তবে এটিকে কোনো অলৌকিক খাবার বা নির্দিষ্ট রোগের চিকিৎসা হিসেবে দেখার আগে বৈজ্ঞানিক তথ্য বিবেচনা করা জরুরি।

সূত্র: মেডিকেল নিউজ টুডে