
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের (ঢাবি) শিক্ষার্থীদের টার্গেট করে সক্রিয় হয়ে উঠেছে মাদারীপুরকেন্দ্রিক একটি প্রতারকচক্র। ভুয়া পরিচয়ে অভিভাবকদের ফোন করে ‘সন্তানের বিপদ’ জানিয়ে তারা হাতিয়ে নিচ্ছে মোটা অঙ্কের টাকা। গত কয়েক মাসে এমন প্রতারণার শিকার হয়েছে ঢাবির ২০ জনেরও বেশি শিক্ষার্থীর পরিবার।
প্রাণিবিদ্যা বিভাগের শিক্ষার্থী রাগিব শাহরিয়ার। গত ২৩ জুন সকালে অ্যান্ড্রয়েড ফোন চার্জে রেখে বাটন ফোন নিয়ে ক্লাসে যান। তিনি যখন ক্লাসে ঠিক তখনই তার বাবার কাছে অপরিচিত নম্বর থেকে ফোন আসে। কলদাতা নিজেকে পুলিশ সদস্য পরিচয় দিয়ে জানান, রাগিব মাদকসহ থানায় ধরা পড়েছে।
তার বাবা প্রথমে বিশ্বাস করতে না চাইলে প্রতারকচক্র প্রযুক্তির সাহায্যে রাগিবের কণ্ঠ নকল করে কান্নাকাটির শব্দ শোনায়। ‘সন্তানের কান্না’ শুনে ভেঙে পড়েন বাবা।
কথিত পুলিশ সদস্যের দাবি অনুযায়ী, দুটি রকেট নম্বরে পাঠান ১ লাখ ২০ হাজার টাকা। পরে আসল রাগিবের সঙ্গে যোগাযোগ হলে বুঝতে পারেন, পুরোটাই ছিল সাজানো। মাঝে প্রতারকচক্রের খপ্পরে পড়ে এতগুলো টাকা হারিয়েছেন তিনি।
যেভাবে পাতা হয় প্রতারণার ফাঁদ
রাগিবের বিষয়টি বিচ্ছিন্ন কোনো ঘটনা নয়। প্রতারকচক্রের সদস্যরা নিজেদের ডিবি, র্যাব বা পুলিশের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা পরিচয় দিয়ে বিভিন্ন শিক্ষার্থীর অভিভাবককে ফোন করে।
সন্তান মাদকসহ ধরা পড়েছে কিংবা দুর্ঘটনায় আইসিইউতে মৃত্যুর সঙ্গে লড়ছে, এমন বার্তা দিয়ে আতঙ্কিত করা হয় তাদের। বিশ্বাসযোগ্যতা বাড়াতে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার (এআই) সাহায্যে টার্গেটকৃত শিক্ষার্থীর কণ্ঠ নকল করে কান্নাকাটির শব্দ শোনানো হয়।
গত ২১ মে বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি গ্রুপে সহায়তা চেয়ে পোস্ট করেন মুস্তফা আরিফুজ্জামান নামের এক শিক্ষার্থী। তিনি লেখেন, ‘আজকে দুপুরে আমার আব্বুর কাছে এক প্রতারকচক্র ডিবি পরিচয় দিয়ে ফোন দেয়, তারপর উনাকে আমার ব্যাপারে ভুল তথ্য দিয়ে কয়েক লাখ টাকা চায়। আমার আব্বুকে এক্সট্রিম প্রেশারে রেখে প্রতারকচক্র ইতিমধ্যে দেড় লাখ টাকা হাতিয়ে নেয়। এর মধ্যে আমার আব্বুকে কারো সাথে সম্পূর্ণ যোগাযোগ অফ রাখতে বাধ্য করে প্রতারকচক্র। আমার কণ্ঠ নকল করে আমাকে প্রাণনাশের হুমকি দিয়ে ডিবি পরিচয়ে এখনও প্রেশার দিচ্ছে আমার আব্বুকে।’
একই গ্রুপে নিজের অভিজ্ঞতা শেয়ার করেন আরেক শিক্ষার্থী উসামা বিন ওমর। তিনি লেখেন, ‘একটা খুবই ভয়ংকর অভিজ্ঞতার সম্মুখীন হলাম। বড় বিপদ থেকে রক্ষা পেয়েছি। বিকেলে আমি বাইরে খেলাধুলা করতে যাই। ফিরতে সন্ধ্যা হয়ে যায়। এই সময়েই আমার আব্বু ডিবি পরিচয়ে একটি অপরিচিত নম্বর থেকে ফোন পান। ফোনে আমাদের ভাইদের সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করার পর একপর্যায়ে বলা হয়, আমাকে নাকি কোনো কারণে গ্রেফতার করা হয়েছে এবং আমি থানায় আছি। এরপর আরেকজনকে ফোনে ধরিয়ে দেওয়া হয়, যে কান্নাজড়িত কণ্ঠে বলে যে আমাকে মারধর করা হচ্ছে এবং খুব শিগগিরই চালান দিয়ে দেওয়া হবে। এ অবস্থায় দ্রুত একটি বিকাশ নাম্বারে ১৫ হাজার টাকা পাঠাতে বলা হয়। ঠিক সেই মুহূর্তে আমার আব্বু ও আপু আমাকে ফোন দেন এবং আমি নিশ্চিত করি যে আমি সম্পূর্ণ নিরাপদে বাজারে আছি। এভাবে আমরা একটি বড় ধরনের প্রতারণার ফাঁদ থেকে রক্ষা পাই। তবে এই ঘটনায় আমার আম্মু খুবই বিচলিত হয়ে পড়েন।’
ওমরের পোস্টের কমেন্টে আরও দশজনের বেশি ভুক্তভোগীর সন্ধান পায় এশিয়া পোস্ট। ইমরান হোসাইন, তৌফিক ইমরান ও শাকিল হোসেনসহ একাধিক শিক্ষার্থী জানান, তাদের পরিবারের সঙ্গেও একই ধরনের ঘটনা ঘটেছে। কারো ক্ষেত্রে মাদক নিয়ে ধরা পড়ার ভয় দেখানো হয়েছে, আবার কারো ক্ষেত্রে জরুরি রক্ত বা অপারেশনের কথা বলে টাকা চাওয়া হয়েছে।
এই প্রতারণামূলক ফোনের কারণে অনেক অভিভাবক মারাত্মকভাবে অসুস্থ হয়ে পড়ছেন। শিক্ষার্থী মাসুদ রহমানের বাবার এমন পরিস্থিতিতে হার্ট অ্যাটাক করার মতো অবস্থা হয়েছিল। হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে হয় তাকে। রাকিবুল ইসলামের বাবাও এমন ঘটনায় মানসিকভাবে বিপর্যস্ত হয়ে পড়েন। স্বাভাবিক হতে তার দীর্ঘ সময় লাগে।
যা বলছেন ভুক্তভোগী অভিভাবকরা
ভুক্তভোগী রাকিবুল ইসলামের বাবা জহিরুল ইসলাম বলেন, ‘একটা কাজে ব্যস্ত ছিলাম। হঠাৎ করে অপরিচিত নম্বর থেকে ফোন আসে। আমাকে বলে, আপনার ছেলে রাকিব এক্সিডেন্ট করে হাসপাতালের জরুরি বিভাগে ভর্তি আছে। অবস্থা খুবই খারাপ, জরুরি রক্ত লাগবে। কিন্তু কোথাও পাওয়া যাচ্ছে না। আর অন্যান্য চিকিৎসাসহ জরুরি টাকা প্রয়োজন। আপনারা দ্রুত আসেন। তার আগেই টাকা পাঠান, নাহলে বাঁচানো যাবে না।’
তিনি বলেন, ‘ছেলের এমন কথা শুনে আমি তো ভয় পেয়ে গেছি। বাসায় একা ছিলাম। টাকা জোগাড় করার চেষ্টা করব, এমন সময় মনে হলো রাকিব তো অসুস্থ, ওর বন্ধুকে একটা কল দেই। পরে ওর বন্ধুকে কল দিলাম। সে বলল রাকিব ভালো আছে, আমার সঙ্গেই আছে। পরে বুঝলাম এটা ছিল একটা প্রতারণা।’
আরেক ভুক্তভোগীর বাবা শামসুল ইসলাম বলেন, ‘আমাকে কল দিয়ে বলা হয় আমার ছেলে মাদকসহ ধরা পড়েছে এবং ডিবিতে আছে। বিশ্বাস করানোর জন্যে তার কণ্ঠও শোনানো হয়। আমি স্পষ্ট শুনলাম আমার ছেলে বলতেছে, আব্বা আমাকে বাঁচান।’
তিনি বলেন, ‘তার (সন্তান) কণ্ঠ শোনার পরে আমি আর কোনো কিছু চিন্তা না করেই একটা নগদ নম্বরে ২৫ হাজার টাকা পাঠিয়ে দেই। কিন্তু টাকা পাঠানোর কিছুক্ষণ পর আমার ছেলে আমাকে কল দেয়। সে বলে, সে হলে আছে, তার কিছু হয়নি। ভুয়া কণ্ঠ শোনানোর কারণে এতটাই আতঙ্কগ্রস্ত ছিলাম যে, আমার ছেলেকে কল দিয়ে যে নিশ্চিত হব, সেই বিষয়টাও মাথায় ছিল না।’
সন্দেহের তীরে ভেতরের চক্র ও টিউশন মিডিয়া
প্রতারকরা শিক্ষার্থীদের ব্যক্তিগত তথ্য কোথা থেকে পাচ্ছেন, তা নিয়ে প্রশ্ন তৈরি হয়েছে। ভুক্তভোগীদের অনেকের ধারণা, তাদের ব্যক্তিগত তথ্য ও ফোন নম্বর কোনোভাবে চক্রের হাতে পৌঁছে যাচ্ছে।
শিক্ষার্থী সাইমন নবীন অরণ্যের মতে, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ভেতরের কোনো চক্র অথবা বিভিন্ন টিউশন মিডিয়া এর সঙ্গে সম্পৃক্ত থাকতে পারে।
এ বিষয়ে জানতে কথা হয় ঢাবির তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি (আইসিটি) সেলের পরিচালক অধ্যাপক ড. মোসাদ্দেক হোসেন কামাল তুষারের সঙ্গে। তিনি এশিয়া পোস্টকে বলেন, ‘ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের ব্যক্তিগত তথ্য শিক্ষার্থী ছাড়া অন্য কারো পক্ষে পাওয়া সম্ভব নয়। শিক্ষার্থীর নিজস্ব ইউজার আইডি-পাসওয়ার্ড আছে। এগুলো দিয়ে লগইন করা ছাড়া তথ্য পাওয়া সম্ভব নয়। আমাদের নিরাপত্তা ব্যবস্থা অত্যন্ত সুরক্ষিত।’
প্রতারকদের শনাক্ত করা কঠিন
বেশ কয়েকজন ভুক্তভোগীকে আইনি সহায়তা পেতে সহায়তা করেছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদের (ডাকসু) আইন সম্পাদক সাখাওয়াত জাকারিয়া। তিনি এশিয়া পোস্টকে বলেন, ‘আমরা এই ধরনের সমস্যাগুলোর ক্ষেত্রে পুলিশের মাধ্যমে ভুক্তভোগীকে সাহায্য করার চেষ্টা করেছি। কিন্তু প্রতিটি ক্ষেত্রে প্রতারকদের চিহ্নিত করা যায় না। তারা বিভিন্ন কৌশল অবলম্বন করে।’
সাখাওয়াত জাকারিয়া বলেন, ‘তাদের (অপরাধীদের) সিমগুলো এমন সব ব্যক্তির নামে নিবন্ধন করা যারা এসবের কিছুই জানেন না। দেখা যায়, সিম নিবন্ধন রংপুর, গাইবান্ধায় কিন্তু অপরাধীর লোকেশন ভিন্ন জায়গায়। তবে আমরা জেনেছি, এই চক্রটির বড় একটি অংশ মাদারীপুর থেকে নিয়ন্ত্রিত হয়। বেশিরভাগ ক্ষেত্রে টাকার পরিমাণ কম হওয়ায় পুলিশও সেভাবে আগ্রহ দেখায় না। সব মিলিয়ে আমাদের সচেতনতাই কেবল এই ধরনের প্রতারণা বন্ধ করতে পারে।’
ডাকসুর সাহিত্য ও সংস্কৃতি বিষয়ক সম্পাদক মোসাদ্দেক আলী ইবনে মুহাম্মদ বলেন, ‘এমন সমস্যার সম্মুখীন হয়ে ছয়জন শিক্ষার্থী আমার কাছে এসেছিল। তবে ভুক্তভোগীর প্রকৃত সংখ্যা আরও বেশি। শিক্ষার্থীদের আরও সচেতন হওয়া উচিত। পাশাপাশি প্রশাসনের তৎপরতা প্রয়োজন। অন্যথায় অনেক নিরীহ মানুষ প্রতারকদের লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হবে।’
সিআইডির বিশেষ পুলিশ সুপার (মিডিয়া) জসিম উদ্দিন খান এশিয়া পোস্টকে বলেন, ‘যেসব প্রতারণার ঘটনা ঘটছে এবং আমাদের কাছে যেসব অভিযোগ আসছে, আমরা সেগুলো গুরুত্বসহকারে দেখছি। সব ধরনের প্রতারণা নির্মূল ও ভুক্তভোগীদের সহায়তা দিতে আমরা তৎপর রয়েছি।’






