logo

বেরোবিতে ‘জুলাই আন্দোলনে অবদানের’ তালিকায় আওয়ামীপন্থি শিক্ষকরা

বেরোবিতে ‘জুলাই আন্দোলনে অবদানের’ তালিকায় আওয়ামীপন্থি শিক্ষকরা
বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের ফটক। ছবি: এশিয়া পোস্ট

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের সংবিধান সংশোধন-সম্পর্কিত বিশেষ কমিটির সঙ্গে মতবিনিময়ের জন্য বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের (বেরোবি) ১১ সদস্যের শিক্ষক প্রতিনিধির একটি তালিকা ইউজিসির পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় ম্যানেজমেন্ট বিভাগ পাঠানো হয়েছে। তালিকার অধিকাংশ শিক্ষক আওয়ামীপন্থি, আওয়ামী শিক্ষক সংগঠনের নেতা এবং জুলাই আন্দোলনে তাদের উল্লেখযোগ্য ভূমিকা না থাকলেও চিঠিতে তাদের বেরোবির জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে অবদান রাখা শিক্ষক সমাজের প্রতিনিধি হিসেবে উল্লেখ করেছে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন।

নথি সূত্রে জানা যায়, গত ২৭ সেপ্টেম্বর উপাচার্যের অনুমোদনক্রমে রেজিস্ট্রার (অতিরিক্ত দায়িত্ব) অধ্যাপক ড. মো. ফেরদৌস রহমান স্বাক্ষরিত চিঠিতে এই ১১ শিক্ষকের নাম ইউজিসির পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় ম্যানেজমেন্ট বিভাগের অতিরিক্ত পরিচালক মো. গোলাম মোস্তফার কাছে পাঠানো হয়েছে। তবে গতকাল বুধবার (৩০ সেপ্টেম্বর) এ তালিকা জনসম্মুখে আসার পর থেকে ক্যাম্পাসজুড়ে শুরু হয় সমালোচনা।

তালিকার ১১ শিক্ষক হলেন ম্যানেজমেন্ট স্টাডিজ বিভাগের অধ্যাপক ড. মো. মতিউর রহমান ও সহযোগী অধ্যাপক মো. মাসুদ রানা, ইলেকট্রিক্যাল অ্যান্ড ইলেকট্রনিক ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের অধ্যাপক ড. মো. ফেরদৌস রহমান ও সহকারী অধ্যাপক ইফফাত তারা বাঁধন, কম্পিউটার সায়েন্স অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের অধ্যাপক ড. মো. ইলিয়াস প্রামাণিক, রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ড. মো. তানজিউল ইসলাম, ইতিহাস ও প্রত্নতত্ত্ব বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ড. মো. মনিরুজ্জামান ও সহকারী অধ্যাপক মো. ইউসুফ, মার্কেটিং বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক মো. মাসুদ-উল-হাসান, পরিসংখ্যান বিভাগের সহকারী অধ্যাপক ফারজানা জান্নাত তসি এবং অ্যাকাউন্টিং অ্যান্ড ইনফরমেশন সিস্টেমস বিভাগের সহকারী অধ্যাপক শরীফা আক্তার নিপা।

তালিকায় থাকা শিক্ষকদের মধ্যে সহকারী অধ্যাপক মো. ইউসুফ জুলাই আন্দোলন চলাকালে আওয়ামীপন্থি শিক্ষকদের সংগঠন নীল দলের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্বে ছিলেন। এছাড়া সহকারী অধ্যাপক মো. ইউসুফের সনদ জালিয়াতি নিয়েও একটি তদন্ত চলমান রয়েছে।

তালিকার আরেক শিক্ষক সহযোগী অধ্যাপক মো. মাসুদ রানা ২০১৭ সালের বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক সমিতি নির্বাচনে নীল দলের প্যানেল থেকে কোষাধ্যক্ষ পদে নির্বাচন করেছেন এবং আবু সাঈদ হত্যা মামলার আসামি শিক্ষক মশিউর রহমানের ২০২৩ সালের ২ আগস্ট তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার রংপুর জিলা স্কুল মাঠে আয়োজিত সমাবেশে বেরোবির আওয়ামীপন্থি শিক্ষক সংগঠন নীল দলের প্রতিনিধি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন। যার তথ্য প্রমাণ প্রতিবেদকের হাতে এসেছে। এছাড়া জুলাই আন্দোলনেও তার উল্লেখযোগ্য ভূমিকা না থাকার দাবি করেছেন শিক্ষার্থীরা।

সহযোগী অধ্যাপক মো. মাসুদ-উল-হাসান বিশ্ববিদ্যালয়ের আওয়ামীপন্থি শিক্ষকদের আরেক সংগঠন প্রগতিশীল শিক্ষক সমাজের (হলুদ দল) সদস্য ছিলেন এবং ২০২০ সালে এই সংগঠনের প্যানেল থেকে শিক্ষক সমিতির নির্বাচন করেন।

এ ছাড়া সহকারী অধ্যাপক ইফফাত আরা বাঁধন বেরোবি বঙ্গমাতা পরিষদের সাধারণ সম্পাদক ও নীল দলের সর্বশেষ কমিটির সহ-সাংগঠনিক সম্পাদকের দায়িত্বে ছিলেন এবং একই সময়ে সহকারী অধ্যাপক শরীফা আক্তার নিপাও নীল দলের সহ-প্রচার ও প্রকাশনা সম্পাদকের দায়িত্বে ছিলেন।

এদিকে, সহযোগী অধ্যাপক ড. মো. তানজিউল ইসলাম জীবনও নীল দলের সদস্য ছিলেন বলে নীল দলের একাধিক নেতা নিশ্চিত করেছেন। এছাড়া জুলাই আন্দোলনে তাদের কারো উল্লেখযোগ্য কোনো ভূমিকা ছিল না বলে দাবি করেছেন জুলাই আন্দোলনকারী শিক্ষার্থীরা।

জুলাই আন্দোলনে বেরোবির সাবেক সমন্বয়ক আরমান হোসেন বলেন, এখানে দু-একজন ছাড়া অধিকাংশেরই জুলাইয়ে কোনো অবদান ছিল না। থাকলে প্রমাণ দেখাক। বরং যে সব শিক্ষকের কাছ থেকে আমরা সহযোগিতা পেয়েছি, তাদের অনেকের নাম তালিকায় নেই।

জুলাই আন্দোলনে বেরোবির আরেক সাবেক সমন্বয়ক শামসুর রহমান সুমন বলেন, নিজের চোখে দেখা, নেতৃত্ব দেওয়া জুলাইয়ের এত বড় বিকৃতি কখনোই মেনে নিতে পারবো না। ধিক্কার জানাই। বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন এতটাও নিচে নামবেন ভাবতে পারিনি। এ তালিকায় অধিকাংশ ব্যক্তি আছেন যারা আওয়ামী খোলস পাল্টিয়ে নব্য বিএনপি হয়েছেন, প্রশাসনিক পদ পদবি নিয়ে নিয়েছেন। কিন্তু ‘জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে’ অবদান রেখেছেন এটা মানতে পারব না। অনতিবিলম্বে এই তালিকা প্রত্যাহার ও সংশোধন করতে হবে। হলফ করে বলতে পারি, এই তালিকায় গুটি কয়েকজন বাদে অধিকাংশই ‘জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে’ কোনো অবস্থান, লেখা কিংবা কোনো বক্তব্য দেখাতে পারবেন না।

তালিকার বিষয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের অতিরিক্ত দায়িত্বপ্রাপ্ত রেজিস্ট্রার অধ্যাপক ড. মো. ফেরদৌস রহমান এশিয়া পোস্টকে বলেন, জুলাই আন্দোলনে অংশ নেওয়া শিক্ষার্থীদের সঙ্গে আলোচনার মাধ্যমে সংশোধন করে আবার তালিকা পাঠানো হবে।