টাকা লেনদেনের পর সিলগালা কয়েনের বাক্সে মিলল জ্যান্ত সাপ, গ্রেপ্তার ৪

চা বাগানে ব্রিটিশ আমলের ‘অলৌকিক’ সীমানা পিলার ও অতিমূল্যবান কয়েন রয়েছে, এমন খবর পেয়ে চকচক করে উঠেছিল ব্যবসায়ী আব্দুর রহিমের (৩৫) চোখ। কথিত বাজারমূল্য হাজার কোটি টাকা। সেই ধন পাওয়ার লোভে প্রলুব্ধ হয়ে শেষ পর্যন্ত নিজের ও প্রবাসী আত্মীয়দের মোট ২ কোটি ২১ লাখ টাকা তুলে দেন এক সংঘবদ্ধ প্রতারক চক্রের হাতে।
টাকা লেনদেনের পর সিলগালা করা বাক্সে মিলল এক জ্যান্ত সাপ। আঁতকে উঠে ঘটনা জানতে চাইলে প্রতারকরা ফাঁদে অবিশ্বাস্য আরেক গল্প- টাকা নিয়ে বিরোধের কারণে অলৌকিক বস্তুটি নাকি ‘জিনের মাধ্যমে’ সাপে পরিণত হয়েছে। ২১ দিন পর তা আবার আগের রূপ ফিরে পাবে, এমন আশ্বাসে আরও অর্থ হাতিয়ে নিয়ে চম্পট দেয় চক্রটি।
তবে শেষ রক্ষা হয়নি। অলৌকিক সীমানা পিলার ও প্রাচীন কয়েন কেনাবেচার মাধ্যমে বিপুল মুনাফার প্রলোভন দেখিয়ে কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নেওয়া এই সংঘবদ্ধ চক্রের চার সদস্যকে গ্রেপ্তার করেছে মৌলভীবাজার জেলা গোয়েন্দা শাখা (ডিবি)।
বৃহস্পতিবার (১ অক্টোবর) দুপুরে মৌলভীবাজার জেলা পুলিশ সুপারের কার্যালয়ে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে তথ্যটি নিশ্চিত করেন অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (ক্রাইম অ্যান্ড অপস) নোবেল চাকমা।
এর আগে গতকাল বুধবার (৩০ সেপ্টেম্বর) শ্রীমঙ্গল ও ঢাকার মোহাম্মদপুর এলাকায় অভিযান চালিয়ে তাদের গ্রেপ্তার করা হয়।
গ্রেপ্তারকৃতরা হলেন রাজনগরের বাংলাটিলা (পণ্ডিত নগর) গ্রামের বাসিন্দা এসএম ইলিয়াছুর রহমান (৩৬), শ্রীমঙ্গলের উত্তর ভাড়াউড়া গ্রামের বাসিন্দা মো. ইকরাম মিয়া (২৮), ঢাকার মোহাম্মদপুর থানার শ্যামলী এলাকার বাসিন্দা তাহের-উল-ইসলাম আখতারুজ্জামান (৬১) এবং ঢাকার মোহাম্মদপুর থানার মোহাম্মদিয়া হাউজিং এলাকার বাসিন্দা মো. ইব্রাহিম বেপারী (৩৭)।
অভিযানকালে আসামিদের কাছ থেকে কথিত ২০০ কোটি টাকা মূল্যের ১টি ‘এন্টিক পাওয়ার কয়েন’, প্রতারণায় ব্যবহৃত ১টি নোহা গাড়ি, ১টি পকেট রাউটার, ৮টি মোবাইল ফোন, ১০টি সিমকার্ড, ‘এন্টিক গ্যালারি ইন্টারন্যাশনাল লিমিটেড’-এর ১টি ভুয়া সনদপত্র, ৯৪ পাতার ভুয়া বিজনেস চুক্তিপত্র, ৫০০টি ভিজিটিং কার্ড, ১০০ টাকা মূল্যমানের ৬টি ভুয়া স্ট্যাম্প, ৩টি চেকবই, ১টি ব্ল্যাংক কয়েন অ্যালবাম ও ১টি ডায়েরি জব্দ করা হয়।
প্রতারণার কৌশল
তদন্ত সূত্র জানায়, চক্রটি দীর্ঘদিন ধরে নিজেদের ‘Heritage Auction’, ‘Lockheed Martin’, ‘BlackRock’ ও ‘Microsoft’-এর মতো বিশ্বখ্যাত প্রতিষ্ঠানের বাংলাদেশি প্রতিনিধি পরিচয় দিয়ে মানুষের সঙ্গে প্রতারণা করে আসছিল। চক্রের অন্যতম মূলহোতা আখতারুজ্জামানসহ চারজন ২০২৩ সালেও ঢাকা ডিবি পুলিশের হাতে গ্রেপ্তার হয়েছিলেন।
মামলার বিবরণ থেকে জানা যায়, রাজনগর উপজেলার বালিসাহস্রো গ্রামের ব্যবসায়ী আব্দুর রহিমকে তার পরিচিত ইলিয়াছুর রহমান জানান, চাতলাপুর চা বাগানে কোটি টাকার ব্রিটিশ আমলের ধাতব বস্তু রয়েছে। রহিমের বিশ্বাস অর্জনে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ‘US Heritage Auction’-এর বাংলাদেশ কান্ট্রি ডিরেক্টর পরিচয়ে কথা বলেন আখতারুজ্জামান। ২০২৩ সালের ১৯ আগস্ট তথাকথিত এক ‘এক্সপার্ট’ এনে চা বাগানে ভুয়া পরীক্ষার মাধ্যমে বস্তুর অস্তিত্ব নিশ্চিত করা হয়।
এরপর বস্তুটি কেনার অজুহাতে রহিমের প্রবাসী মামাতো ভাই মির্জা খালেদুর রহমানের কাছ থেকে চেকের মাধ্যমে ১ কোটি টাকা এবং পরবর্তীতে নগদ ২ কোটি টাকা হাতিয়ে নেওয়া হয়। একই বছরের ২৭ অক্টোবর বস্তুটি একটি বক্সে সিলগালা করে ভিকটিমদের বুঝিয়ে দিয়ে বলা হয়, দুই দিন পর আরও ১০ কোটি টাকা পরিশোধ করে বাক্স খুলতে হবে। কিন্তু কৌতূহলবশত বাক্স খুলতেই বেরিয়ে আসে জ্যান্ত সাপ।
সাপের অদ্ভুত ব্যাখ্যার পর আসামিরা ভিকটিমকে আরও একটি মূল্যবান বস্তুর প্রলোভন দেখিয়ে নতুন করে ৩ লাখ ৫০ হাজার টাকা হাতিয়ে নেয়। মোট ২ কোটি ২১ লাখ টাকা আত্মসাতের পর চক্রটি সব যোগাযোগ বন্ধ করে আত্মগোপনে চলে যায়।
মৌলভীবাজারের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার নোবেল চাকমা জানান, ২০২৪ সালে কুলাউড়া থানায় দায়ের করা একটি মামলার ভিত্তিতে অভিযান চালিয়ে আসামিদের গ্রেপ্তার করা হয়। তাদের বিরুদ্ধে আইনি প্রক্রিয়া চলমান। সংবাদ সম্মেলনে তিনি অলৌকিক ক্ষমতাভিত্তিক ধাতব বস্তু, সীমানা পিলার বা অসাধু উপায়ে রাতারাতি ধনী হওয়ার প্রলোভনে না পড়তে এবং যে কোনো সন্দেহজনক লেনদেন থেকে সতর্ক থাকতে সর্বসাধারণের প্রতি অনুরোধ জানান।
