ফেনীতে বিলুপ্তির পথে ৪০ প্রজাতির দেশি মাছ

জলবায়ু পরিবর্তনের ক্ষতিকর প্রভাব, নদী-নালার নাব্যতা সংকট এবং মানবসৃষ্ট নানা কারণে ফেনীর মুহুরী, কহুয়া, সিলোনীয়া, কাটাখালি ও ছোট ফেনী নদীসহ বিভিন্ন উন্মুক্ত জলাশয় থেকে দ্রুত হারিয়ে যাচ্ছে পুষ্টিগুণে সমৃদ্ধ দেশীয় প্রজাতির নানা মাছ। প্রাকৃতিক প্রজনন ক্ষেত্র ধ্বংস ও নিষিদ্ধ জালের দাপটে অন্তত ৩০ থেকে ৪০ প্রজাতির দেশি মাছ এখন বিলুপ্তির পথে। ফলে স্থানীয় বাজারগুলো এখন হাইব্রিড জাতের মাছের দখলে চলে গেছে।
ফেনীর বড় বাজার, মহিপাল কাঁচা বাজার, পাঁচগাছিয়া, কুঠির হাট, সিলোনীয়া, সোনাগাজী ও দাগনভূঞা বাজারসহ জেলার বিভিন্ন মৎস্য আড়ত ঘুরে দেখা যায়—চাষের পাঙ্গাশ, তেলাপিয়া, হাইব্রিড কই আর কার্প জাতীয় মাছে বাজার সয়লাব। অথচ এক দশক আগেও যেখানে স্থানীয় নদী ও বিলের মাছের আধিপত্য ছিল, সেখানে এখন দেশি মাছ খুঁজে পাওয়া দুষ্কর। মাঝেমধ্যে কিছু দেশি টাকি, পুঁটি, বেতরঙ্গি, মাগুর, গুলশা, শিং, তিতনি বা শোল মাছ পাওয়া গেলেও তা সাধারণ ক্রেতাদের ক্রয়ক্ষমতার বাইরে, বিক্রি হচ্ছে চড়া দামে।
স্থানীয় জেলেরা জানান, আগে জাল ফেললেই ঝাঁকে ঝাঁকে মাছ মিলত, কিন্তু এখন সারা দিন নদীতে জাল টেনেও অনেককে খালি হাতে ফিরতে হচ্ছে। ফলে সোনাগাজী ও সদরের লেমুয়া ফরহাদ নগরের জেলেপাড়ার অনেক পরিবার এখন আদি পেশা ছেড়ে অন্য পেশায় ঝুঁকছে।
ফেনীর দাগনভূঞার জেলে মোহাম্মদ আবদুল্লাহ বলেন, আমি ছোটবেলা থেকেই নদীতে মাছ ধরে বড় হয়েছি। আমাদের জীবনে ছোট ফেনী নদী আশীর্বাদ ছিল। নদীতে মাছ ধরে আমাদের সংসার চলত। নৌকা ছিল, জাল ছিল, জনবল ছিল। কিন্তু এখন নদীতে আর মাছ পাই না। বাধ্য হয়ে আমাদের দলের অনেকেই এই পেশা ছেড়ে চলে গেছে। আমিও এখন সিএনজিচালিত অটোরিকশা চালাই।
মৎস্য বিশেষজ্ঞদের মতে, ফেনীর জলাশয়গুলো থেকে অন্তত ৩০ থেকে ৪০ প্রজাতির দেশীয় মাছ প্রায় বিলুপ্তির পথে। যার মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো—খলিশা, পুঁটি, ট্যাংরা, পাবদা, কাজলী, বাতাসি, চান্দা, বাইম, আইড়, বোয়াল, চিতল, ফলি, গজার, মাগুর, শিং এবং শোল। মাছ হারিয়ে যাওয়ার মূল কারণসমূহের মধ্যে রয়েছে—দীর্ঘদিন নদী ও খাল পুনর্খনন না করায় পলি জমে মাছের প্রাকৃতিক প্রজনন ক্ষেত্রগুলো ভরাট হয়ে গেছে। শুকনো মৌসুমে পানি কমে যাওয়ায় মাছ ডিম ছাড়ার উপযুক্ত পরিবেশ পায় না। প্রজনন মৌসুমে একশ্রেণির লোভী মৎস্য শিকারি আইন অমান্য করে ‘চায়না দুয়ারি’ ও ‘কারেন্ট জাল’ ব্যবহার করে মা মাছ এবং রেণু পোনা নির্বিচারে ধ্বংস করছে। এছাড়া কৃষিজমিতে ব্যবহৃত রাসায়নিক সার ও কীটনাশক বৃষ্টির পানির সঙ্গে ধুয়ে জলাশয়গুলোতে মিশছে। ফলে পানির অম্লতা ও দূষণ বেড়ে মাছের মড়ক দেখা দিচ্ছে। অপরিকল্পিত আবাসন ও রাস্তাঘাট নির্মাণের কারণে নদী-নালার সঙ্গে সংযুক্ত খালগুলো বন্ধ হয়ে গেছে, যা মাছের মুক্ত চলাচলে বাধা সৃষ্টি করছে।
এদিকে নদীতে মাছের আকাল চলায় সবচেয়ে বেশি বিপাকে পড়েছেন ফেনীর সোনাগাজী উপজেলার উপকূলীয় অঞ্চলের জেলেরা। স্থানীয় জেলেপাড়ার বাসিন্দারা জানান, নদীগুলো মরে যাওয়ায় এবং অবৈধ জালের দাপটে সাধারণ ছোট জাল দিয়ে এখন আর মাছ পাওয়া যায় না। দাদন আর ঋণের দেনা শোধ করতে না পেরে অনেকেই বাধ্য হয়ে রিকশা চালানো বা দিনমজুরির কাজে চলে যাচ্ছেন।
ফেনীর সোনাগাজীর চর দরবেশ ইউনিয়নের চর সাহাভিকারী গ্রামের বাসিন্দা নিজাম উদ্দিন কাজী জানান, মূলত মুছাপুর স্লুইসগেট ভেঙে যাওয়ায় নদীতে লোনাপানি প্রবেশ করার কারণে মিঠাপানির কোনো মাছ এখন নদীতে নাই। তাছাড়া আগের মতো উন্মুক্ত বিলে দেশীয় প্রজাতির কোনো মাছই দেখা যায় না। বাধ্য হয়ে আমাদের তেলাপিয়া আর পাঙ্গাশ কিনতে হচ্ছে। দেশীয় প্রজাতির মাছ রক্ষায় সরকারের দ্রুত এগিয়ে আসা উচিত।
জেলা মৎস্য কর্মকর্তা মাকসুদুল হাসান বলেন, নানা কারণে দেশীয় প্রজাতির মাছ আমাদের কাছ থেকে বিলুপ্ত হয়ে যাচ্ছে। মা মাছ রক্ষায় আমরা সরকারি আইন অনুযায়ী চায়না দুয়ারি ও কারেন্ট জাল বন্ধে নিয়মিত অভিযান পরিচালনা করছি। দেশীয় প্রজাতির মাছ রক্ষায় সরকার ইতোমধ্যে নানা উদ্যোগ হাতে নিয়েছে। তবে শুধু সরকারি অভিযানের ওপর নির্ভর না করে স্থানীয়ভাবে সচেতনতা বৃদ্ধি করা জরুরি।
বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, ফেনীর দেশীয় মাছের ঐতিহ্য ফিরিয়ে আনতে হলে অবিলম্বে জেলার প্রধান নদী ও সংযোগ খালগুলো জরুরি ভিত্তিতে পুনর্খনন করতে হবে। প্রজনন মৌসুমে (বিশেষ করে মে থেকে জুলাই মাস) সব ধরনের মাছ ধরা কঠোরভাবে নিষিদ্ধ করা এবং অভয়াশ্রম গড়ে তোলা প্রয়োজন। একই সঙ্গে নিষিদ্ধ চায়না দুয়ারি ও কারেন্ট জালের ব্যবহার বন্ধে নিয়মিত মোবাইল কোর্ট পরিচালনা এবং সরকারি হ্যাচারিগুলোতে দেশি মাছের কৃত্রিম প্রজনন ও পোনা অবমুক্তকরণ কর্মসূচি আরও জোরদার করা দরকার।





