ফরিদপুরে যুবক নিহত, পরিবারের দাবি গুলি করেছেন স্বেচ্ছাসেবক দল নেতা

ফরিদপুরের ভাঙ্গায় দুই গ্রামের বাসিন্দাদের মধ্যে তিন ঘণ্টাব্যাপী রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেছে। এতে গুলিবিদ্ধ হয়ে সুমন শেখ (২০) নামে এক ফাস্ট ফুড ব্যবসায়ী যুবক নিহত হয়েছেন। এ ঘটনায় জড়িত সন্দেহে এখন পর্যন্ত ১৭ জনকে আটক করেছে পুলিশ।
নিহত সুমনের পরিবারের সদস্যদের দাবি উপজেলা স্বেচ্ছাসেবক দলের এক শীর্ষ নেতার এলোপাতাড়ি গুলিতে এই নিহতের ঘটনা ঘটেছে।
স্থানীয়দের বলছেন, সংঘর্ষ চলাকালে ব্যাপক ভাঙচুর ও লুটপাটের শিকার হয়েছে প্রায় ৩০টি দোকানপাট। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে গিয়ে পুলিশ ও সাংবাদিকসহ উভয় পক্ষের অন্তত ১৫ জন আহত হয়েছেন।
স্থানীয় ও পুলিশ সূত্রে জানা যায়, উপজেলার পূর্ব সদরদি ও হাসামদিয়া গ্রামের যুবকদের মধ্যে দীর্ঘদিনের পূর্বশত্রুতা চলছিল। এর জেরে গতকাল মঙ্গলবার (৩০ জুন) সন্ধ্যায় হাসামদিয়া গ্রামের ফয়সাল মাতুব্বরের নেতৃত্বে ভাঙ্গা দক্ষিণ পার বাসস্ট্যান্ড এলাকা থেকে পূর্ব সদরদি গ্রামের তিন যুবককে জোরপূর্বক তুলে নিয়ে যাওয়া হয়। এই খবর পেয়ে ভাঙ্গা পৌরসভার পূর্ব সদরদি গ্রামের মিলন বাবুর্চির ছেলে সুমন শেখসহ কয়েকজন যুবক তাদের উদ্ধার করতে যান। সেখানে দুপক্ষের মধ্যে তীব্র বাগ্বিতণ্ডা ও একপর্যায়ে হাতাহাতি শুরু হয়।
প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, হাতাহাতির ১০ মিনিটের মধ্যে ঘটনাস্থলে উপস্থিত হন উপজেলা স্বেচ্ছাসেবক দলের সদস্যসচিব সজিব মাতুব্বর। তিনি আকস্মিকভাবে নিজের কাছে থাকা আগ্নেয়াস্ত্র বের করে এলোপাতাড়ি গুলি ছুড়তে শুরু করেন। সজিবের ছোড়া গুলি সুমনের মুখে ও চোয়ালে বিদ্ধ হয়ে মাথার এক পাশ দিয়ে বেরিয়ে যায় এবং তিনি ঘটনাস্থলেই রক্তাক্ত অবস্থায় লুটিয়ে পড়েন।
গোলাগুলির খবর ছড়িয়ে পড়লে উভয় গ্রামের বাসিন্দারা দেশীয় অস্ত্রে সজ্জিত হয়ে এক্সপ্রেসওয়ে ও মহাসড়কের দুই পাশে অবস্থান নিয়ে তুমুল সংঘর্ষে জড়িয়ে পড়েন। আশপাশের আরও তিনটি গ্রামের মানুষও এই সংঘর্ষে যোগ দিলে পুরো এলাকা রণক্ষেত্রে পরিণত হয়। মঙ্গলবার সন্ধ্যা ৭টা থেকে রাত সাড়ে ৯টা পর্যন্ত টানা তিন ঘণ্টা ধরে চলা এই সংঘাতের সময় ভাঙ্গা বাসস্ট্যান্ডের প্রায় ৩০টি দোকানে ব্যাপক ভাঙচুর ও লুটপাট চালানো হয়।
খবর পেয়ে ভাঙ্গা থানা পুলিশ ঘটনাস্থলে গিয়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করলে বিক্ষুব্ধ জনতা পুলিশকে লক্ষ্য করে ইটপাটকেল নিক্ষেপ করে। এতে বেশ কয়েকজন পুলিশ সদস্য আহত হন। পরবর্তীতে অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন করে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনা হয়। গুরুতর আহত সুমনকে প্রথমে ভাঙ্গা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নিয়ে যাওয়া হয়।
ভাঙ্গা উপজেলা স্বাস্থ্য কর্মকর্তা তানসিভ জোবায়ের নাদিম এশিয়া পোস্টকে জানান, ‘আশঙ্কাজনক অবস্থায় এক যুবককে হাসপাতালে আনা হয়। তার মুখের চোয়ালের দিকে গুলিসদৃশ বস্তু ভেদ করে মাথার এক পাশ দিয়ে বেরিয়ে গেছে। ধারণা করা হচ্ছে, সেটি শটগানের গুলি হতে পারে। যার ফলে তার প্রচুর রক্তক্ষরণ হয়। তাকে দ্রুত উন্নত চিকিৎসার জন্য ফরিদপুর মেডিকেলে পাঠানো হয়।’
নিহত ব্যক্তির চাচাতো ভাই জিহাদ শেখ এশিয়া পোস্টকে বলেন,‘ফরিদপুর মেডিকেলে না নিয়ে আমরা দ্রুত ঢাকা মেডিকেলে নিয়ে নেই; কিন্তু তাকে বাঁচানো যায়নি। এখানে আনার পর ডাক্তার মৃত ঘোষণা করেন। এখন লাশ বাড়িতে নেওয়ার কার্যক্রম চলছে।’
জিহাদ শেখ অভিযোগ করে বলেন, ‘কিছুদিন আগে আমাদের গ্রামের শরিয়াতুল্লাহ নামে এক যুবককে হাসামদিয়া গ্রামের ফয়সালসহ কয়েক যুবক মারধর করে। পরে সেটি মুরব্বিরা বসে মীমাংসা করে দেয়। কিন্তু মঙ্গলবার সন্ধ্যার আগে হাসামদিয়ার কয়েক যুবক বাসস্ট্যান্ড থেকে আমাদের তিনজন লোক তুলে নিয়ে যায়। তখন সুমনসহ কয়েকজন ছুটে যায়। তাদের মধ্যে তর্কবিতর্ক শুরু হয়, এর ১০ মিনিটের মধ্যেই হাসামদিয়া গ্রামের বাসিন্দা ও উপজেলা স্বেচ্ছাসেবক দলের সাধারণ সম্পাদক সজিব মাতুব্বর আগ্নেয়াস্ত্র বের করে এলোপাতাড়ি ফায়ার করে। সজিবের গুলিতে আমার ভাইয়ের মৃত্যু হয়েছে।’ আরও তিনজনের কাছে পিস্তল ছিল বলে তিনি অভিযোগ করেন।
এদিকে সুমনের মৃত্যুর খবর ছড়িয়ে পড়লে মঙ্গলবার রাতেও মহাসড়কে আগুন জ্বালিয়ে বিক্ষোভ করে সাধারণ মানুষ। এর পরদিন, বুধবার (১ জুলাই) বেলা ১১টা থেকে আবারও ঢাকা-বরিশাল এক্সপ্রেসওয়েতে উত্তেজনা দেখা দেয়। সুমন হত্যার মূল আসামিদের দ্রুত গ্রেপ্তারের দাবিতে বিক্ষুব্ধ জনতা বিক্ষোভ মিছিল বের করে এক্সপ্রেসওয়ে অবরোধ করে। এর ফলে মহাসড়কের দুই পাশে শত শত যানবাহন আটকে পড়ে হাজার হাজার যাত্রী চরম ভোগান্তির শিকার হন।
হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় অভিযোগের বিষয়ে জানতে ভাঙ্গা উপজেলা স্বেচ্ছাসেবক দলের সদস্যসচিব সজিব মাতুব্বরের মোবাইল ফোনে একাধিকবার কল করা হলেও তার ফোনটি বন্ধ পাওয়া যায়।
এ বিষয়ে ভাঙ্গা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. মিজানুর রহমান এশিয়া পোস্টকে বলেন, ‘এই সংঘর্ষের ঘটনায় রাতেই অভিযান চালিয়ে ১৭ জনকে আটক করা হয়েছে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রয়েছে এবং অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন রয়েছে। সংঘর্ষে একজন নিহত হয়েছে, ময়নাতদন্ত প্রতিবেদন হাতে পেলে মৃত্যুর প্রকৃত কারণ জানা যাবে। পরিবারের পক্ষ থেকে অভিযোগ দিলে দ্রুত আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’





