
পাহাড়, হ্রদ আর মেঘের মিতালিতে ঘেরা রাঙামাটি যেন প্রকৃতির অপার সৌন্দর্যের এক লীলাভূমি। ছলছল জলের শব্দ, পাখির ডাক, মেঘের আড়ালে চিকচিক করা রোদ আর বুকভরা নির্মল বাতাসের টানে পর্যটকরা ছুটে আসেন কাপ্তাই হ্রদের ছোট ছোট দ্বীপে। যান্ত্রিক জীবনের ক্লান্তি ভুলে প্রশান্তির একটু অবকাশ খুঁজে নিতে কাপ্তাইয়ের এমনই এক নির্জন দ্বীপে গড়ে উঠেছে ‘গরবা গুদি’ হোমস্টে। ইট-পাথরের কৃত্রিমতা পেরিয়ে এখানে মেলে নিখাদ প্রকৃতির সান্নিধ্য, সঙ্গে পাহাড়ি সংস্কৃতির আপন ছোঁয়া।
চাকমা ভাষায় ‘গরবা’ মানে অতিথি আর ‘গুদি’ অর্থ ঘর। এই নামের মাঝেই যেন লুকিয়ে আছে উষ্ণ আতিথেয়তার এক অনন্য আহ্বান। বাঁশ আর ছনের তৈরি ঐতিহ্যবাহী মাচাং ঘর, স্বচ্ছ পানির মৃদু ঢেউ আর নিঝুম পাহাড়ি পরিবেশ সব মিলিয়ে পর্যটকদের মন জুড়িয়ে দেওয়ার মতো এক নিখুঁত ঠিকানা এটি।

যেভাবে শুরু নীলা চাকমার পথচলা
এই চমৎকার উদ্যোগটির পেছনের কারিগর উদ্যোক্তা নীলা চাকমা। চট্টগ্রাম কলেজ থেকে মাস্টার্স শেষ করে একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে সাড়ে তিন বছর চাকরি করেছেন তিনি। কিন্তু গতানুগতিক ধারার বাইরে নিজের কিছু করার প্রবল ইচ্ছে ছিল তার। আত্মীয়-স্বজনের কাছ থেকে ধার নিয়ে নিজের থাকার ঘরটি দিয়েই শুরু করেছিলেন পথচলা। প্রথমে রেস্টুরেন্ট এবং পরে পর্যটকদের রাত্রীযাপনের ইচ্ছা পূরণে চালু করেন রাঙামাটির প্রথম হোমস্টে সার্ভিস। এরপর থেকে আর পেছনে ফিরে তাকাতে হয়নি তাকে।
পাহাড়ি সংস্কৃতির ছোঁয়া ও পর্যটকদের উন্মাদনা
পর্যটকদের চাহিদা বাড়ায় বাঁশ ও ছন দিয়ে তৈরি করা হয়েছে আরও বেশ কয়েকটি মাচাং ঘর। দলবেঁধে এসব ঘরে থাকছেন অতিথিরা। পাহাড়ি পরিবেশে পাহাড়িদের মতো জীবনযাপনের পাশাপাশি এখানে মিলছে ঘরোয়া আমেজ ও ঐতিহ্যবাহী পাহাড়ি খাবারের স্বাদ।
কাপ্তাই হ্রদের তাজা মাছ দিয়ে নিজ হাতে রান্না করা খাবার পরিবেশন করা হয় অতিথিদের। চাইলে হেবাং, ব্যাম্বু চিকেন, বাঁশকোঁড়ল ভাজি, শুঁটকির নানা পদ কিংবা কলাপাতায় মোড়ানো পিঠাসহ বিভিন্ন ধরনের দেশীয় ও পাহাড়ি খাবারের স্বাদ নেওয়ার সুযোগ রয়েছে। গ্রামীণ ও পাহাড়ি সংস্কৃতির এই আবহ উপভোগ করছেন দেশ-বিদেশের পর্যটকরা।
প্রাকৃতিক পরিবেশে গড়ে উঠলেও গরবা গুদি হোমস্টেতে রয়েছে সার্বক্ষণিক বিদ্যুৎ সুবিধা। কাপ্তাই হ্রদ কিংবা আশপাশের এলাকায় ঘুরতে চাইলে বোট ভাড়ার ব্যবস্থাও করে দেয় হোমস্টে কর্তৃপক্ষ।
থাকার জন্য রয়েছে দুজনের উপযোগী পট হাউজ। পাশাপাশি বড় মাচাং ঘরে একসঙ্গে ১০ থেকে ১২ জন থাকার ব্যবস্থা রয়েছে। চাইলে থাকা যায় হোমস্টের নিজস্ব মাটির ঘরেও।
পাঁচজনের কম অতিথি থাকলে জনপ্রতি তিন বেলার খাবারসহ খরচ ২ হাজার টাকা। পাঁচজনের বেশি হলে জনপ্রতি খরচ ১ হাজার ৫০০ টাকা। তবে হোমস্টেতে যাওয়া-আসার বোট ভাড়া এর বাইরে।

এখানে আসা পর্যটকরা মধ্যে মো. মাহিম উদ্দিন বলেন, শহরের চার দেওয়ালের বন্দিদশা থেকে বেরিয়ে এখানকার খোলামেলা প্রাকৃতিক পরিবেশে ঘুরতে আসা। এখানকার মানুষ সহজ-সরল আচার-ব্যবহার এবং পাহাড়ি খাবার তাদের দারুণভাবে মুগ্ধ করেছে। যারা পাহাড়ে আসেন না, তারা কখনো এখানকার আসল অনুভূতির মর্ম বুঝতে পারবে না।

যেভাবে যাবেন গরবা গুদিতে
রাঙামাটি শহরে পৌঁছে কাপ্তাই জেটি ঘাট কিংবা নৌবাহিনী ও সেনাবাহিনীর ঘাট থেকে বোটে যেতে হয় গরবা গুদি হোমস্টেতে। তবে হোমস্টে কর্তৃপক্ষের সঙ্গে আগে যোগাযোগ করে গেলে রাঙামাটির আসামবস্তি-কালিলাছড়ি ঘাট থেকেও বোট নেওয়া যায়। যেকোনো ঘাট থেকে বোটে হোমস্টেতে পৌঁছাতে সময় লাগে প্রায় ৩০ থেকে ৪৫ মিনিট।
গরবা গুদির উদ্যোক্তা নীলা চাকমা জানান, প্রথমে রেস্টুরেন্ট ছিল। দেখা গেল পর্যটকরা যারা আসতো এখানে, রাতেও থাকতে চাইতো। কিন্তু রাতে থাকার ঘর ছিল না। আমি আমাদের নিজেদের থাকার দুইটি ও নিজেদের মাটির দুইটি রুমে পর্যটকদের জন্য রাতে থাকার ব্যবস্থা করি। এভাবেই আমার গরবা গুদি হোমস্টের যাত্রা শুরু।
তবে পর্যটন স্পট তৈরির এই উদ্যোগ সহজ ছিল না বলে জানান নীলা চাকমা। আক্ষেপ করে তিনি বলেন, আমার মতো আরও অনেকেই উদ্যোক্তা হতে চান। কিন্তু এখানকার স্থানীয় প্রশাসন, ব্যাংক কেউ ঋণ দিয়ে আমাদের সহযোগিতা করে না। তারা পাশে দাঁড়ালে আমি ও আমার মতো আরও অনেকেই বিভিন্ন রিসোর্ট বা হোমস্টে গড়ে তুলতে পারতো।
রিসোর্ট ওনার্স অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি সুবেধ চাকমা বলেন, রাঙামাটিতে যেসব রিসোর্ট বা হাউজবোট আছে সেগুলো সব ব্যক্তি উদ্যোগে গড়ে তোলা। এভাবে ব্যক্তি উদ্যোগে বেশিদূর এগিয়ে যাওয়া সম্ভব নয়। সহজ শর্তে বা স্বল্প সুদে ব্যাংক ঋণ ও সরকারি সহায়তা পেলে স্থানী হাজারো নারী ও তরুণ উদ্যোক্তা স্বাবলম্বী হওয়ার সুযোগ পাতো। যার ফলে পর্যটন খাতের আমূল পরিবর্তন আসবে বলে মনে করি।
এ বিষয়ে রাঙামাটি পার্বত্য জেলা পরিষদের চেয়ারম্যান দীপন তালুকদার জানান, পর্যটন উদ্যোক্তাদের জন্য ভবিষ্যতে ব্যাংক, জেলা পরিষদ ও উদ্যোক্তাদের সমন্বয়ে একটি ত্রিমুখী পরিকল্পনা হাতে নেওয়া হয়েছে, যা স্থানীয় পর্যটন শিল্পের উন্নয়নে বড় ভূমিকা রাখবে।
সম্ভাবনা ও নীতিমালায় ত্রিমুখী পরিকল্পনার কথা কাপ্তাইয়ে হোমস্টে সেবার পথচলা এটিই প্রথম হলেও, রাঙামাটি শহর ও এর আশপাশে রিসোর্ট ও হাউজ বোট রয়েছে অর্ধশতাধিকের বেশি। তবে পাহাড়ের এই সম্ভাবনাময় পর্যটন খাতকে আরও এগিয়ে নিতে প্রয়োজন সঠিক পৃষ্ঠপোষকতা ও
সরকারি সহযোগিতা।
