যন্ত্রপাতির অভাবে থমকে আছে ১১ কোটির বর্জ্য শোধনাগার

এশিয়া পোস্ট নিউজ, নীলফামারী
যন্ত্রপাতির অভাবে থমকে আছে ১১ কোটির বর্জ্য শোধনাগার
এফএসটিপি প্রকল্পে ময়লার স্তুপ। ছবি: এশিয়া পোস্ট

উদ্বোধনের পর মানববর্জ্য ব্যবস্থাপনায় ইতিবাচক পরিবর্তনের আশা জাগালেও প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি ও কারিগরি জনবলের অভাবে পূর্ণ সক্ষমতায় চলছে না নীলফামারী পৌরসভার ‘ফিকাল স্লাজ ট্রিটমেন্ট প্ল্যান্ট’ (এফএসটিপি)। প্রায় ১১ কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত এই প্রকল্প থেকে বর্জ্য শোধন করে জৈবসার উৎপাদন ও রাজস্ব আয়ের বিপুল সম্ভাবনা থাকলেও, তা এখন স্রেফ ময়লার ভাগাড়ে পরিণত হয়েছে। মিশ্র বর্জ্য থেকে প্লাস্টিক আলাদা করার আধুনিক প্রযুক্তি না থাকায় ভেস্তে যেতে বসেছে সরকারের এই পরিবেশবান্ধব উদ্যোগ।

পৌরসভা সূত্রে জানা গেছে, পরিকল্পিত স্যানিটেশন ব্যবস্থাপনার অংশ হিসেবে ২০২৩ সালে ২ দশমিক ৮৯ একর জমির ওপর এই এফএসটিপি নির্মাণ করা হয়। নিয়ম অনুযায়ী, শহরের বাসাবাড়িসহ বিভিন্ন স্থানের সেপটিক ট্যাংক থেকে বিশেষায়িত ভ্যাকুয়াম ট্যাংকারের মাধ্যমে সংগৃহীত মানববর্জ্য এখানে এনে পরিবেশসম্মত উপায়ে শোধন করার কথা। এর মূল লক্ষ্য ছিল খোলা স্থানে বর্জ্য ফেলার প্রবণতা কমিয়ে পরিবেশ ও জনস্বাস্থ্য রক্ষা করা। কিন্তু বাস্তবে সেখানে বর্জ্য এনে শুধু স্তূপ করে রাখা হচ্ছে।

প্রকল্পটির পূর্ণ সুফল পেতে বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে পচনশীল ও অপচনশীল বর্জ্য আলাদা করার আধুনিক যন্ত্রপাতির অভাব। একই সঙ্গে প্রয়োজনীয় কারিগরি জনবল না থাকায় বর্জ্য ব্যবস্থাপনা কার্যক্রম কাঙ্ক্ষিত পর্যায়ে পৌঁছাতে পারছে না।

ছবি: এশিয়া পোস্ট
ছবি: এশিয়া পোস্ট

স্থানীয় বাসিন্দারা প্রকল্পটির বর্তমান অবস্থা নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন। শহরের বাদিয়ার মোড় এলাকার বাসিন্দা আজিজুল ইসলাম বলেন, এখানে যে ময়লাগুলো এনে ফেলা হয়, সেগুলো পরিশোধন করার কথা থাকলেও তা কখনোই করা হয়নি। এখন এটি কেবলই ময়লার স্তূপ হয়ে পড়ে আছে।

আরেক বাসিন্দা রাকিব হোসেন বলেন, এখানে ময়লা থেকে জৈব সার তৈরি করার কথা ছিল, কিন্তু কোনো কিছুই করা হচ্ছে না। উল্টো এটি এখন একটি বিশাল ময়লার ভাগাড়ে পরিণত হয়েছে এবং এর দুর্গন্ধ চারপাশের এলাকায় ছড়াচ্ছে।

নীলফামারী পৌরসভার কঞ্জারভেন্সি অফিসার আব্বাস আলী বলেন, ডাম্পিং স্টেশন নির্মাণের পর থেকেই সেখানে বর্জ্য ফেলা হচ্ছে। শুরুতে কয়েকজন নারী শ্রমিক হাত দিয়ে প্লাস্টিক আলাদা করার কাজ করতেন। কিন্তু বিভিন্ন ধরনের মিশ্র বর্জ্য থেকে হাত দিয়ে প্লাস্টিক পৃথক করা অত্যন্ত কঠিন ও ঝুঁকিপূর্ণ। এই কাজের জন্য আধুনিক যন্ত্রপাতি জরুরি।

পৌরসভার জামাদার বিপ্লব হোসেন জানান, বর্তমানে সব ধরনের বর্জ্য একসঙ্গে আসায় দ্রুত ডাম্পিং এলাকাটি ভরে যাচ্ছে। বর্জ্য পৃথক করা গেলে পচনশীল অংশ থেকে জৈবসার উৎপাদনের পাশাপাশি আয় করা সম্ভব হতো।

পৌরসভার নির্বাহী কর্মকর্তা তারিক রেজা বলেন, পচনশীল ও অপচনশীল বর্জ্য সফলভাবে আলাদা করা গেলে পচনশীল অংশ থেকে উন্নত মানের জৈবসার উৎপাদন সম্ভব। এতে যেমন কৃষিতে এর ব্যবহার বাড়বে, তেমনি পৌরসভার জন্য তৈরি হবে নতুন আয়ের উৎস।

ছবি: এশিয়া পোস্ট
ছবি: এশিয়া পোস্ট

নীলফামারী পৌরসভার প্রশাসক সাইদুল ইসলাম বলেন, বর্জ্য রিসাইক্লিংয়ের উদ্দেশ্যে প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করা হলেও প্রয়োজনীয় লোকবল ও আধুনিক মেশিনারিজের অভাবে প্রত্যাশিত ফল পাওয়া যাচ্ছে না। সংগৃহীত বর্জ্যের প্রায় ৯৫ শতাংশই প্লাস্টিক হওয়ায় সেগুলো ম্যানুয়ালি (হাত দিয়ে) আলাদা করা অত্যন্ত ব্যয়বহুল এবং শ্রমসাপেক্ষ বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে।

সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞদের মতে, দ্রুত প্রয়োজনীয় আধুনিক যন্ত্রপাতি ও দক্ষ কারিগরি জনবল নিশ্চিত করা গেলে নীলফামারীর এই এফএসটিপি শুধু পরিবেশ সুরক্ষাই করবে না, বরং জৈবসার উৎপাদন ও বর্জ্য ব্যবস্থাপনা থেকে সরকারের রাজস্ব আয়েও বড় ভূমিকা রাখবে।