ভাগাড়ে পরিণত বংশ খাল, বাড়ছে স্বাস্থ্যঝুঁকি

একসময় জামালপুর শহরের প্রাণ হিসেবে পরিচিত ছিল বংশ খাল। শহরের পানি নিষ্কাশন, পরিবেশের ভারসাম্য এবং মানুষের দৈনন্দিন জীবনের সঙ্গে জড়িয়ে থাকা এই খাল এখন পরিণত হয়েছে ময়লা-আবর্জনার বিষাক্ত ভাগাড়ে। কালো পচা পানি, অসহনীয় দুর্গন্ধ আর মশা-মাছির উৎপাতে অতিষ্ঠ হয়ে উঠেছেন খালপাড়ের বাসিন্দারা। স্থানীয়দের আশঙ্কা, দ্রুত ব্যবস্থা না নিলে ডেঙ্গু, চিকুনগুনিয়া ও নানা সংক্রামক রোগ ভয়াবহ আকার নিতে পারে।
শহরের গেটপাড়া, মালগুদাম, মৃধাপাড়া, মুকুন্দবাড়ি, দয়াময়ী মোড়, রানীগঞ্জ বাজার হয়ে কালীঘাট দিয়ে ব্রহ্মপুত্র নদে মিশেছে এই বংশ খালটি। কিন্তু বর্তমানে খালের অধিকাংশ অংশজুড়ে জমে আছে প্লাস্টিক, পলিথিন, গৃহস্থালির বর্জ্য এবং বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের ফেলা ময়লা। দীর্ঘদিন পরিষ্কার না করায় পানির স্বাভাবিক প্রবাহ বন্ধ হয়ে গেছে। স্থির হয়ে থাকা পানি কালো রঙ ধারণ করেছে, তার ওপর ভাসছে পচা আবর্জনার স্তূপ।
সরেজমিনে দেখা যায়, খালের দুই পাশে গড়ে ওঠা বাসাবাড়ি, হোটেল-রেস্তোরাঁ, বেসরকারি হাসপাতাল, ক্লিনিক ও ডায়াগনস্টিক সেন্টার থেকে নিয়মিত বর্জ্য ফেলা হচ্ছে এই খালে। কোথাও কোথাও ময়লার স্তূপ এতটাই বড় হয়েছে যে খালের অস্তিত্বই চোখে পড়ে না। খালের ধারে দাঁড়ানোই কঠিন হয়ে পড়েছে দুর্গন্ধের কারণে। চারদিকে উড়ছে মাছি, জন্ম নিচ্ছে মশার লার্ভা। সামান্য নালা দিয়ে প্রতিদিন যতটুকু পানি যাচ্ছে, সেই বিষাক্ত পানি নদীতে গিয়ে মিশছে।
২০০৭ সালে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময় খালটি দখলমুক্ত ও সংস্কারের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল। সে সময় খালের তলদেশে আরসিসি ঢালাই করে পানি প্রবাহের ব্যবস্থা করা হয় এবং দুই পাশে গাইড ওয়াল নির্মাণ করা হয়। কিন্তু পরে নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে সেই উদ্যোগও কার্যত ভেস্তে যায়।
রানীগঞ্জ বাজার এলাকার বাসিন্দা নজরুল ইসলাম বলেন, একসময় খালটি পরিষ্কার ছিল। এখন সারাদিন দুর্গন্ধ ছড়ায়। যে যার মতো ময়লাগুলো খালে ফেলে দিচ্ছে। সন্ধ্যা হলেই মশার আক্রমণে এই দিক দিয়ে যাওয়া যায় না।
স্থানীয় ব্যবসায়ী কামরুল ইসলাম বলেন, খালের নোংরা পানি আর দুর্গন্ধে ব্যবসা পরিচালনা করাই কঠিন হয়ে গেছে। বর্ষাকালে খাল দিয়ে পানি না যেতে পেরে রাস্তায় উঠে পড়ে। এখানে আমাদের থাকা খুব কষ্ট হয়ে উঠছে।
স্থানীয় বাসিন্দা তানিয়া বলেন, খালটির অবস্থা দিনদিন খারাপ হচ্ছে। দুর্গন্ধে দরজা-জানালা খুলে রাখা যায় না। বাচ্চাদের নিয়ে সবসময় চিন্তায় থাকতে হয়। খালটি পরিষ্কার করার জন্য কোনো উদ্যোগ নেই। দ্রুত খালটি পরিষ্কার না করলে রোগবালাই আরও বেড়ে যাবে।
জামালপুর জেলা পরিবেশ রক্ষা আন্দোলন কমিটির সভাপতি জাহাঙ্গীর সেলিম এশিয়া পোস্টকে বলেন, বংশ খাল একসময় জামালপুর শহরের প্রাণ ছিল। শহরের পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থা সচল রাখা, পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষা এবং জলাবদ্ধতা নিরসনে এই খালের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা ছিল। কিন্তু দীর্ঘদিনের অব্যবস্থাপনা, দখল ও অপরিকল্পিত বর্জ্য ফেলার কারণে খালটি আজ অস্তিত্ব সংকটে পড়েছে।
তিনি বলেন, শহরের বিভিন্ন বাসাবাড়ি, ব্যবসা প্রতিষ্ঠান, হাসপাতাল ও ক্লিনিকের বর্জ্য সরাসরি খালে ফেলা হচ্ছে। ফলে পানির স্বাভাবিক প্রবাহ বন্ধ হয়ে গিয়ে খালটি এখন ময়লার ভাগাড়ে পরিণত হয়েছে। এটি শুধু পরিবেশ দূষণের বিষয় নয়, জনস্বাস্থ্যের জন্যও মারাত্মক হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে। দূষিত পানি ও আবর্জনা থেকে মশা-মাছির বিস্তার ঘটছে, যা ডেঙ্গু ও চিকুনগুনিয়াসহ বিভিন্ন রোগের ঝুঁকি বাড়াচ্ছে। দ্রুত খালটি পরিষ্কার, অবৈধ দখলমুক্ত এবং নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণের উদ্যোগ না নিলে ভবিষ্যতে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হতে পারে।
জামালপুরের সিভিল সার্জন ডা. মো. আজিজুল হক বলেন, জমে থাকা দূষিত পানিতে মশার লার্ভা দ্রুত জন্ম নেয়, যা ডেঙ্গু ও চিকুনগুনিয়ার ঝুঁকি বাড়ায়। পাশাপাশি দূষিত পরিবেশ থেকে ডায়রিয়া, চর্মরোগসহ বিভিন্ন রোগ ছড়িয়ে পড়তে পারে।
জামালপুর পৌরসভার নির্বাহী কর্মকর্তা মো. হাফিজুর রহমান এশিয়া পোস্টকে বলেন, খাল থেকে আবর্জনা অপসারণ এবং পানির প্রবাহ স্বাভাবিক করতে পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। পর্যায়ক্রমে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা বাস্তবায়ন করা হবে।





