প্রতিদিনের ৭ অভ্যাসের কারণেই বাড়তে পারে ডায়াবেটিসের ঝুঁকি

এশিয়া পোস্ট ডেস্ক
প্রতিদিনের ৭ অভ্যাসের কারণেই বাড়তে পারে ডায়াবেটিসের ঝুঁকি
ছবি : সংগৃহীত

ডায়াবেটিস এখন বিশ্বের অন্যতম সাধারণ দীর্ঘমেয়াদি রোগ। অনেকেই মনে করেন, শুধু বংশগত কারণেই ডায়াবেটিস হয়। কিন্তু বাস্তবতা হলো, বয়স বা পারিবারিক ইতিহাসের পাশাপাশি আমাদের প্রতিদিনের কিছু অভ্যাসও এই রোগের ঝুঁকি অনেকটাই বাড়িয়ে দিতে পারে।

Advertisement

সুখবর হলো, জীবনযাত্রায় ছোট কিছু পরিবর্তন এনে এই ঝুঁকি অনেকাংশে কমানো সম্ভব। চলুন জেনে নেওয়া যাক এমন ৭টি দৈনন্দিন অভ্যাস সম্পর্কে, যেগুলো অজান্তেই ডায়াবেটিসের ঝুঁকি বাড়াতে পারে।

নিয়মিত সকালের নাশতা না খাওয়া

অনেকেই ওজন কমানোর আশায় বা সময়ের অভাবে সকালের নাশতা এড়িয়ে যান। কিন্তু এটি শরীরের জন্য ভালো অভ্যাস নয়।

গবেষণায় দেখা গেছে, যারা নিয়মিত সকালের নাশতা বাদ দেন, তাদের মধ্যে টাইপ-২ ডায়াবেটিস হওয়ার ঝুঁকি তুলনামূলক বেশি। এর একটি বড় কারণ হলো, নাশতা না খেলে দিনের পরের সময়গুলোতে অতিরিক্ত খাওয়ার প্রবণতা তৈরি হয়। এতে ক্যালোরি গ্রহণ বেড়ে যায় এবং ওজনও বাড়তে পারে।

সকালের খাবারে ডিম, দই, বাদাম, ফল, ওটস বা আটার রুটি রাখতে পারেন। প্রোটিন ও আঁশসমৃদ্ধ খাবার দীর্ঘ সময় পেট ভরা রাখতে সাহায্য করে।

একটানা অনেকক্ষণ বসে থাকা

প্রতিদিন ব্যায়াম করলেও যদি দিনের বেশির ভাগ সময় বসে কাটান, তাহলে সেটিও ডায়াবেটিসের ঝুঁকি বাড়াতে পারে।

দীর্ঘ সময় বসে থাকলে শরীরের ইনসুলিন সংবেদনশীলতা কমে যেতে পারে। ফলে রক্তে শর্করার মাত্রা নিয়ন্ত্রণ করা কঠিন হয়ে পড়ে।

বিশেষজ্ঞরা পরামর্শ দেন, প্রতি ৩০ মিনিট পরপর অন্তত ২ থেকে ৫ মিনিট হাঁটুন বা কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে শরীর নড়াচড়া করুন। অফিসে কাজের মাঝেও ছোট বিরতি নেওয়ার অভ্যাস গড়ে তুলুন।

অতিরিক্ত অ্যালকোহল পান করা

পরিমিত পরিমাণে অ্যালকোহল গ্রহণ নিয়ে বিভিন্ন গবেষণায় ভিন্ন ভিন্ন ফল পাওয়া গেলেও অতিরিক্ত অ্যালকোহল পান যে ক্ষতিকর, সে বিষয়ে বিশেষজ্ঞরা একমত।

অতিরিক্ত অ্যালকোহল শরীরে অতিরিক্ত ক্যালোরি যোগ করে, ওজন বাড়ায় এবং অগ্ন্যাশয়ের স্বাভাবিক কার্যক্রমে প্রভাব ফেলতে পারে। এর ফলে ইনসুলিন উৎপাদন ব্যাহত হওয়ার ঝুঁকি থাকে।

যারা অ্যালকোহল পান করেন, তাদের অবশ্যই পরিমিত মাত্রা মেনে চলা উচিত।

পর্যাপ্ত ঘুম না হওয়া

রাতের পর রাত কম ঘুমানো শুধু ক্লান্তিই বাড়ায় না, এটি ডায়াবেটিসের ঝুঁকিও বাড়াতে পারে।

ঘুমের ঘাটতি হলে শরীরে কর্টিসলসহ বিভিন্ন স্ট্রেস হরমোনের মাত্রা বেড়ে যায়। এতে রক্তে শর্করার পরিমাণ বাড়তে পারে। একই সঙ্গে ক্ষুধাও বেড়ে যায়, বিশেষ করে মিষ্টি ও উচ্চ কার্বোহাইড্রেটযুক্ত খাবারের প্রতি আকর্ষণ বৃদ্ধি পায়।

প্রতিদিন অন্তত ৭ থেকে ৯ ঘণ্টা ভালো মানের ঘুম নিশ্চিত করার চেষ্টা করুন।

ধূমপান

ধূমপান শুধু ফুসফুস বা হৃদ্‌যন্ত্রের ক্ষতি করে না, এটি ডায়াবেটিসের ঝুঁকিও বাড়ায়।

গবেষণায় দেখা গেছে, ধূমপায়ীদের টাইপ-২ ডায়াবেটিস হওয়ার ঝুঁকি অধূমপায়ীদের তুলনায় উল্লেখযোগ্যভাবে বেশি। যারা বেশি ধূমপান করেন, তাদের ঝুঁকিও আরও বেশি।

ধূমপান ছাড়ার মাধ্যমে শুধু ডায়াবেটিস নয়, আরও অনেক গুরুতর রোগের ঝুঁকি কমানো সম্ভব।

অতিরিক্ত প্রক্রিয়াজাত খাবার খাওয়া

চিপস, প্যাকেটজাত স্ন্যাকস, প্রক্রিয়াজাত মাংস, ইনস্ট্যান্ট নুডলস, ফ্রোজেন খাবার বা অতিরিক্ত চিনি ও লবণযুক্ত খাবার নিয়মিত খেলে ডায়াবেটিসের ঝুঁকি বাড়তে পারে।

এসব খাবারে সাধারণত ক্যালোরি বেশি থাকে, কিন্তু আঁশ ও প্রয়োজনীয় পুষ্টি কম থাকে। ফলে সহজেই অতিরিক্ত খাওয়া হয়ে যায় এবং ওজন বাড়তে শুরু করে।

খাদ্যতালিকায় বেশি করে তাজা শাকসবজি, ফল, ডাল, পূর্ণ শস্য ও প্রাকৃতিক খাবার রাখার চেষ্টা করুন।

একাকিত্ব ও সামাজিক বিচ্ছিন্নতা

শুধু শরীর নয়, মানসিক স্বাস্থ্যও ডায়াবেটিসের সঙ্গে সম্পর্কিত।

গবেষণায় দেখা গেছে, যারা দীর্ঘ সময় একাকিত্ব অনুভব করেন, তাদের মধ্যে টাইপ-২ ডায়াবেটিসের ঝুঁকি তুলনামূলক বেশি হতে পারে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, মানসিক চাপ, উদ্বেগ ও দীর্ঘস্থায়ী একাকিত্ব শরীরের হরমোনের ভারসাম্যে প্রভাব ফেলতে পারে, যা রক্তে শর্করা নিয়ন্ত্রণের ওপরও প্রভাব ফেলে।

তাই পরিবার, বন্ধু বা প্রিয়জনদের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ রাখা মানসিক সুস্থতার পাশাপাশি শারীরিক স্বাস্থ্যের জন্যও গুরুত্বপূর্ণ।

ডায়াবেটিসের ঝুঁকি কমাতে কী করবেন?

কিছু সহজ অভ্যাস আপনাকে দীর্ঘমেয়াদে সুস্থ থাকতে সাহায্য করতে পারে।

  • প্রতিদিন স্বাস্থ্যকর সকালের নাশতা করুন।
  • প্রতি আধা ঘণ্টা পরপর কিছুক্ষণ হাঁটুন বা দাঁড়িয়ে নড়াচড়া করুন।
  • নিয়মিত ব্যায়াম করুন।
  • পর্যাপ্ত ঘুম নিশ্চিত করুন।
  • ধূমপান থেকে দূরে থাকুন।
  • প্রক্রিয়াজাত খাবারের বদলে প্রাকৃতিক ও পুষ্টিকর খাবার বেছে নিন।
  • পরিবার ও বন্ধুদের সঙ্গে সময় কাটান এবং মানসিক চাপ নিয়ন্ত্রণে রাখুন।

ডায়াবেটিস একদিনে তৈরি হয় না। দীর্ঘদিনের ছোট ছোট অভ্যাস ধীরে ধীরে এর ঝুঁকি বাড়িয়ে দিতে পারে। তাই সুস্থ জীবনযাপনের জন্য প্রতিদিনের অভ্যাসগুলোর দিকে নজর দেওয়া জরুরি।

স্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস, নিয়মিত শারীরিক পরিশ্রম, পর্যাপ্ত ঘুম এবং মানসিক সুস্থতা বজায় রাখলে শুধু ডায়াবেটিস নয়, হৃদ্‌রোগসহ আরও অনেক দীর্ঘমেয়াদি রোগের ঝুঁকিও কমানো সম্ভব।

সূত্র: এএআরপি