সরকার জায়গা দিলে শিশু হৃদরোগীদের জন্য হাসপাতাল গড়া সম্ভব: ডা. নুরুন্নাহার ফাতেমা

এশিয়া পোস্ট প্রতিবেদক
সরকার জায়গা দিলে শিশু হৃদরোগীদের জন্য হাসপাতাল গড়া সম্ভব: ডা. নুরুন্নাহার ফাতেমা
ছবি : এশিয়া পোস্ট

দেশে জন্মগত হৃদরোগে আক্রান্ত শিশুদের চিকিৎসা আরও সহজলভ্য করতে বিশেষায়িত শিশু হৃদরোগ হাসপাতাল প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ নিয়েছে চাইল্ড হার্ট ট্রাস্ট বাংলাদেশ (সিএইচটি)।

Advertisement

একই সঙ্গে শিশু হৃদরোগ শনাক্তকরণ, চিকিৎসা ও রেফারেল ব্যবস্থাকে জাতীয় পর্যায়ে সুসংহত করতে সরকারের সঙ্গে সমন্বয়ের মাধ্যমে একটি জাতীয় গাইডলাইন তৈরিরও পরিকল্পনা করছে সিএইচটি।

শুক্রবার (২৬ জুন) রাজধানীর মিরপুরে ট্রাস্টের ১২তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলক্ষে আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে এসব পরিকল্পনার কথা তুলে ধরেন সিএইচটির প্রেসিডেন্ট ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) অধ্যাপক ডা. নুরুন্নাহার ফাতেমা।

অনুষ্ঠানে নিয়মিত কার্যক্রমের অংশ হিসেবে ফ্রি ফ্রাইডে ক্লিনিকের মাধ্যমে জন্মগত হৃদরোগে আক্রান্ত শিশুদের বিনামূল্যে চিকিৎসা পরামর্শ, ফলোআপ ও স্বাস্থ্য পরীক্ষা করা হয়।

এ সময় অধ্যাপক ডা. নুরুন্নাহার ফাতেমা বলেন, দীর্ঘদিন ধরে নিজেদের ব্যক্তিগত অর্থ, জাকাত, বন্ধু-স্বজনের অনুদান এবং স্বেচ্ছাসেবী উদ্যোগে ট্রাস্টটি পরিচালিত হয়েছে। ভবিষ্যতের লক্ষ্য একটি আন্তর্জাতিক মানের শিশু হৃদরোগ হাসপাতাল প্রতিষ্ঠা করা। এ জন্য জায়গা খোঁজা হচ্ছে এবং সরকারি বিভিন্ন সুযোগ-সুবিধার বিষয়েও অনুসন্ধান চলছে।

তিনি আরও বলেন, সরকারি অনেক পরিত্যক্ত ভবন ও জায়গা রয়েছে। সরকার যদি এ ধরনের কোনো স্থাপনা ব্যবহারের সুযোগ দেয়, তাহলে সেখানে এমন একটি হাসপাতাল গড়ে তোলা সম্ভব হবে, যেখানে সচ্ছল রোগীরাও অর্থের বিনিময়ে চিকিৎসা নেবেন। সেই অর্থ দিয়ে দরিদ্র শিশুদের বিনামূল্যে চিকিৎসা নিশ্চিত করা যাবে। এতে হাসপাতালটি আর্থিকভাবে টেকসইও হবে।

দেশে শিশুদের জন্য এখনো কোনো বিশেষায়িত সরকারি হৃদরোগ হাসপাতাল নেই জানিয়ে এই বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক বলেন, যদিও সরকারের শিশুস্বাস্থ্য কর্মসূচিতে ছয়টি রোগকে অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে। জন্মগত হৃদরোগ সেখানে অন্তর্ভুক্ত হয়নি। সরকারের ইন্টিগ্রেটেড ম্যানেজমেন্ট অব চাইল্ডহুড ইলনেস (আইএমসিআই) কর্মসূচির আওতায় যদি জন্মগত হৃদরোগ অন্তর্ভুক্ত করা হয়, তাহলে ইউনিয়ন ও গ্রাম পর্যায়ের স্বাস্থ্যকর্মীরাও প্রাথমিকভাবে রোগ শনাক্ত করে দ্রুত বিশেষায়িত কেন্দ্রে রেফার করতে পারবেন। এতে অনেক শিশুর জীবন রক্ষা করা সম্ভব হবে।

প্রখ্যাত এই চিকিৎসক আরও বলেন, বর্তমানে প্রাপ্তবয়স্কদের হৃদরোগ সম্পর্কে সচেতনতা ও জীবনযাত্রার পরিবর্তনের কারণে কিছুটা নিয়ন্ত্রণে এলেও জন্মগত হৃদরোগের সংখ্যা বাড়ছে। ভবিষ্যতে এ রোগই বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠতে পারে। উন্নত দেশগুলোতে গর্ভাবস্থার ১১ থেকে ১২ সপ্তাহের মধ্যেই উন্নত প্রযুক্তির মাধ্যমে জটিল জন্মগত হৃদরোগ শনাক্ত করা সম্ভব হচ্ছে। অনেক ক্ষেত্রে জন্মের আগেই প্রয়োজনীয় চিকিৎসা পরিকল্পনা নেওয়া হয়। কিন্তু বাংলাদেশে অধিকাংশ রোগী তখনই চিকিৎসকের কাছে আসে, যখন রোগ অনেক জটিল হয়ে যায়। জন্মগত হৃদরোগে আক্রান্ত অনেক শিশুর একাধিক অস্ত্রোপচার প্রয়োজন হয়, যা দরিদ্র পরিবারের পক্ষে বহন করা প্রায় অসম্ভব।

অধ্যাপক ডা. নুরুন্নাহার ফাতেমা বলেন, ভবিষ্যতে সরকারের সঙ্গে আলোচনা করে জন্মগত হৃদরোগের চিকিৎসা ব্যবস্থাপনায় একটি জাতীয় গাইডলাইন প্রণয়ন এবং ধাপে ধাপে গ্রাম থেকে রাজধানী পর্যন্ত কার্যকর রেফারেল ব্যবস্থা গড়ে তোলার উদ্যোগ নেওয়া হবে।

অনুষ্ঠানে চাইল্ড হার্ট ট্রাস্ট বাংলাদেশের অন্যতম উদ্যোক্তা মেজর জেনারেল (অব.) অধ্যাপক ডা. মুসা খান বলেন, দেশের সাধারণ মানুষের করের টাকায় চিকিৎসক হওয়ার সুযোগ পেয়েছেন তারা। তাই সমাজের অসহায় মানুষের জন্য কিছু করার দায়বদ্ধতা থেকেই ১২ বছর আগে চাইল্ড হার্ট ট্রাস্ট বাংলাদেশের যাত্রা শুরু হয়। ধীরে ধীরে মানুষের সহযোগিতায় কার্যক্রম বিস্তৃত হয়েছে।

তিনি বলেন, বাংলাদেশের প্রতি এক হাজার নবজাতকের মধ্যে প্রায় ২০ থেকে ২৫ জন জন্মগত হৃদরোগ নিয়ে জন্মায়। কিন্তু তাদের বড় একটি অংশ সময়মতো বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের কাছে পৌঁছাতে পারে না। অনেক শিশুই চিকিৎসাবঞ্চিত থেকে যায়। এই ট্রাস্টের প্রধান লক্ষ্য একটি নিজস্ব শিশু হৃদরোগ হাসপাতাল প্রতিষ্ঠা করা, যেখানে রোগ নির্ণয় থেকে শুরু করে অস্ত্রোপচার ও পরবর্তী চিকিৎসা—সব সেবা একই ছাদের নিচে দেওয়া যাবে।

সমাজের বিত্তবান ব্যক্তি, করপোরেট প্রতিষ্ঠান এবং মানবিক সংগঠনগুলোর প্রতি আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, সবাই এগিয়ে এলে হাজারো অসহায় শিশুর জীবন রক্ষা করা সম্ভব হবে।

অনুষ্ঠানে অন্যদেরে মধ্যে চাইল্ড হার্ট ট্রাস্ট বাংলাদেশ (সিএইচটি) ব্যবস্থাপক মোহাম্মদ মাহবুবুর রহমান ছাড়াও ট্রাস্টের ভাইস প্রেসিডেন্ট, সেক্রেটারি জেনারেল, নির্বাহী কমিটির সদস্য, চিকিৎসকসহ বিভিন্ন পেশার ব্যক্তিরা উপস্থিত ছিলেন।