চিংড়িতে লোকসান, সৌদি খেজুরে মিলল সাফল্য

এশিয়া পোস্ট নিউজ, বাগেরহাট
চিংড়িতে লোকসান, সৌদি খেজুরে মিলল সাফল্য
উদ্যোক্তা জাকির হোসেনের খেজুরের বাগান। ছবি: এশিয়া পোস্ট

চিংড়ি চাষে লোকসানের পর সৌদি আরবের মরুভূমির খেজুর ফলিয়ে অভাবনীয় সাফল্য অর্জন করেছেন বাগেরহাটের রামপালের উদ্যোক্তা অ্যাডভোকেট জাকির হোসেন। ইউটিউব দেখে শুরু করা তার এই ব্যতিক্রমী উদ্যোগটি মাত্র কয়েক বছরের ব্যবধানে এখন একটি সফল বাণিজ্যিক বাগানে পরিণত হয়েছে, যা দেশের উপকূলীয় অঞ্চলের কৃষি অর্থনীতিতে বিকল্প লাভজনক ফসলের এক নতুন সম্ভাবনার দ্বার উন্মোচন করেছে।

Advertisement

রামপাল উপজেলার সন্ন্যাসীর হাজীপাড়া এলাকায় ৩০ বিঘা জমির মাছের ঘেরের বেড়িবাঁধজুড়ে গড়ে তোলা হয়েছে এই ‘রামপাল সৌদি খেজুর বাগান’। বর্তমানে তার বাগানে ছোট-বড় মিলিয়ে প্রায় ৪০০টি সৌদি খেজুরগাছ রয়েছে। আজওয়া, মরিয়ম, সুকারি, আম্বার ও বারহি—এই পাঁচটি উন্নত জাতের খেজুর চাষ করছেন তিনি। ইতোমধ্যে বাগানের প্রায় ৮০টি গাছে ফল এসেছে এবং আগামী বছর আরও ২০০ থেকে ৩০০টি গাছে ফলন আসবে বলে আশা করা হচ্ছে।

শুরুর দিকে অনেকেই লোনা মাটিতে সৌদি খেজুর চাষের ভবিষ্যৎ নিয়ে সংশয় প্রকাশ করলেও সেই ধারণাকে ভুল প্রমাণ করেছেন জাকির হোসেন। এখন তার বাগানে প্রতিদিনই বিভিন্ন জেলা থেকে কৃষক, উদ্যোক্তা ও দর্শনার্থীরা আসছেন এই খেজুর চাষ কাছ থেকে দেখতে এবং পরামর্শ নিতে।

ছবি: এশিয়া পোস্ট
ছবি: এশিয়া পোস্ট

দশানি থেকে বাগান দেখতে আসা শাহিন শেখ বলেন, সৌদি আরবের খেজুর যে আমাদের দেশের মাটিতে, তাও আবার বাগেরহাটের মতো উপকূলীয় এলাকায় এভাবে ফলতে পারে, তা আগে কখনও ভাবিনি। বাগানটি ঘুরে দেখে সত্যিই মুগ্ধ হয়েছি। এ ধরনের উদ্যোগ ছড়িয়ে পড়লে দেশের মানুষ দেশেই উন্নতমানের খেজুর পাবে।

স্থানীয় বাসিন্দা অয়ন খান বলেন, জাকির ভাইয়ের এই উদ্যোগ আমাদের জন্য গর্বের। শুরুতে অনেকে তাকে নিরুৎসাহিত করলেও তিনি থেমে যাননি। এখন তার সফলতা দেখে এলাকার অনেক তরুণ খেজুর চাষে আগ্রহী হচ্ছেন। আমিও ভবিষ্যতে এই চাষ করার পরিকল্পনা করছি।

স্থানীয় কৃষক আব্দুল মালেক শেখ বলেন, আমরা এতদিন মনে করতাম লোনা জমিতে শুধু চিংড়ি বা কিছু সীমিত ফসলই করা সম্ভব। কিন্তু জাকির হোসেনের সৌদি খেজুর বাগান দেখে সেই ধারণা বদলে গেছে। তার সফলতা আমাদের নতুন করে ভাবতে শিখিয়েছে। কৃষি বিভাগের সহযোগিতা পেলে আমরাও এই খেজুর চাষ শুরু করতে চাই। এতে একদিকে যেমন আয় বাড়বে, অন্যদিকে উপকূলীয় এলাকায় নতুন একটি লাভজনক কৃষিখাত গড়ে উঠবে।

খামারের তত্ত্বাবধায়ক রেজাউল তরকদার বলেন, খেজুরগাছের নিয়মিত পরিচর্যা করলেই ভালো ফলন পাওয়া যায়। জৈব সার প্রয়োগ, সময়মতো স্প্রে, আগাছা পরিষ্কার এবং ফল পাকার সময় কাগজ বা নেট দিয়ে ঢেকে রাখতে হয়। সবচেয়ে বড় সমস্যা গণ্ডার পোকা। এ পোকার আক্রমণে গাছ মারা যেতে পারে। তাই নিয়মিত নজরদারি ও প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে হয়।

উদ্যোক্তা অ্যাডভোকেট জাকির হোসেন বলেন, ২০১৪ সালে চিংড়ি মাছ চাষ শুরু করলেও লবণাক্ততার কারণে কাঙ্ক্ষিত লাভ হয়নি। পরে ইউটিউবে সৌদি খেজুর চাষ সম্পর্কে দেখে আগ্রহ তৈরি হয়। ২০১৯ সালে ভালুকা থেকে ৬০টি কলমের চারা এনে রোপণ করি। আজ আমার বাগানে প্রায় ৪০০টি গাছ রয়েছে। ফলনের পাশাপাশি নার্সারিতে মানসম্মত চারা উৎপাদনও করছি। আগামী বছর থেকে বাণিজ্যিকভাবে খেজুর ও চারা বিক্রির পরিধি আরও বাড়ানোর পরিকল্পনা রয়েছে।

ছবি: এশিয়া পোস্ট
ছবি: এশিয়া পোস্ট

নতুন উদ্যোক্তাদের পরামর্শ দিয়ে তিনি বলেন, নতুন যারা খেজুর চাষ করতে চান, তারা অবশ্যই কলমের (অফশুট) চারা ব্যবহার করবেন। বীজের চারার বেশিরভাগই পুরুষ গাছে পরিণত হয়, ফলে ফল পাওয়া যায় না। বর্তমানে আমার খামারে তিনজনের স্থায়ী কর্মসংস্থান হয়েছে। ভবিষ্যতে আরও মানুষের কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি হবে বলে আশা করছি।

বাগেরহাট কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক মো. মোতাহার হোসেন বলেন, উপকূলীয় অঞ্চলের লবণাক্ত জমিতে সৌদি খেজুরের সফল চাষ নিঃসন্দেহে ভালো উদ্যোগ। আমরা বাগানটি পরিদর্শন করে দেখেছি, গাছের বৃদ্ধি ও ফলন সন্তোষজনক। যদি উৎপাদনের এই ধারা বজায় থাকে এবং ফলের গুণগত মান ভালো থাকে, তাহলে এটি উপকূলীয় কৃষিতে একটি সম্ভাবনাময় অর্থকরী ফসল হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হতে পারে। কৃষি বিভাগ সবসময় নতুন প্রযুক্তি ও উদ্ভাবনী কৃষিকে উৎসাহিত করে। জাকির হোসেনের মতো উদ্যোক্তাদের প্রয়োজনীয় কারিগরি পরামর্শ, প্রশিক্ষণ ও সহযোগিতা দেওয়া হচ্ছে, যাতে ভবিষ্যতে আরও কৃষক এ ধরনের চাষে এগিয়ে আসতে পারেন।

কৃষি সংশ্লিষ্টদের মতে, জলবায়ু পরিবর্তন ও লবণাক্ততার কারণে দেশের উপকূলীয় অঞ্চলে প্রচলিত অনেক ফসলের উৎপাদন দিন দিন কমে যাচ্ছে। এমন বাস্তবতায় সৌদি খেজুর চাষ বিকল্প অর্থকরী ফসল হিসেবে গ্রামীণ অর্থনীতিতে নতুন আশার আলো দেখাচ্ছে, যার বাস্তব উদাহরণ জাকির হোসেনের এই খামার।

বিষয় :বাগেরহাট