
শয্যা বাড়িয়ে ২৫০-তে উন্নীত করা হয়েছে শেরপুর জেলা সদর হাসপাতালের সক্ষমতা। সেই সঙ্গে প্রতিদিনই বাড়ছে রোগীর চাপ। তবে রোগীর তুলনায় বাড়েনি চিকিৎসক ও অন্যান্য জনবল। ৮৬টি চিকিৎসক পদের বিপরীতে কর্মরত আছেন মাত্র ২৯ জন, শূন্য রয়েছে ৫৭টি পদ। একইভাবে অন্যান্য ৬৬টি পদের মধ্যে ৪০টিই শূন্য। জনবল সংকটের সঙ্গে প্রয়োজনীয় ওষুধের ঘাটতি ও দালালদের দৌরাত্ম্যের অভিযোগও রয়েছে। ফলে ব্যাহত হচ্ছে হাসপাতালের স্বাভাবিক চিকিৎসাসেবা, ভোগান্তিতে পড়ছেন দূর-দূরান্ত থেকে চিকিৎসা নিতে আসা রোগী ও তাদের স্বজনরা।
হাসপাতাল সূত্রে জানা গেছে, শেরপুর ২৫০ শয্যা জেলা সদর হাসপাতালে তত্ত্বাবধায়কসহ চিকিৎসকের অনুমোদিত পদ রয়েছে ৮৬টি। ৫৭টি শূন্য পদ দীর্ঘদিন ধরে খালি পড়ে আছে। ১০টি সিনিয়র কনসালটেন্ট পদের বিপরীতে কর্মরত নেই একজনও। ১৪টি জুনিয়র কনসালটেন্ট পদের বিপরীতে কর্মরত আছেন চারজন। দুইটি আবাসিক মেডিকেল অফিসার পদের বিপরীতে একজন এবং ২৮টি সহকারী সার্জন পদের বিপরীতে কর্মরত আছেন মাত্র ছয়জন। এছাড়া ৯টি সহকারী রেজিস্ট্রার পদের বিপরীতে কর্মরত পাঁচজন। তিনটি অ্যানেসথেসিয়া বিশেষজ্ঞ পদের একটিও পূরণ হয়নি। আটটি ইমার্জেন্সি মেডিকেল অফিসার পদের বিপরীতে কর্মরত আছেন মাত্র দুজন। তবে পাঁচটি মেডিকেল অফিসার পদের মধ্যে চারটি পূরণ হয়েছে। ডেন্টাল সার্জন, প্যাথলজিস্ট ও রেডিওলজিস্ট পদে একজন করে চিকিৎসক কর্মরত আছেন। সব মিলিয়ে চিকিৎসক পদে কর্মরত ২৯ জন।
শুধু চিকিৎসক পদেই নয়, অন্যান্য পদেও জনবল সংকট রয়েছে। ৬৬টি অনুমোদিত পদের বিপরীতে কর্মরত আছেন মাত্র ২৬ জন। শূন্য রয়েছে ৪০টি পদ। ফলে জনবল সংকটে হাসপাতালের স্বাভাবিক কার্যক্রম পরিচালনা করতে হিমশিম খেতে হচ্ছে কর্তৃপক্ষকে।
জানা গেছে, শেরপুর জেলার প্রায় ১৬ লাখ মানুষের পাশাপাশি ময়মনসিংহের হালুয়াঘাট এবং জামালপুরের ইসলামপুর ও বকশীগঞ্জের একাংশের মানুষের চিকিৎসার অন্যতম প্রধান ভরসা এই হাসপাতাল। এখানে প্রতিদিন গড়ে ৬০০ থেকে ৭০০ রোগী বহির্বিভাগে চিকিৎসা নিতে আসেন। আর ভর্তি থাকেন গড়ে ২৬০ থেকে ২৮০ জন রোগী।
রোগী ও স্বজনদের অভিযোগ, হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে এসে প্রথমেই দীর্ঘ লাইনে দাঁড়িয়ে টিকিট সংগ্রহ করতে হয়। এরপর চিকিৎসকের কক্ষের সামনে অপেক্ষা করতে হয় ঘণ্টার পর ঘণ্টা। চিকিৎসকের পরামর্শ পাওয়ার পরও প্রয়োজনীয় অনেক ওষুধ হাসপাতাল থেকে পাওয়া যায় না। ফলে বাইরে থেকে ওষুধ কিনতে গিয়ে বাড়তি টাকা দিতে হচ্ছে দরিদ্র ও নিম্নআয়ের রোগীদের। এছাড়া হাসপাতালকে ঘিরে দালালদের দৌরাত্ম্য নিয়েও রয়েছে নানা অভিযোগ। রোগীদের বিভিন্ন বেসরকারি ক্লিনিক, ডায়াগনস্টিক সেন্টার ও ফার্মেসিতে নেওয়ার জন্য দালালরা সক্রিয় থাকে বলে অভিযোগ তাদের। এতে চিকিৎসাসেবা নিতে এসে আরও বিড়ম্বনায় পড়ছেন তারা।
বুকের ব্যাথা নিয়ে শ্রীবরদী থেকে চিকিৎসাসেবা নিতে আসা রোগী হাজেরা বেগম বলেন, আমি গেরাম থাইক্যা আইছি। সহাল থাইক্যা বইসা আছি, ডাক্তর (চিকিৎসক) দেখাইতে অনেক দেরি অইতাছে। ওষুধও সব দেয় না। কইছে বাইর থাইক্যা কিনা আনতে। এখন আপনারাই কন আমরাতো গরিব মানুষ, এত টেকা কই পামু? খুব কষ্ট কইরা কয়ডা টেহা জোগাড় করে গাড়ি ভাড়া দিয়ে এইখানে আইছিলাম। এহন টেহা ছাড়া কোনো কিছুই হইতাছে না।
পাশেই থাকা বকসীগঞ্জ থেকে আসা আরেক রোগী হনুফা আক্তার বলেন, দূর থাইক্যা আইয়া টিকিট লইছি। এরপরও অনেকক্ষণ বইসা থাকতে অইছে। ডাক্তার দেখাইতে দেখাইতে দিন পার অইয়া যায়। হাসপাতাল থাইক্যা সব ওষুধ পাইলে বাইর থাইক্যা কিনতে অইত না। সবাইতো আর কিনবার পাই না। যার টেহা আছে, তারাই কিনবার পাইতাছে।
হাসপাতালের ভর্তি থাকা রোগী লাল মিয়া বলেন, আমি দুইদিন ধরে পাতলা পায়খানা নিয়ে হাসপাতালে ভর্তি আছি। সব বড়ি (ঔষধ) বাইরে থেইক্কা কিনতে হয়েছে। হাসপাতাল থনে দুইডা এটা দিছে। জাগর (যাদের) ক্ষমতা আছে, তারা সবই পায় হাসপাতাল থনে। আমরা গরীব মানুষ, কোন ক্ষমতা নাই, তাই আমরা কিছু পাই না।
রোগীর স্বজন আব্দুল্লাহ বলেন, আমাগোর গেরাম থাইক্যা রোগী নিয়া আইছি। ডাক্তার দেখাইতে অনেক দেরি অইছে। পরে কিছু ওষুধ হাসপাতাল থাইক্যা পাইছি, কিছু বাইর থাইক্যা কিনতে কইছে। গরিব মানুষ, এই খরচ চালানোও কষ্টের।
রোগীর স্বজন রহিম মিয়া বলেন, ডাক্তার খুবি কম। এতো বড় হাসপাতাল ডাক্তার কম থাকলে কি আর চলে? রোগীদের ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা করতে হয়। আবার ডাক্তার পাইলেও সব ধরনের ওষুধ পাওয়া যায় না। সব প্রায় বাইরে থেকেই কিনতে হয়।
এসব বিষয়ে হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়ক ডা. মুহাম্মদ এমরান হোসেন বলেন, জনবল সংকটের বিষয়টি ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানানো হয়েছে। ইতোমধ্যে প্রয়োজনীয় জনবল চেয়ে মন্ত্রণালয়ে চাহিদাপত্র পাঠানো হয়েছে। ইতোমধ্যে দালালদের দৌরাত্ম্য বন্ধে পুলিশের সহযোগিতায় অভিযান চালানো হচ্ছে। রোগীরা যেন সরকারিভাবে বরাদ্দকৃত সব ধরনের ওষুধ পায়, সেটির জন্য কাজ চলছে।
তিনি আরও বলেন, চিকিৎসক ও অন্যান্য জনবলের শূন্য পদ দ্রুত পূরণ, প্রয়োজনীয় ওষুধের সরবরাহ নিশ্চিত এবং দালালদের দৌরাত্ম্য বন্ধের পাশাপাশি হাসপাতালের সেবার মান বাড়াতে ও রোগীদের ভোগান্তি কমাতে বিভিন্ন উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।
