কৃষিমন্ত্রীর এলাকায় কৃষি প্রকল্পে অনিয়মের অভিযোগ

কৃষিপণ্য দীর্ঘদিন সংরক্ষণ করে কৃষকদের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করার লক্ষ্যে সরকারের উদ্যোগে বিতরণ করা ‘ফার্মার্স মিনি কোল্ড স্টোরেজ’ প্রকল্প এখন কুমিল্লার অনেক কৃষকের কাছে আশীর্বাদের বদলে অভিশাপ হয়ে দাঁড়িয়েছে। কৃষিমন্ত্রী আমিন উর রশীদ ইয়াসিন যখন বছরজুড়ে কৃষকদের ফসল সংরক্ষণের পরিকল্পনার কথা ঘোষণা করছেন, ঠিক সেই সময় কুমিল্লার বিভিন্ন এলাকায় স্থাপিত মিনি কোল্ড স্টোরেজে সংরক্ষিত টমেটোসহ বিভিন্ন সবজি কয়েক দিনের মধ্যেই পচে যাওয়ার অভিযোগ উঠেছে।
কৃষকদের অভিযোগ, প্রকল্পটির মূল উদ্দেশ্য ছিল মৌসুমে উৎপাদিত কৃষিপণ্য দীর্ঘ সময় সংরক্ষণ করে পরে ভালো দামে বিক্রির সুযোগ সৃষ্টি করা। কিন্তু বাস্তবে সংরক্ষিত পণ্য দ্রুত নষ্ট হয়ে যাওয়ায় তারা আর্থিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন। একই সঙ্গে প্রকল্প বাস্তবায়নের পর কোনো কারিগরি তদারকি, নিয়মিত মনিটরিং বা সমস্যা সমাধানে কার্যকর উদ্যোগও দেখা যাচ্ছে না।
কৃষকদের দাবি, প্রকল্পের কারিগরি সক্ষমতা, যন্ত্রপাতির মান, স্থাপনের পদ্ধতি এবং অতিরিক্ত অর্থ নেওয়ার অভিযোগ তদন্ত করে দায়ীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে হবে। পাশাপাশি ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের ক্ষতিপূরণ ও কার্যকর সমাধানেরও দাবি জানিয়েছেন তারা।

কুমিল্লা সদর দক্ষিণ ও চান্দিনা উপজেলার একাধিক কৃষক জানান, সরকারি এই কোল্ড স্টোরেজে সবজি সংরক্ষণ করেও কাঙ্ক্ষিত ফল পাচ্ছেন না। কয়েক দিনের মধ্যেই পণ্য নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। ফলে লাভের আশা করতে গিয়ে উল্টো পুঁজি হারাচ্ছেন তারা। এ ছাড়া প্রকল্পটি সম্পূর্ণ সরকারি অর্থায়নে বাস্তবায়নের কথা থাকলেও বিভিন্ন বৈদ্যুতিক সরঞ্জাম কেনার নামে কৃষকদের কাছ থেকে অতিরিক্ত অর্থ নেওয়ার অভিযোগও উঠেছে।
কুমিল্লা সদর দক্ষিণ উপজেলার কৃষক আবদুস সোবহান প্রায় ৫০ বছরের বেশি সময় ধরে কৃষিকাজের সঙ্গে যুক্ত। নতুন কোনো জাত বা প্রযুক্তির খবর পেলেই তিনি কৃষি অফিসে যোগাযোগ করেন। অগ্রগামী কৃষক হিসেবে কৃষি বিভাগের বিভিন্ন প্রদর্শনীও পেয়েছেন তিনি। সম্প্রতি সরকারের মিনি কোল্ড স্টোরেজ প্রকল্পের কথা জানতে পেরে তিনি অনলাইনে আবেদন করে একটি ইউনিট পান। কিন্তু স্থাপনের পর প্রথম মৌসুমেই টমেটো সংরক্ষণ করে বড় ধরনের ক্ষতির মুখে পড়েন।
আবদুস সোবহান বলেন, আট থেকে নয় দিন টমেটো রাখার পর দেখি সব পচে গেছে। পরে বাধ্য হয়ে সব ফেলে দিতে হয়েছে। আমাদের বলা হয়েছিল সবকিছু সরকার দেবে। কিন্তু বিভিন্ন বৈদ্যুতিক সরঞ্জামের কথা বলে আমার কাছ থেকে প্রায় ১২ থেকে ১৫ হাজার টাকা খরচ করানো হয়েছে। কোল্ড স্টোরেজ স্থাপনের পর থেকে কেউ খোঁজও নেয়নি। বারবার পণ্য নষ্ট হচ্ছে, কিন্তু কোনো সমাধান পাচ্ছি না। এই কোল্ড স্টোরেজ এখন আমার গলার কাঁটা হয়ে দাঁড়িয়েছে।
তার ছেলে আক্তার হোসেন বলেন, প্রথমবার টমেটো পচে যাওয়ার পর ভেবেছিলাম হয়তো আমাদের পণ্যেই সমস্যা ছিল। কিন্তু কয়েকদিন আগে একেবারে তাজা টমেটো সংরক্ষণ করেছি। এবারও সেগুলো পচে গেছে। এতে বুঝতে পারছি সমস্যাটা কোল্ড স্টোরেজেই।

একই ধরনের অভিযোগ করেছেন কৃষক আবু আহম্মেদ। তিনি বলেন, মৌসুমে সবজি সংরক্ষণ করেছিলাম, যাতে পরে ভালো দামে বিক্রি করতে পারি। কিন্তু সব পচে গেছে। লাভ তো দূরের কথা, আমাদের মূলধনই শেষ হয়ে গেছে।
চান্দিনা উপজেলার কৃষক শরীফ হোসেন বলেন, সাত দিনের পর থেকেই টমেটো ও অন্যান্য সবজিতে কালো দাগ পড়ে। আমরা যদি দুই মাস সংরক্ষণই করতে না পারি, তাহলে এই কোল্ড স্টোরেজের সুবিধা কোথায়? বিষয়টি সংশ্লিষ্টদের জানিয়েছি। তারা বলেছেন, ২৫ দিনের বেশি রাখলে এমন সমস্যা হতে পারে।
এ বিষয়ে প্রকল্প কর্মকর্তা তালহা জুবায়ের এশিয়া পোস্টকে বলেন, আমরা মাত্রই এমন সমস্যার কথা শুনলাম। বিষয়টি অবশ্যই খতিয়ে দেখা হবে। কোথায় সমস্যা হয়েছে তা তদন্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
কৃষিমন্ত্রী মোহাম্মদ আমিন উর রশীদ ইয়াসিন এশিয়া পোস্টকে বলেন, এ বিষয়টি সম্পর্কে জেনে পরে মন্তব্য করব।





