logo
Advertisement

৪০০ টাকায় মিলছে টাঙ্গুয়ার হাওরে মাছ ধরার ‘ছাড়পত্র’

বিন্দু তালুকদার, সুনামগঞ্জ
৪০০ টাকায় মিলছে টাঙ্গুয়ার হাওরে মাছ ধরার ‘ছাড়পত্র’
হাওরে নৌকা করে ধরা হচ্ছে মাছ। ছবি: সংগৃহীত

মাত্র ৪০০ টাকা দিলেই মিলছে চুক্তি! সেই চুক্তির ওপর ভর করে দেশের দ্বিতীয় রামসার সাইট সুনামগঞ্জের টাঙ্গুয়ার হাওরের অভয়াশ্রমে রাতের অন্ধকারে দেদারসে চলছে অবৈধ মাছ শিকার। দেশের এই অন্যতম প্রধান ‘মাদার ফিশারিজ’ বা দেশি মাছের প্রজননক্ষেত্রে এমন অনিয়ম শুনতে অবিশ্বাস্য হলেও, নিরাপত্তার দায়িত্বে থাকা এক কমিউনিটি গার্ডের সঙ্গে এক চোরা জেলের টাকা লেনদেনের দরকষাকষির একটি ভিডিও এ প্রতিবেদকের হাতে এসেছে।

Advertisement

অনুসন্ধানে জানা যায়, ওই ভিডিওতে অবৈধভাবে মাছ শিকারি চক্রের সদস্য নবির হোসেনের সঙ্গে মোবাইল ফোনে দরদাম করছেন টাঙ্গুয়ার হাওর কেন্দ্রীয় সার্বিক গ্রাম উন্নয়ন সমবায় সমিতির দায়িত্বপ্রাপ্ত কমিউনিটি গার্ড হবিব মিয়া। অভিযুক্ত হবিব মূলত সমিতির বেতনভুক্ত কর্মচারী এবং একই সঙ্গে হাওরের নিরাপত্তার দায়িত্বে থাকা গোলাবাড়ি আনসার ক্যাম্পের সরকারি নৌযানও পরিচালনা করেন।

৪০০ টাকায় অভয়াশ্রমে ঢোকার ছাড়পত্র!

ভিডিওর কথোপকথনে স্পষ্ট শোনা যায়, মধ্যনগর এলাকার জেলে নবির হোসেন তার চক্রের তিনটি ইঞ্জিনচালিত নৌকা নিয়ে রাতে টাঙ্গুয়ার হাওরে খোনা জাল পাতার জন্য হবিব মিয়ার সহযোগিতা চাচ্ছেন। হবিব মিয়ার ছোট ভাই সালমান শাহ (যিনি আগে কমিউনিটি গার্ড ছিলেন, বর্তমানে সৌদি আরব প্রবাসী) এই জেলের কাছে ভাইয়ের নম্বরটি দিয়েছিলেন। কথোপকথনের একপর্যায়ে প্রথম দিকে হবিব মিয়া বিষয়টি অস্বীকার করার চেষ্টা করলেও পরে চিনে ফেলেন। এ সময় প্রতি নৌকার জন্য এক রাতের জন্য ৫০০ টাকা দাবি করেন তিনি। পরে জেলের অনুরোধে ১০০ টাকা কমিয়ে প্রতি নৌকা ৪০০ টাকা করে দেওয়ার বিষয়টি চূড়ান্ত হয় এবং টাকাগুলো ‘বিকাশ’ অ্যাকাউন্টের মাধ্যমে লেনদেনের বিষয়ে আলোচনা হয়। তবে শেষ পর্যন্ত টাকা লেনদেন হয়েছে কি না, তা নিশ্চিত হওয়া যায়নি। স্থানীয় বাসিন্দারা নিশ্চিত করেছেন, ভিডিওর কণ্ঠটি কমিউনিটি গার্ড হবিব মিয়ারই।

উন্নয়ন সংস্থা সিএনআরএস-এর এক কর্মকর্তার কাছেও এই ভিডিওটি পাঠানো হয়েছে। নাম প্রকাশ না করার শর্তে সিএনআরএস-এর এক প্রজেক্ট অফিসার বলেন, ‘হাওরপাড়ের মানুষ যেহেতু এর ওপর নির্ভরশীল, তাই অবৈধ মাছ শিকার বন্ধ হচ্ছে না। তবে হাওরের নিরাপত্তার দায়িত্বে নিয়োজিতদের সঠিক ভূমিকা না থাকার কারণেই মূলত কোর জোনে (অভয়াশ্রম) সবচেয়ে বেশি মাছ শিকার হচ্ছে।’

হাওর বাঁচাতে কয়েক বছরের জন্য ‘লকডাউন’ ঘোষণার দাবি

টাঙ্গুয়ার হাওরপাড়ের জয়পুর গ্রামের পরিবেশকর্মী আহম্মদ কবির এশিয়া পোস্টকে বলেন, ‘হাওরকে রামসার সাইট ঘোষণা করা হলেও অবৈধ মাছ শিকার থেমে নেই। হাওরের কোর জোনের অভয়াশ্রম এলাকার বিলগুলোতে রাতের পাশাপাশি দিনের বেলাতেও বিশাল জাল ফেলে মাছ ধরা হয়। ফলে হাওরে আগের মতো মাছ আর নেই।’

তবে অভিযুক্ত কমিউনিটি গার্ড হবিব মিয়া তার বিরুদ্ধে আনা সব অভিযোগ অস্বীকার করে বলেন, ‘রাতে টাঙ্গুয়ার হাওরে কোনো মাছ ধরা হয় না এবং আমি এসব কাজে জড়িত নই। একটি চক্র আমাকে এই দায়িত্ব থেকে সরানোর জন্য দীর্ঘদিন ধরে ফেসবুকে নানা মিথ্যা তথ্য প্রচার করছে।’

টাঙ্গুয়ার হাওর কেন্দ্রীয় সার্বিক গ্রাম উন্নয়ন সমবায় সমিতির সভাপতি মোস্তফা মিয়া বলেন, ‘কমিউনিটি গার্ড হবিব মিয়ার বিরুদ্ধে এমন কোনো লিখিত অভিযোগ আমরা এখনও পাইনি। তবে চুরি করে মাছ ধরার খবর পেলে আমরা জাল আটকে প্রশাসনের হাতে দেই।’

হাওর ও পরিবেশ নিয়ে কাজ করা সংগঠন ‘হাওর এরিয়া আপলিফমেন্ট সোসাইটি’ (হাউস)-এর নির্বাহী পরিচালক সালেহীন চৌধুরী শুভ এশিয়া পোস্টকে বলেন, ‘অপব্যবস্থাপনা এবং সঠিক নজরদারির অভাবে টাঙ্গুয়ার হাওরের পরিবেশ ও মাছের সবচেয়ে বেশি ক্ষতি হয়েছে। হাওর রক্ষা করতে হলে কয়েক বছরের জন্য একে পুরোপুরি লকডাউন করতে হবে।’

তাহিরপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মেহেদী হাসান মানিক এশিয়া পোস্টকে বলেন, ‘টাকার বিনিময়ে টাঙ্গুয়ার হাওরে রাতে মাছ ধরার কোনো সুযোগ নেই। আনসার বাহিনীর সদস্যরা সার্বক্ষণিক টহল দেয় এবং নিয়মিত অভিযান চালিয়ে জাল ধ্বংস করা হয়। অভিযুক্ত কমিউনিটি গার্ডের বিরুদ্ধে সুনির্দিষ্ট তথ্য পেলে বিষয়টি গুরুত্বের সাথে খতিয়ে দেখে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’

সংকটে রামসার সাইট

সুনামগঞ্জ শহর থেকে প্রায় ৪০ কিলোমিটার দূরে তাহিরপুর ও মধ্যনগর উপজেলা জুড়ে বিস্তৃত এই টাঙ্গুয়ার হাওরের আয়তন ১২ হাজার ৬৫৫ হেক্টর। এই হাওরে ছোট-বড় ১০৯টি বিল রয়েছে, যার মধ্যে প্রধান বিল ৫৪টি। ৭০ বছরের ইজারাপ্রথা বাতিল করে ১৯৯৯ সালে টাঙ্গুয়ার হাওরকে ‘প্রতিবেশগত সংকটাপন্ন এলাকা’ ঘোষণা করা হয় এবং ২০০০ সালে এটি ‘রামসার সাইট’ (আন্তর্জাতিক গুরুত্বের জলাভূমি) হিসেবে স্বীকৃতি পায়। একসময় এখানে চিতল, মহাশোল, নানিন, সরপুঁটি, বাঘাইড় ও রিটাসহ ১৪১ প্রজাতির মাছ থাকলেও চোরাশিকার ও সঠিক রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে বর্তমানে এর সিকিভাগও অবশিষ্ট নেই।