ফার্নিচারের অভাবে আটকে গেল পিরোজপুরের ২৫০ শয্যা হাসপাতালের উদ্বোধন

এশিয়া পোস্ট নিউজ, পিরোজপুর
ফার্নিচারের অভাবে আটকে গেল পিরোজপুরের ২৫০ শয্যা হাসপাতালের উদ্বোধন
পিরোজপুর ২৫০ শয্যা হাসপাতাল। ছবি: এশিয়া পোস্ট

দীর্ঘ প্রতীক্ষার পর গত ৩০ জুন চালু হওয়ার কথা ছিল পিরোজপুরের বহুল প্রত্যাশিত ২৫০ শয্যার আধুনিক জেলা হাসপাতাল। তবে পর্যাপ্ত আসবাবপত্র (ফার্নিচার) ও আনুষঙ্গিক প্রস্তুতি সম্পন্ন না হওয়ায় নির্ধারিত সময়েও হাসপাতালটির উদ্বোধন করা সম্ভব হয়নি। ফলে জেলা ও আশপাশের অঞ্চলের প্রায় ২০ লাখ মানুষের উন্নত চিকিৎসাসেবা পাওয়ার স্বপ্ন আরও একবার পিছিয়ে গেল। বারবার উদ্বোধনের তারিখ পরিবর্তন হওয়ায় স্থানীয় সাধারণ মানুষের মধ্যে তীব্র ক্ষোভ ও হতাশা বিরাজ করছে।

লিফট ছাড়াই চালুর পরিকল্পনাও ভেস্তে গেল

স্বাস্থ্য বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, হাসপাতাল ভবনের লিফট এখনো স্থাপন না হওয়ায় প্রাথমিকভাবে নিচের চারটি তলায় চিকিৎসাসেবা চালুর পরিকল্পনা করা হয়েছিল। সেই লক্ষ্যেই ৩০ জুন সম্ভাব্য উদ্বোধনের তারিখ নির্ধারণ করা হয়। কিন্তু শেষ মুহূর্তে প্রয়োজনীয় ফার্নিচার সময়মতো সরবরাহ না হওয়ায় সেই পরিকল্পনাও আলোর মুখ দেখেনি।

৩১ শয্যা থেকে নয়তলা ভবন: দীর্ঘ প্রতীক্ষার ইতিহাস

১৯৮৪ সালে মাত্র ৩১ শয্যা নিয়ে পিরোজপুর সদর হাসপাতালের যাত্রা শুরু। ১৯৯৭ সালে নির্মিত হয় ৫০ শয্যার নতুন ভবন। ২০০৫ সালে হাসপাতালটি ১০০ শয্যায় উন্নীত করা হয়। ২০১৭ সালে ক্রমবর্ধমান জনসংখ্যা ও চিকিৎসা চাহিদার কথা বিবেচনায় নিয়ে ২৫০ শয্যার আধুনিক হাসপাতাল নির্মাণের উদ্যোগ নেয় সরকার। শুরুতে ৭তলা ভবনের পরিকল্পনা থাকলেও পরে তা ৯তলায় উন্নীত করা হয়।

প্রায় ৭০ কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত হাসপাতালটির মূল অবকাঠামোর কাজ ২০২৪ সালের ডিসেম্বরের মধ্যেই শেষ হয়। তবে লিফট, বিদ্যুৎ সংযোগ এবং অন্যান্য আনুষঙ্গিক কাজ অসম্পূর্ণ থাকায় হাসপাতালটি পুরোপুরি চালু করা যাচ্ছিল না।

গণপূর্ত বিভাগ জানিয়েছে, লিফট পুরোপুরি স্থাপন করতে আরও দুই থেকে তিন মাস সময় লাগবে। সে কারণে জনস্বার্থে লিফট ছাড়াই চারটি তলা চালুর সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছিল, যা ফার্নিচার সংকটে আটকে গেছে।

স্থানীয়দের ক্ষোভ ও দুর্ভোগ

কর্তৃপক্ষের বারবার তারিখ পরিবর্তনের সিদ্ধান্তে চরম অসন্তোষ প্রকাশ করেছেন স্থানীয় বাসিন্দারা। যথাযথ পরিকল্পনার অভাবেই এই পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে বলে তাদের অভিযোগ।

নিকচন আকন নামে এক রোগীর স্বজন বলেন, ‘শুনেছিলাম ৩০ জুনের মধ্যে হাসপাতালটি চালু করা হবে, কিন্তু হলো না। এই পুরানো হাসপাতালে গাদাগাদি করে অনেক রোগীর মাঝে থাকতে আমাদের প্রচণ্ড কষ্ট হচ্ছে। হাসপাতালটি দ্রুত চালু করার দাবি জানাচ্ছি।’

স্থানীয় চিকিৎসা প্রত্যাশী রিয়াজ আহমেদ ও হেলাল উদ্দিন ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, ‘দীর্ঘদিন ধরে এই অঞ্চলের মানুষ আধুনিক চিকিৎসাসেবা থেকে বঞ্চিত। নির্দিষ্ট তারিখ দেওয়ার পরও হাসপাতাল চালু না হওয়ায় তারা চরম নিরাশ হয়েছেন। কর্তৃপক্ষের নজরদারির অভাবে এমনটা হয়েছে উল্লেখ করে তারা গণমাধ্যমের মাধ্যমে বিষয়টি দ্রুত ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের নজরে আনার দাবি জানান।’

কী বলছেন দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তারা

পিরোজপুর গণপূর্ত বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী শহীদুল ইসলাম এশিয়া পোস্টকে বলেন, ‘বিদ্যুৎ সংযোগের কাজ ইতিমধ্যে ঠিক করা হয়েছে। কিছু ফার্নিচার এসেছে, বাকিগুলো আসার প্রক্রিয়ায় রয়েছে। সেগুলো সেটআপ করে আমরা ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের সঙ্গে আলোচনা করে আগামী মাসে একটি নতুন তারিখ নির্ধারণ করবো। ৩০ জুন চালুর একটা সম্ভাব্য ডেট ছিল। তবে আশা করছি আগামী জুলাই মাসের মধ্যেই হাসপাতালের চারটি ফ্লোর উদ্বোধন করা সম্ভব হবে।’

পিরোজপুরের সিভিল সার্জন ডা. মো. মতিউর রহমান এশিয়া পোস্টকে বলেন, ‘গণপূর্ত বিভাগ আমাদের ৩০ জুনের মধ্যে সবকিছু বুঝিয়ে দেওয়ার কথা বলেছিল। কিন্তু ফার্নিচার ও ফাইনাল ফিনিশিংয়ের কিছু কাজ বাকি থাকায় তারা আমাদের কাছে আরও ১৫ দিনের সময় চেয়েছে। এই সময়ের মধ্যে সব ফার্নিচার সরবরাহ করা সম্ভব হবে বলে তারা জানিয়েছে। ফার্নিচার পাওয়া মাত্রই আমরা হাসপাতালটি উদ্বোধনের ব্যবস্থা নেব।’

সিভিল সার্জন আরও উল্লেখ করেন, ‘নতুন ভবনটি চালু হলে চিকিৎসক ও জনবলের তীব্র সংকট দেখা দিতে পারে। বিষয়টি ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের জানানো হয়েছে এবং তারা দ্রুত এই সংকট সমাধানের আশ্বাস দিয়েছেন।’

জুলাইয়ে চালু ও আইসিইউর আশ্বাস প্রতিমন্ত্রীর গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী এবং পিরোজপুর-২ আসনের সংসদ সদস্য আহমেদ সোহেল মঞ্জুর এশিয়া পোস্টকে বলেন, ‘বিগত সরকারের সময় এই নতুন ভবনের অনেক কাজ ফেলে রাখা হয়েছিল। আমরা দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকেই বিষয়টিকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়েছি, যার ফলে এখন ব্যাপক পরিবর্তন এসেছে। আশা করছি জুলাইয়ের মধ্যেই আমরা হাসপাতালের তিনটি ফ্লোর চালু করতে পারবো। আর অক্টোবরের মধ্যে লিফট চলে আসলে সেটিও চালু করা হবে।’

তিনি আরও জানান, ‘বিষয়টি নিয়ে স্বাস্থ্যমন্ত্রীর সঙ্গে তার কথা হয়েছে। স্বাস্থ্যমন্ত্রী এই হাসপাতালে আইসিইউ ও লাইফ সাপোর্টসহ প্রয়োজনীয় সব আধুনিক চিকিৎসা সরঞ্জাম দেওয়ার আশ্বাস দিয়েছেন। এছাড়া সারা দেশে নতুন চিকিৎসক ও নার্স নিয়োগের যে পরিকল্পনা চলছে, তার মাধ্যমে এই হাসপাতালের জনবল সংকটও দূর করা হবে।’

হাসপাতালটি চালু হলে পিরোজপুর জেলা ও আশেপাশের এলাকার প্রায় ২০ লাখ মানুষ পাবে আধুনিক চিকিৎসা সেবার সুযোগ। বাড়বে চিকিৎসা সেবার মান, কমবে সাধারণ মানুষের ভোগান্তি এমনটাই প্রত্যাশা স্থানীয়দের।