
একসময় শান্তির শহর হিসেবে পরিচিত খুলনা যেন আতঙ্কের জনপদে পরিণত হচ্ছে। কুপিয়ে ও গুলি করে হত্যার ঘটনায় নগরবাসীর মধ্যে বাড়ছে নিরাপত্তাহীনতা। চলতি বছরে নগরীতে অন্তত ২৬টি হত্যাকাণ্ডের তথ্য পাওয়া গেছে। এর মধ্যে মাদক বিক্রির সিন্ডিকেট নিয়ন্ত্রণ, মাদকের পাওনা টাকা ও আধিপত্যের বিরোধকে কেন্দ্র করে অন্তত ৮টি হত্যাকাণ্ডের তথ্য পাওয়া গেছে।
নগরীর পাড়া-মহল্লায় মাদক কারবারিদের তৎপরতা ছড়িয়ে পড়লেও বড় কারবারিদের বিরুদ্ধে কার্যকর অভিযান পরিচালনায় জনবল ও যানবাহন সংকটে রয়েছে খুলনার মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর। অনেক ক্ষেত্রে খুচরা মাদক বহনকারীদের গ্রেপ্তারেই সীমাবদ্ধ থাকছে অভিযান। সংশ্লিষ্টদের অভিযোগ, গ্রেপ্তার হওয়া অনেক মাদক কারবারি দ্রুত জামিনে বের হয়ে আবারও একই কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে পড়ছে।
স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের খুলনা বিভাগীয় গোয়েন্দা কার্যালয় সূত্রে জানা গেছে, চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ২৪৪টি মাদকবিরোধী অভিযান পরিচালনা করা হয়েছে। জেলার ৯টি উপজেলা ও মহানগরীর ৩১টি ওয়ার্ডে মাদক নিয়ন্ত্রণে রয়েছে মাত্র দুটি গাড়ি। বিভিন্ন সময় অভিযান পরিচালনায় ভাড়া করা গাড়িও ব্যবহার করা হয়। এসব অভিযানে ১৫ জনকে গ্রেপ্তার এবং ৬৯টি মামলা দায়ের করা হয়েছে।
বিভাগীয় কার্যালয়ের তথ্য অনুযায়ী, ৯ মাসে ৪ হাজার ৮০ পিস ইয়াবা, ১৪ কেজি ৪৬৫ গ্রাম গাঁজা, ২৫ অ্যাম্পুল পেথিডিন, তিন অ্যাম্পুল হাইড্রোক্লোরাইড ইনজেকশন, ৯ দশমিক ৫ লিটার বিদেশি মদ ও ১৬ বোতল রেকটিফাইড স্পিরিটসহ বিভিন্ন ধরনের মাদক জব্দ করা হয়েছে। এছাড়া মাদক চোরাচালান ও বিক্রির কাজে ব্যবহৃত ৩৫টি মোবাইল ফোন এবং নগদ ৩ লাখ ১৮ হাজার ৭০০ টাকা উদ্ধার করা হয়েছে।
তবে মাদক বিরোধী অভিযানের এই পরিসংখ্যানের বিপরীতে নগরীতে মাদককেন্দ্রিক বিরোধে হত্যাকাণ্ডের ঘটনাও ঘটছে। তদন্ত কর্মকর্তা ও মামলার তথ্য বিশ্লেষণ করে অন্তত ৮টি হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে মাদক কারবারি, মাদকের পাওনা টাকা, সিন্ডিকেট নিয়ন্ত্রণ ও আধিপত্য বিস্তারের বিরোধের তথ্য পাওয়া গেছে।
জানা যায়, গত ৫ ফেব্রুয়ারি লবণচরা থানার পূর্ব হরিণটানা কোবা মসজিদের সামনে রাকিব হাসান খুন হন। তার বাবা আনোয়ার হোসেন বাদী হয়ে মামলা করেন। মাদক কারবারিকে কেন্দ্র করে বিরোধের জেরে এ হত্যাকাণ্ড ঘটে বলে মামলার এজাহারে উল্লেখ করা হয়েছে। মামলায় ৮ থেকে ১০ জনকে আসামি করা হয়। অজ্ঞাতপরিচয় ব্যক্তিদেরও আসামি করা হয়েছে। ঘটনাস্থলের পাশের সিসি ক্যামেরার ফুটেজ দেখে হামলাকারীদের শনাক্ত করা হলেও বেশিরভাগ আসামিকে গ্রেপ্তার করতে পারেনি পুলিশ।
গত ২২ মে রাতে নগরীর দৌলতপুর থানাধীন মহেশ্বরপাশা কার্তিককুল খুটির ঘাট এলাকায় মো. ওমর ফারুককে গুলি করে হত্যা করা হয়। এ ঘটনায় নিহতের মা আসমা বেগম ২৩ মে বাদী হয়ে দৌলতপুর থানায় মামলা করেন। মামলায় তিন আসামিকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ।
মামলার তদন্ত কর্মকর্তা নগর গোয়েন্দা পুলিশের (ডিবি) পরিদর্শক শফিকুল ইসলাম বলেন, চাঁদাবাজি ও মাদক কারবারির সঙ্গে জড়িত ছিলেন ওমর ফারুক। প্রতিপক্ষ আরমান বাহিনীর সঙ্গে বিরোধের জেরে তাকে হত্যা করা হয়েছে।
১২ এপ্রিল নগরীর খালিশপুরের নয়াবাটি এলাকায় মাদক কারবারিকে কেন্দ্র করে ধারালো চাপাতি দিয়ে সোনা মিয়াকে হত্যা করা হয়। তার ভাই সাহিদুল ইসলাম বাদী হয়ে মামলা করেন। মামলার মূল আসামি এখনো ধরাছোঁয়ার বাইরে বলে জানান নিহতের ভাই সাহিদুল সরদার। তিনি বলেন, অন্য যারা গ্রেপ্তার হয়েছে, তারাও অল্প সময়ের মধ্যে জামিন পেয়েছে।
এছাড়া ১ মার্চ খুলনা সদর থানায় মাদক ও আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে গুলি ও ছুরিকাঘাতে মো. আব্দুল আজিজ খুন হন। ১৬ মার্চ দৌলতপুরের কল্পতরু মাঠে আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে রাশেদুল আনাম রাসুকে গুলি করে হত্যা করা হয়। ১২ জুন লবণচরা থানার মাথাভাঙ্গায় মাদকের পাওনা টাকা লেনদেনকে কেন্দ্র করে গাজী রফিককে হত্যা করা হয়।
খুলনা মেট্রোপলিটন পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরে নগরীতে ২৬টি হত্যাকাণ্ড ঘটেছে। এসব হত্যাকাণ্ডের তদন্তে মাদকসংক্রান্ত বিরোধ ও এলাকায় আধিপত্য বিস্তারের বিষয় উঠে এসেছে।
খুলনা মেট্রোপলিটন পুলিশ (কেএমপি) কমিশনার মো. সাজ্জাদুর রহমান এশিয়া পোস্টকে বলেন, ২৬টি হত্যাকাণ্ডের রহস্য উদঘাটিত হয়েছে। এজাহারভুক্ত বেশিরভাগ আসামি কারাগারে। নগরীর একাধিক শীর্ষ সন্ত্রাসীকে ধরা হয়েছে। অপরাধ কমাতে টহল বৃদ্ধি ও জনগণকে সচেতন করতে বিভিন্ন কর্মসূচি গ্রহণ করা হচ্ছে।
অন্যদিকে মাদক নিয়ন্ত্রণে খুলনা জেলা কার্যালয়ের কার্যক্রমেও রয়েছে নানা সীমাবদ্ধতা। মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের খুলনা জেলা কার্যালয় গত বছরের আগস্ট থেকে চলতি বছরের জুলাই পর্যন্ত ১ হাজার ৮৮১টি অভিযান পরিচালনা করেছে। এসব অভিযানে অপরাধ সংশ্লিষ্টতার অভিযোগে ৪২৯ জনকে আসামি করা হয়েছে।
তিনি বলেন, ২৬ লাখের বেশি জনসংখ্যার খুলনা নগরী ও জেলার ৯টি উপজেলায় মাদক নিয়ন্ত্রণের জন্য অধিদপ্তরের রয়েছে মাত্র দুটি গাড়ি। ফলে দপ্তর এবং অধীন দুটি সার্কেলের অভিযান ও মনিটরিং কার্যক্রম চলছে নানা সীমাবদ্ধতার মধ্যে। এছাড়া গুরুত্বপূর্ণ একাধিক পদও শূন্য রয়েছে।
মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের খুলনা জেলা কার্যালয় সূত্রে জানা যায়, জেলার ৯টি উপজেলা ও মহানগরীর ৩১টি ওয়ার্ডে মাদক নিয়ন্ত্রণে রয়েছে মাত্র দুটি গাড়ি। যানবাহনের অভাবে অনেক সময় অভিযানে যাওয়া কঠিন হয়ে পড়ে। ভাড়া গাড়িতে অভিযান পরিচালনা করতে গিয়ে দুর্ভোগে পড়ছেন কর্মকর্তারা।
কর্মকর্তারা বলেন, গুরুত্বপূর্ণ অনেক অভিযানে সিএনজিচালিত অটোরিকশা ভাড়া করে যেতে হয়। ভাড়া গাড়িতে যাওয়ায় ঝুঁকি থাকে। সাধারণ মানুষ সরকারি দপ্তরের কর্মকর্তাদের পরিচয় বুঝতে না পেরে হেনস্তাও করতে পারে। একটি গাড়ি অভিযানে গেলে অন্যটি অফিসের ব্যবহারের জন্য রাখতে হয়। ফলে নগরীর একদিকে অভিযান চালাতে গেলে অন্যদিকে বিড়ম্বনায় পড়তে হয়।
মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের খুলনা বিভাগীয় গোয়েন্দা কার্যালয়ের উপ পরিচালক এস কে ইফতেখার মোহাম্মদ উমায়ের এশিয়া পোস্টকে বলেন, জনবল সংকট থাকলেও কোনোমতে কাজ চালিয়ে নেওয়া যাচ্ছে। কিন্তু যানবাহন সংকটে অনেক ভোগান্তি পোহাতে হয়। মাদক চোরাকারবারির খবর পেয়ে সঙ্গে সঙ্গে অভিযান না চালালে পরে তাদের আর ধরা যায় না। এছাড়া আমাদের জেলায় অফিস থাকলেও গোয়েন্দাদের কোনো কার্যক্রম নেই। আমাদের গোয়েন্দা প্রত্যেক জেলায় থাকা প্রয়োজন।
মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের খুলনা বিভাগীয় গোয়েন্দা কার্যালয় জানিয়েছে, মাদকমুক্ত সমাজ গঠন এবং মাদকের বিস্তার রোধে মাদকবিরোধী বিশেষ অভিযান ভবিষ্যতেও অব্যাহত থাকবে।
