Advertisement

বেশি দামের আশায় মজুত করা পেঁয়াজে পচন, দিশেহারা কৃষক

এশিয়া পোস্ট নিউজ, পাবনা
বেশি দামের আশায় মজুত করা পেঁয়াজে পচন, দিশেহারা কৃষক
মজুত করা পেঁয়াজে পচন। ছবি: এশিয়া পোস্ট

বেশি দামের আশায় কয়েক মাস আগে মাঠ থেকে তোলা পেঁয়াজ বিক্রি না করে ঘরের মাচায় সংরক্ষণ করেছিলেন পাবনার কৃষকেরা। কিন্তু দীর্ঘদিন সংরক্ষণের পর সেই পেঁয়াজে পচন দেখা দিয়েছে। প্রতিদিনই ঝুড়ি ভরে নষ্ট পেঁয়াজ ফেলে দিতে হচ্ছে। ফলে উৎপাদন খরচই উঠবে কি না—সেই শঙ্কায় পড়েছেন জেলার হাজারো প্রান্তিক কৃষক।

পাবনার সুজানগর, সদর ও সাঁথিয়া উপজেলার বিভিন্ন এলাকার কৃষকদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, কোল্ড স্টোরেজ বা আধুনিক সংরক্ষণব্যবস্থা না থাকায় অধিকাংশ কৃষক ঘরের ভেতর বাঁশের তৈরি মাচায় পেঁয়াজ সংরক্ষণ করেন। তবে চলতি মৌসুমে অতিরিক্ত তাপমাত্রা, আর্দ্রতা এবং দীর্ঘ সময় সংরক্ষণের কারণে পেঁয়াজে পচন ও অঙ্কুরোদ্গম বেড়েছে। এতে বাধ্য হয়ে অনেক কৃষক কম দামে পেঁয়াজ বিক্রি করে দিচ্ছেন।

পাবনা সদর ও সুজানগরের বেশ কয়েকজন কৃষকের বাড়িতে গিয়ে দেখা যায়, মাচা থেকে পেঁয়াজ উঠানে ঢেলে রাখা হয়েছে। সেখানে অর্ধেকের বেশি পেঁয়াজ পচে গেছে। নারী-পুরুষ ও শিশুরা পচা পেঁয়াজ থেকে ভালো পেঁয়াজ বাছাই করছেন। এতে দৈনিক ৬০০ থেকে ৭০০ টাকা মজুরি দিতে হচ্ছে তাদের। এরপর এসব পেঁয়াজ মেপে স্থানীয় বাজারে নিয়ে গেলেও কাঙ্ক্ষিত দাম না পেয়ে হতাশ হয়ে ফিরছেন কৃষকেরা।

সুজানগরের হাটখালী গ্রামের কৃষক সেলিম মোর্শেদ রানার বাড়িতে গিয়ে দেখা যায়, সরকারের দেওয়া পাঁচ লাখ টাকা মূল্যের বিশেষ সংরক্ষণাগারে প্রায় ৫০০ মনের মতো পেঁয়াজ মজুত রাখা হয়েছিল। কিন্তু এর অর্ধেকের বেশি পেঁয়াজই পচে গেছে। একই উপজেলার মধুপুর গ্রামের কৃষক মজিবর রহমানের বাড়িতেও দেখা গেছে একই চিত্র। ভালো পেঁয়াজ হাটে নিয়ে কম দামে বিক্রি করতে বাধ্য হচ্ছেন তারা।

কৃষকেরা জানান, সার, বীজ, সেচ ও শ্রমিকের মজুরি বেড়ে যাওয়ায় উৎপাদন ব্যয় আগের চেয়ে অনেক বেশি হয়েছে। অনেক কৃষক ঋণ নিয়ে চাষাবাদ করেছেন। বর্তমানে বাজারে মানভেদে প্রতি মণ পেঁয়াজ ৯০০ থেকে ১ হাজার ৫০০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। অথচ এক বিঘা জমিতে পেঁয়াজ চাষে খরচ হয়েছে ৫০ হাজার টাকারও বেশি। চাষিদের দাবি, এক মণ পেঁয়াজে উৎপাদন খরচই হয়েছে প্রায় ১ হাজার ৬০০ টাকার মতো। বর্তমানে যে দামে বিক্রি হচ্ছে, তাতে উৎপাদন ব্যয়ই উঠছে না।

পচা পেঁয়াজ থেকে ভালো পেঁয়াজ বাছাই করা হচ্ছে। ছবি: এশিয়া পোস্ট
পচা পেঁয়াজ থেকে ভালো পেঁয়াজ বাছাই করা হচ্ছে। ছবি: এশিয়া পোস্ট

গত ২৪ জুলাই পাবনা সদরের দুবলিয়া পেঁয়াজের পাইকারি হাটে প্রতি মণ পেঁয়াজ ১ হাজার থেকে ১ হাজার ৫০০ টাকায় বিক্রি হয়েছে। অথচ গত বছরের এই সময়ে পেঁয়াজের বাজারদর ছিল দুই হাজার ৫০০ থেকে দুই হাজার ৬০০ টাকা মণ। মৌসুমের শুরুতে যেখানে কৃষকেরা ৫০০ থেকে ৮০০ টাকা মণে পেঁয়াজ বিক্রি করেছিলেন, সেখানে চাষিদের হিসাব অনুযায়ী দুই হাজার ২০০ টাকা মণ বিক্রি করতে পারলে কিছুটা লাভ থাকত।

জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্যমতে, চলতি মৌসুমে পাবনায় ৫৩ হাজার ৭৫০ হেক্টর জমিতে পেঁয়াজ চাষের লক্ষ্যমাত্রা থাকলেও আবাদ হয়েছে ৫৪ হাজার ৩ ৩৫ হেক্টরে। উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা ছিল ৮ লাখ ৪৫ হাজার ৪৭৩ টন, আর উৎপাদন হয়েছে নয় লাখ ৯৫ হাজার ৩৬৭ টন।

সাঁথিয়ার কৃষক আফজাল হোসেন বলেন, ভেবেছিলাম কিছুদিন পর দাম বাড়বে। কিন্তু এখন পেঁয়াজই টিকছে না। প্রতিদিনই পচে যাচ্ছে। সুজানগরের মধুপুর এলাকার কৃষক মজিবর রহমান বলেন, এমনভাবে পেঁয়াজ পচে যাচ্ছে যে এক মণ থেকে ১৬-১৭ কেজি ভালো পেঁয়াজ পাওয়া যাচ্ছে। বাকিটা ফেলে দিতে হচ্ছে। এভাবে চলতে থাকলে অনেক কৃষক আগামী বছর পেঁয়াজ চাষই ছেড়ে দেবেন।"

নাজিরগঞ্জের কৃষক হাসান আলী প্রায় ২০ বিঘা জমিতে পেঁয়াজ রোপণ করে এক হাজার মণ পেঁয়াজ সংরক্ষণ করেছিলেন। তিনি বলেন, পেঁয়াজ পচে এখন ৫০০-৬০০ মণ হবে কি না সন্দেহ। এই উপজেলা সারা দেশের পেঁয়াজের ঘাটতি পূরণ করলেও এখানে পর্যাপ্ত সংরক্ষণের ব্যবস্থা নেই। তিনি দ্রুত আধুনিক কোল্ড স্টোরেজ নির্মাণের দাবি জানান।

পাবনা জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের অতিরিক্ত উপপরিচালক (শস্য) রাফিউল ইসলাম বলেন, জেলায় লক্ষাধিক পেঁয়াজচাষি রয়েছেন। কিন্তু উন্নত সংরক্ষণ পদ্ধতির আওতায় আনা গেছে মাত্র আড়াই হাজার কৃষককে। কৃষকদের আধুনিক সংরক্ষণ প্রযুক্তির আওতায় আনা এবং সংরক্ষণ সক্ষমতা বাড়ানোর উদ্যোগ নেওয়া হলে এ ধরনের ক্ষতি অনেকাংশে কমানো সম্ভব হবে।

বিষয় :পাবনা