Advertisement

গার্ডিয়ানের কলাম/হরমুজ প্রণালি থেকে উত্তর সাগর, বিশ্বজুড়ে বইছে সমুদ্রযুদ্ধের হাওয়া

সাইমন টিসডল
হরমুজ প্রণালি থেকে উত্তর সাগর, বিশ্বজুড়ে বইছে সমুদ্রযুদ্ধের হাওয়া
ছবি: সংগৃহীত

হরমুজ প্রণালিতে সরাসরি নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করতে চায় মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র। ইরানি হামলা থেকে বাণিজ্যিক জাহাজ রক্ষা করাই তাদের লক্ষ্য। ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রশাসনের নেওয়া এই সামরিক অভিযানের ধারণাটি একেবারেই নতুন নয়। প্রায় ২০০ বছর আগের কথা। ১৮২৫ থেকে ১৮২৭ সালের মধ্যে কমোডর জন রজার্সের নেতৃত্বে একটি শক্তিশালী মার্কিন নৌবহর ভূমধ্যসাগরে পাঠানো হয়েছিল। গ্রিক জলদস্যুদের হাত থেকে মার্কিন জাহাজ রক্ষা করাই ছিল সেই অভিযানের উদ্দেশ্য।

তৎকালীন নতুন প্রজাতন্ত্র যুক্তরাষ্ট্র মুখে স্বাধীনতার বড় বড় কথা বলত। তা সত্ত্বেও উসমানীয় সাম্রাজ্য থেকে মুক্ত হতে চলা গ্রিসের স্বাধীনতা সংগ্রামকে তারা সাহায্য করেনি। তাদের একমাত্র উদ্দেশ্য ছিল নিজেদের স্বার্থ রক্ষা করা। মার্কিন বাণিজ্য, বাজার ও ব্যবসায়িক স্বার্থকে সুরক্ষিত রাখাই ছিল নৌবহর পাঠানোর মূল লক্ষ্য। তেহরানে ‘জনগণের বিপ্লব’ ঘটানোর ডাক দিয়েছিলেন ট্রাম্প। পরে তিনি তা থেকে সরে আসেন। ইরানের সঙ্গে ট্রাম্পের এই হঠকারী যুদ্ধের মূল উদ্দেশ্যও এখন কেবল নিজেদের স্বার্থ রক্ষায় সীমাবদ্ধ হয়ে পড়েছে।

১৯৮২ সালের জাতিসংঘের সমুদ্র আইন চুক্তি অনুমোদন করেনি যুক্তরাষ্ট্র। এই আইন উপকূলীয় দেশগুলোর হস্তক্ষেপ ছাড়াই অবাধে জাহাজ চলাচলের আইনি অধিকার দেয়। তা সত্ত্বেও ঐতিহাসিক কাল থেকেই মুক্ত চলাচলের নীতি মেনে এসেছে ওয়াশিংটন। সপ্তদশ শতকের ডাচ আইনবিদ হুগো গ্রোটিয়াসের ‘মুক্ত সমুদ্র’ নীতিকেই তারা সমর্থন করে। ইরানের দাবি প্রত্যাখ্যান করেছেন মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও। গত জুনে তিনি স্পষ্ট ঘোষণা দিয়ে বলেন, ‘কোনো আন্তর্জাতিক জলপথে টোল বা ফি আদায় করার অধিকার কোনো দেশের নেই।’

কিন্তু সম্প্রতি ট্রাম্প নিজেই ইঙ্গিত দিয়েছেন, যুক্তরাষ্ট্র চাইলে টোল বা শুল্ক আরোপ করতে পারে। অবশ্য পরে তিনি এই অবস্থান থেকে কিছুটা পিছিয়ে আসেন। গত মাসে ইরানের সঙ্গে একটি ‘সমর্থন স্মারক’ সই হয়েছে। সেখানে যুক্তরাষ্ট্র স্বীকার করে নিয়েছে যে ওমানের সঙ্গে যৌথভাবে ট্রানজিট ফি আদায়ের অধিকার ইরানের রয়েছে। এই ফি হরমুজ প্রণালি ব্যবহারের জন্য নেওয়া হবে। আমেরিকার পুনঃপুনঃ হামলা আর ট্রাম্পের ক্রমাগত হুমকির পরও এই সমঝোতা স্মারকটিই এখন পর্যন্ত ভবিষ্যৎ শান্তি চুক্তির একমাত্র ভিত্তি হয়ে দাঁড়িয়েছে।

ট্রাম্পের এই দুমুখো ও অস্পষ্ট অবস্থান ‘মুক্ত সমুদ্র’ ধারণার ভাঙনকে স্পষ্ট করে তোলে। এই ধারণাটিই আন্তর্জাতিক সমুদ্র আইনের মূল ভিত্তি। ট্রাম্পের এই মনোভাব বৈশ্বিক নিয়মনীতিকেও দ্রুত ধ্বংসের দিকে ঠেলে দিচ্ছে। ট্রাম্প মনে করেন, প্রতিটি দেশের নিজের স্বার্থে একতরফা সিদ্ধান্ত নেওয়ার পূর্ণ অধিকার আছে। অন্তত যুক্তরাষ্ট্রের তো বটেই। কোনো আইন, চুক্তি বা মুক্ত সমুদ্রের বৈশ্বিক রীতিনীতি মানার প্রয়োজন তাদের নেই।

যুক্তরাষ্ট্রের এই মনোভাব অন্য দেশগুলোও অনুসরণ করছে। ফলে বিশ্বজুড়ে এক অস্থিরতা তৈরি হচ্ছে। এই অস্থিরতা দিন দিন আরও স্পষ্ট হয়ে উঠছে। একুশ শতকের এই নতুন সমুদ্রযুদ্ধ অবশ্য ‘বিশমার্ক’ শ্রেণির রণতরীর লড়াইয়ের মতো নয়। জুটল্যান্ড ও মিডওয়ের মতো বড় নৌযুদ্ধের সংঘাতও এখানে নেই। কিন্তু এই যুদ্ধের লক্ষ্যগুলো আগের মতোই রয়ে গেছে। লড়াইটি আসলে প্রতিরক্ষা, নিরাপত্তা, সীমান্ত রক্ষা, মুক্ত বাণিজ্য, অর্থ আর ক্ষমতার।

বর্তমান সমুদ্রযুদ্ধের নানা দিক রয়েছে। এর একটি হলো হরমুজ প্রণালির অচলাবস্থার প্রভাব। এই প্রভাব অন্যান্য অঞ্চলেও ছড়িয়ে পড়ছে। ইয়েমেনের ইরান-পন্থি হুথি বিদ্রোহীরা লোহিত সাগরের প্রবেশদ্বার বাব আল-মান্দাব প্রণালিতে একই ধরনের অবরোধ শুরু করেছে। সৌদি আরবের হামলার প্রতিশোধ হিসেবে তারা এই পদক্ষেপ নিয়েছে বলে দাবি করছে। চলতি সপ্তাহে দুটি তেলবাহী ট্যাংকারে হামলা হয়েছে। এই ঘটনা জ্বালানি বাজারকে আরও অস্থিতিশীল করে তুলেছে। এটি একটি বড় ধরনের সংঘাতের ইঙ্গিত দিচ্ছে।

একইভাবে আন্তর্জাতিক নিয়মনীতির জন্য বড় হুমকি হয়ে উঠছে ইন্দোনেশিয়ার একটি বিতর্ক। বিশ্বের ২২ শতাংশ বাণিজ্যিক জাহাজ মালাক্কা প্রণালির ওপর দিয়ে যাতায়াত করে। সেখানেও এখন টোল আদায়ের প্রস্তাব উঠছে। এখন প্রশ্ন উঠছে, তুরস্কও কি মার্কিন-ইরান নীতি অনুসরণ করবে? তারা কি বসফরাস প্রণালিতে যাতায়াত ফি আদায় শুরু করবে? কিংবা স্পেন কি জিব্রাল্টার প্রণালিতে একই কাজ করবে? বিশ্ব বাণিজ্য এবং সরবরাহ ব্যবস্থার ওপর এর প্রভাব কতটা ভয়াবহ হবে, তা সহজেই অনুমেয়। কারণ, বিশ্বের মোট বাণিজ্যের প্রায় ৮০ শতাংশ পণ্যই সমুদ্রপথে পরিবহন করা হয়।

শুধু বাণিজ্য নিয়ে বিরোধই নয়, আঞ্চলিক প্রতিদ্বন্দ্বীদের মধ্যে সরাসরি সমুদ্রযুদ্ধও বাড়ছে। বিশেষ করে দক্ষিণ চীন সাগর ও তাইওয়ানের চারপাশের জলসীমায় উত্তেজনা চরমে। চীন সেখানে কৃত্রিম সামরিক দ্বীপ তৈরি করছে। ফিলিপাইনের মতো প্রতিবেশীদের সঙ্গে তাদের প্রায়ই সংঘাত হচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্রের মতোই বেইজিংও নিজের স্বার্থে আন্তর্জাতিক আইনকে বুড়ো আঙুল দেখাচ্ছে। ২০১৬ সালে সালিশি আদালতের ঐতিহাসিক রায়কে তারা সরাসরি প্রত্যাখ্যান করেছে। ওই রায়ে বলা হয়েছিল, দক্ষিণ চীন সাগরের বেশিরভাগ অংশের ওপর চীনের দাবির কোনো আইনি ভিত্তি নেই।

গত সপ্তাহে চীন আরেকটি সীমারেখা অতিক্রম করেছে। জাপানের ওকিনোতোরি দ্বীপের মাত্র ১৮০ কিলোমিটার দূরে জাপানের একচেটিয়া অর্থনৈতিক অঞ্চল। সেখানে চীনের একটি ক্ষেপণাস্ত্র ধ্বংসকারী রণতরী তাজা গুলিবর্ষণ মহড়া চালিয়েছে। টোকিও ও বেইজিংয়ের মধ্যে দীর্ঘদিনের সমুদ্রসীমা বিরোধ রয়েছে। তবে জাপানের নতুন প্রধানমন্ত্রী সানায়ে তাকাইচির সাম্প্রতিক মন্তব্যের পর উত্তেজনা বহুগুণ বেড়ে গেছে। তিনি ইঙ্গিত দিয়েছেন, চীন যদি তাইওয়ান দখল করার চেষ্টা করে, তবে জাপান সামরিক জবাব দিতে পারে। তাইওয়ানের ওপর যেকোনো সময় জল ও স্থলপথে হামলার প্রস্তুতি নিচ্ছে বেইজিং। এ জন্য চীন প্রায় প্রতি সপ্তাহেই বিমান ও নৌ মহড়া চালাচ্ছে।

জাপান উপকূলে চীনা রণতরীর সঙ্গে রাশিয়ার একটি ফ্রিগেটও ছিল। এই ঘটনা বিশ্ব সমুদ্রযুদ্ধের অন্যতম প্রধান খেলোয়াড় হিসেবে রাশিয়ার ভূমিকাকে স্পষ্ট করে। ২০২২ সাল থেকে ইউক্রেন নিয়মিত ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা চালাচ্ছে। এতে ভ্লাদিমির পুতিনের কৃষ্ণসাগরীয় নৌবহরের ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। রুশ যুদ্ধজাহাজগুলো এখন কৃষ্ণসাগর ছেড়ে বন্দরে লুকিয়ে থাকছে। এই ক্ষতি পুষিয়ে নিতে চায় রাশিয়া। এ জন্য তারা এখন ইউক্রেনের ইউরোপীয় মিত্রদের বিরুদ্ধে পরোক্ষ বা ‘গ্রে জোন’ সামরিক তৎপরতা বাড়াচ্ছে। বাল্টিক সাগরের তলদেশের পাইপলাইন এবং যোগাযোগ কেবলগুলো এখন রুশ হামলার সহজ লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হয়েছে।

উত্তর আটলান্টিক, উত্তর সাগর এবং ইংলিশ চ্যানেলে রাশিয়ার যুদ্ধজাহাজ ও সাবমেরিনের তৎপরতা বৃদ্ধি পেয়েছে। ধারণা করা হচ্ছে, ভবিষ্যতে বড় ধরনের নাশকতার উদ্দেশ্যে তারা সাগরের তলদেশের অবকাঠামোর মানচিত্র তৈরি করছে। গত সোমবার ব্রিটেনের নতুন প্রধানমন্ত্রী হিসেবে অ্যান্ডি বার্নহ্যাম দায়িত্ব নিয়েছেন। তার প্রথম দিনেই একটি রুশ যুদ্ধজাহাজ সব সীমা ছাড়িয়ে যায়। যুক্তরাজ্যের প্লাইমাউথ নৌঘাঁটি থেকে মাত্র ৪৫ মাইল দূরে তারা এক বিরল তাজা গুলিবর্ষণ মহড়া চালায়।

যুক্তরাজ্য ও ইউরোপের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাকে উসকানি ও ভয় দেখাতেই রাশিয়া একের পর এক এই আক্রমণাত্মক পদক্ষেপ নিচ্ছে। গত মাসে আইল অব ওয়াইটের কাছে একটি রুশ রণতরী বেসরকারি একটি প্রমোদতরীর কাছে সতর্কতামূলক গুলি চালিয়েছিল। প্রথম দৃষ্টিতে ঘটনাটি ছোট মনে হতে পারে। কিন্তু ন্যাটো ও রাশিয়ার মধ্যে সমুদ্রে গড়ে ওঠা বর্তমান সংঘাতের প্রেক্ষাপটে এটি অত্যন্ত ভীতিজনক।

সমুদ্রে রাষ্ট্রগুলোর আইন অমান্য করার ঘটনা দিন দিন বাড়ছে। গত মার্চে শ্রীলঙ্কা উপকূলে বেআইনিভাবে একটি ইরানি যুদ্ধজাহাজ ডুবিয়ে দেয় মার্কিন নৌবাহিনী। গত সপ্তাহে চীনা ও ফিলিপাইনের জাহাজের মধ্যে মারাত্মক সংঘর্ষ হয়েছে। ডেনমার্কের মালিকানাধীন গ্রিনল্যান্ড জোর করে দখল করার হুমকি পুনর্ব্যক্ত করেছেন ট্রাম্প। ভেনিজুয়েলা উপকূলে বেসামরিক নৌকায় বোমা হামলা চালিয়েছে মার্কিন বাহিনী। এদিকে চলতি মাসে দক্ষিণ প্রশান্ত মহাসাগরে চীনের একটি পারমাণবিক সাবমেরিন দূরপাল্লার ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র পরীক্ষা করেছে। এই ঘটনায় তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করেছে অস্ট্রেলিয়া। তারা নিজেরাও এখন পারমাণবিক সাবমেরিন কিনছে।

এই চরম অস্থিতিশীলতা বিশ্বজুড়ে অস্ত্র প্রতিযোগিতাকে উসকে দিচ্ছে। ব্রিটেনের নতুন সরকার এখন প্রতিরক্ষা বাজেট বাড়ানোর জন্য তীব্র চাপের মুখে রয়েছে। বিশেষ করে রয়্যাল নেভির সক্ষমতা বাড়ানোর দাবি উঠছে চারদিক থেকে। বর্তমানে ব্রিটেনের ট্রাইডেন্ট পারমাণবিক প্রতিরোধ ব্যবস্থা আধুনিকায়নের পরিকল্পনা নেওয়া হচ্ছে।

সমুদ্রের এই বহুমুখী যুদ্ধ আসলে এক বড় সংকটের ইঙ্গিত দিচ্ছে। শত শত বছর ধরে তিলে তিলে গড়ে ওঠা সমুদ্র সহযোগিতার নিয়মগুলো ভেঙে পড়ছে। মুক্ত বাণিজ্য, সীমানা নির্ধারণ, মাছ শিকার, সাগরের তলদেশে খনিজ উত্তোলন বা পরিবেশ দূষণ রোধ—সব ধরনের আন্তর্জাতিক আইন ও নীতিমালা এখন সমুদ্রের তলদেশে হারিয়ে যাচ্ছে।

এটি এমন এক পৃথিবীর গল্প, যেখানে শক্তিশালী রাষ্ট্রগুলো আলোচনার মাধ্যমে ঐকমত্যে পৌঁছায় না। তারা ছোট ও দুর্বল দেশগুলোর ওপর নিজেদের ইচ্ছা চাপিয়ে দেয়। বিশ্বজুড়ে সবার অংশীদারিত্বের যে মৌলিক ধারণা ছিল, তা আজ ধ্বংসের মুখে। উনিশ শতকের লর্ড পালমারস্টোনের আমলের সেই ‘গানবোট কূটনীতি’ বা পেশিশক্তির রাজনীতি আবার ফিরে এসেছে। এই বিশ্ব এখন সত্যিই এক অকূল দরিয়ায় দিক হারিয়ে ফেলেছে।


লেখক পরিচিতি: সায়মন টিসডল ব্রিটিশ গণমাধ্যম ‘দ্য গার্ডিয়ান’-এর সহকারী সম্পাদক এবং আন্তর্জাতিক বিষয়াবলি সংক্রান্ত কলামিস্ট। এর আগে তিনি পত্রিকাটির বিদেশি সংবাদ বিভাগের সম্পাদক (ফরেন এডিটর), যুক্তরাষ্ট্র বিষয়ক সম্পাদক (ইউএস এডিটর) ও হোয়াইট হাউস প্রতিনিধি হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। এছাড়া ‘দ্য অবজারভার’ পত্রিকার আন্তর্জাতিক বিষয়াবলি বিষয়ক বিশ্লেষক ছিলেন।